যুদ্ধের ময়দানে যোগাযোগে এবং ড্রোন পরিচালনায় ইন্টারনেটের ব্যবহার সীমিত করা হচ্ছে বলে ক্রমাগত অভিযোগ করে যাচ্ছিল ইউক্রেন। এবার জানা গেল, দেশটিতে ব্যবহৃত স্টারলিংকের ইন্টারনেট এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা স্টারশিল্ডের কার্যক্রম সীমিত করার নির্দেশ এসেছিল হোয়াইট হাউসের অন্দরমহল থেকে। যুক্তরাষ্ট্রের দুজন কর্মকর্তা ও পশ্চিমা এক কর্মকর্তার বরাতে বার্তাসংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
ওই কর্মকর্তারা জানান, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর জন্য স্পেসএক্সের স্টারশিল্ড সেবা ধীর করে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে প্রতিরক্ষা দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে বার্তা পাঠানো হয়েছিল। তবে হোয়াইট হাউসের ঠিক কে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বা নির্দেশটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার ছিল সেটা এই কর্মকর্তারা জানাননি।
চলতি সপ্তাহে ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানান, দ্রুতগতিতে চলা যানবাহন বা অন্য বস্তুর সঙ্গে যুক্ত করলে দেশটিতে সামরিক কাজে ব্যবহৃত স্টারলিংকের রিসিভারগুলো কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। এর ফলে ইউক্রেনের ভূখণ্ডে ড্রোন পরিচালনায় সমস্যা তৈরি হয়। এসব ড্রোনের দিকনির্দেশনা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রিসিভারগুলো ব্যবহৃত হয়।
বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, এখন চলন্ত অবস্থায়ও রিসিভারগুলো কাজ করছে। তবে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১০০ মাইল বা প্রায় ১৬০ কিলোমিটার গতিতে এগুলো কার্যকর থাকছে।
গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থাটির ব্যবহার সাময়িকভাবে সীমিত করার পদক্ষেপ এমন এক সময়ে নেওয়া হলো, যখন রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা বন্ধ করতে কিয়েভের ওপর চাপ দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার জন্য এসব হামলাকে দায়ী করেছেন তিনি। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে জ্বালানির উচ্চমূল্য ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ। এ যুদ্ধের জেরে ইরান জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
স্টারশিল্ডের ব্যবহার সীমিত করার নির্দেশ সম্পর্কে মন্তব্য জানতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট এ ধরনের কোনো অনুরোধ কখনো করেননি।’
প্রশাসনের অন্য কোনো কর্মকর্তা এ অনুরোধ জানিয়েছিলেন কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন করা হলেও হোয়াইট হাউস কোনো জবাব দেয়নি।
সরকারি ও জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত গ্রাহকদের জন্য বিশেষভাবে স্টারশিল্ড তৈরি করেছে স্পেসএক্স। এর অন্যতম প্রধান গ্রাহক মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর। স্টারশিল্ডের মূল অবকাঠামো হিসেবে স্টারলিংক স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক ব্যবহৃত হয়।
ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বলেছেন, বিধিনিষেধের কারণে অধিকৃত ভূখণ্ডে রুশ বাহিনী ও তাদের রসদ সরবরাহব্যবস্থার বিরুদ্ধে হামলা চালানো জটিল হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি রাশিয়ার ছোড়া শাহেদ ড্রোন ধ্বংস করতে ব্যবহৃত প্রতিরোধক ড্রোনের গতিও কমে গেছে।
বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইলন মাস্ক বলেন, স্টারশিল্ড ব্যবস্থার মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হাতে। ফলে এর গতি বা ব্যবহার সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন সামরিক বাহিনী অথবা প্রেসিডেন্ট।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও স্পেসএক্স কোনো জবাব দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর এবং ওয়াশিংটনে ইউক্রেনের দূতাবাসও মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
এ দিকে গত কয়েক দিনে ওয়াশিংটন ও কিয়েভের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। গত ৯ অক্টোবর মায়ামিতে দুই দেশের পাশাপাশি ইউরোপ ও বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
বৈঠক সম্পর্কে অবগত আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং তাঁর প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ বৈঠকে ইউক্রেনের প্রতি কঠোর অবস্থান নেন। তাঁরা ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের বলেন, ওয়াশিংটনের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও রাশিয়ার তেল শোধনাগারে কিয়েভের হামলা অব্যাহত থাকায় যুক্তরাষ্ট্র হতাশ।
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহ চুক্তি করার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যাও দেয়। তাদের বক্তব্য ছিল, শান্তি আলোচনা নিয়ে মস্কোর অবস্থান নমনীয় করতে এ চুক্তি সহায়ক হবে বলে আশা করছে হোয়াইট হাউস।
চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক বাজারে ২২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেলের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। তবে এ চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন আইনপ্রণেতার সমালোচনার মুখে পড়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, এর ফলে রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য অর্থ পাবে, অথচ সংঘাতের অবসানে কোনো ছাড় দিতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে বাধ্য করা হবে না।
এর পরের দিনগুলোতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও ট্রাম্প পরস্পরের সমালোচনা করেন। রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল চুক্তি করার সিদ্ধান্তকে ‘দুর্বল’ বলে অভিহিত করেন জেলেনস্কি। অন্যদিকে ট্রাম্প ইউক্রেনে নির্বাচন আয়োজন এবং জেলেনস্কিকে ক্ষমতা থেকে সরানোর আহ্বান জানান।
এর আগে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পর্দার আড়ালে মার্কিন কর্মকর্তারা ইউক্রেনকে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণসংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। রাশিয়ার হামলা প্রতিহত করতে ইউক্রেন এসব তথ্য ব্যবহার করে। তবে মঙ্গলবার ট্রাম্প বলেন, ওয়াশিংটন এখনো ইউক্রেনের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করছে।
স্টারশিল্ড ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের পর মঙ্গলবার ও বুধবার হোয়াইট হাউস, পররাষ্ট্র দপ্তর ও প্রতিরক্ষা দপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ইউক্রেনের কর্মকর্তারা। ইউক্রেনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, তাঁরা এ সিদ্ধান্তের কারণ জানতে চেয়েছিলেন। তাঁদের জানানো হয়, সিদ্ধান্তটি হোয়াইট হাউস থেকে এসেছে।
স্টারলিংক ও স্টারশিল্ড সেবার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর কয়েক শ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। রয়টার্সের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দপ্তরটি নিজস্ব ব্যবহারের জন্য বিশেষায়িত স্টারশিল্ড স্যাটেলাইটও কিনেছে। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত যোগাযোগ স্যাটেলাইট এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল রিকনিস্যান্স অফিসের জন্য তৈরি গোয়েন্দা স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক রয়েছে।