হোম > বিশ্ব > ইউরোপ

ক্ষুধার্ত পরিচারিকার কামড়ে ধরা পড়েছিল দুর্ধর্ষ হিরা চোরেরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

দুর্লভ ‘গ্রাঁ কঁদে’ হিরা। ছবি: সিএনএন

প্যারিসের একটি হোটেলে ক্ষুধার্ত এক পরিচারিকার আপেল খাওয়ার ঘটনা ১৯২৬ সালের অন্যতম চাঞ্চল্যকর হিরা চুরির রহস্য উন্মোচন করে দিয়েছিল। আপেলের এক কামড়েই তিনি খুঁজে পান ফ্রান্সের দুর্লভ ‘গ্রাঁ কঁদে’ হিরা—যে হিরাটি তখন ইউরোপজুড়ে পুলিশের তল্লাশির কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।

১০০ বছর আগের চাঞ্চল্যকর সেই ঘটনা নিয়ে বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সিএনএন। এতে বলা হয়—ঘটনাটির শুরু হয়েছিল ওই পরিচারিকার আপেলে কামড় দেওয়ার দুই মাস আগে। প্যারিস থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তরে ঐতিহাসিক শাতো দ্য শঁতিই দুর্গের জাদুঘর থেকে চুরি হয়েছিল ৭৫ টিরও বেশি অলংকার। সে সময় এসব গয়নার আনুমানিক মূল্য ছিল ৩০ লাখ ডলার। চুরির ধরন দেখে পুলিশ ধারণা করেছিল, এটি কোনো পেশাদার ও দুর্ধর্ষ চক্রের কাজ।

কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। চুরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন লিওঁ কফার ও অ্যামিল সুতের নামে বিশের কোঠার দুই সাবেক ফরাসি বিমানসেনা। তাঁদের কাছে ছিল কেবল দুটি লম্বা মই। সেগুলো ব্যবহার করেই তাঁরা দুর্গে ঢুকে বিপুল পরিমাণ গয়না নিয়ে পালান। তবে চুরি করা সম্পদ বিক্রি করতে গিয়ে তাঁরা বিপাকে পড়েন। গ্রেপ্তারের আগে মাত্র ৩০ হাজার ফ্রাঁ, অর্থাৎ সে সময়ের প্রায় ১ হাজার ২০০ ডলারের সমপরিমাণ অর্থ আদায় করতে পেরেছিলেন তাঁরা।

তাঁদের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল ৯.০১ ক্যারেটের গোলাপি ‘গ্রাঁ কঁদে’ হিরাটি চুরি করা। হিরাটি এতটাই বিখ্যাত ছিল যে, কোনো স্বর্ণকার সেটি কিনতে রাজি হননি। কারণ, হিরাটি কিনলেই পুলিশের সন্দেহে পড়ার আশঙ্কা ছিল।

চুরির প্রায় দুই মাস পর প্যারিসের এক হোটেলে কাজ করছিলেন পরিচারিকা সুজান শিলৎস। একদিন দুই তরুণের ঘর গোছানোর সময় তাঁদের স্যুটকেসে একটি আপেল দেখতে পান তিনি। ক্ষুধার্ত শিলৎস আপেলটি নিয়ে কামড় দিতেই দাঁতে শক্ত কিছুর আঘাত লাগে। সেটি ছিল সেই বহু কাঙ্ক্ষিত গ্রাঁ কঁদে হিরা।

হিরাটি কঁদে পরিবারের কাছে ছিল ১৭৪০ সাল থেকে। এর সঠিক উৎস আজও নিশ্চিত নয়। তবে ভারত, বোর্নিও কিংবা ব্রাজিলের মতো বিভিন্ন অঞ্চলকে এটির সম্ভাব্য উৎস হিসেবে মনে করা হয়। পরে ফ্রান্সে এসে এটি প্রিন্স লুই অঁরি দ্য বুরবোঁর মালিকানায় যায়। কঁদে পরিবারের প্রতীকী ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম হিরাটি উত্তরাধিকারসূত্রে হস্তান্তরিত হয়েছে।

চুরির ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে চলতি বছরের অক্টোবরে শাতো দ্য শঁতিইতে হিরাটি প্রদর্শন করা হবে। শত বছর পর এটিই হবে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য বড় পরিসরে হিরাটির প্রথম প্রদর্শনী।

জাদুঘরের প্রধান ঐতিহ্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা ম্যাথিয়ু দেলদিকের মতে, গোলাপি হিরা বিশ্বের সবচেয়ে দুর্লভ ও মূল্যবান রত্নগুলোর অন্যতম। হিরাটির রাসায়নিক গঠন, স্বচ্ছতা, ঘনত্ব ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা বিস্তারিত গবেষণা করেছেন। এসব তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে, যাতে হিরাটির একটি ‘পরিচয়পত্র’ তৈরি হয় এবং ভবিষ্যতে এটি বিক্রি করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।

তবে বিরল এই রত্ন প্রদর্শনে ঝুঁকি থাকলেও দেলদিক মনে করেন, চুরির আশঙ্কায় এমন ঐতিহাসিক সম্পদকে মানুষের কাছ থেকে আড়াল করা উচিত নয়। তাঁর ভাষায়, হিরার আসল সৌন্দর্য ছবি বা ভিডিওতে পুরোপুরি উপলব্ধি করা যায় না; এর আলো, রং ও উপস্থিতি সরাসরি দেখলেই অনুভব করা সম্ভব।