গত মাসে জার্মানির লিপজিগ বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছে জার্মানি। একই সঙ্গে মস্কোর বিরুদ্ধে একাধিক নতুন পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে দেশটি। গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেক্সান্ডার ডোব্রিন্ট বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ করছি না, কিন্তু প্রতিদিনই আমরা হাইব্রিড হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছি।’ এ সময় তিনি দেশের নিরাপত্তা হুমকির মাত্রা ‘সাধারণ’ থেকে বাড়িয়ে ‘উচ্চ’ পর্যায়ে উন্নীত করার কথা জানান।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের খবরে বলা হয়েছে, জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়োহান ওয়াডেফুল বার্লিনে রাশিয়ার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ‘রাশিয়ান হাউস’ এবং বন শহরে রাশিয়ার কনস্যুলেট বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে জার্মানিতে প্রবেশকারী রুশ নাগরিকদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা হচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাহী সংস্থা ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন বলেছেন, ইউরোপের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ‘স্পষ্ট জবাব’ ঘোষণা করবেন। এর মধ্যে ‘অতিরিক্ত নিষেধাজ্ঞা’ও থাকবে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রও ধারণা করেছিল, পূর্ব জার্মানির ওই বিমানবন্দরে পাওয়া বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোনটি রাশিয়ার একটি গোয়েন্দা সংস্থার ছিল। ইউরোপে দায়িত্বপ্রাপ্ত যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছিলেন।
ঘটনাটি ইউরোপজুড়ে বড় ধরনের বিমান চলাচল বিঘ্নিত করে এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে। জার্মান কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৪ আগস্ট রাতে লিপজিগ/হালে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় ড্রোনটি পাওয়া যায়। জায়গাটি ছিল বিমানবন্দরের দক্ষিণ রানওয়ের কাছে, যেখানে কার্গো বিমান চলাচল করে।
ড্রোনটি নিষ্ক্রিয় করতে একটি বোমা নিষ্ক্রিয়কারী রোবট ব্যবহার করা হয়। পরে ড্রোনের সঙ্গে যুক্ত ডেটোনেটর বা বিস্ফোরণ ঘটানোর যন্ত্রটি সরিয়ে ফেলা হয়। ঘটনাস্থলের ছবিতে ওই রোবটকে একটি ইউক্রেনীয় কার্গো বিমানের কাছাকাছি দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান, ড্রোনটিতে সামরিক মানের বিস্ফোরক ছিল। পরদিন, ৫ আগস্ট, আরেকটি উড়ন্ত বস্তু বিমানবন্দরের কাছে একটি কার্গো বিমানে আঘাত করে। এতে বিমানটির সামান্য ক্ষতি হয়। পরে বিমানটি নিরাপদে হ্যানোভারে অবতরণ করে।
ড্রোন হামলার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করার বিষয়টিকে ‘অযৌক্তিক’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে মস্কো। মঙ্গলবার রাতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অভিযোগ করেন, জার্মানি মস্কোকে দায়ী করার জন্য প্রমাণ সাজিয়েছে। এর আগে জার্মানিতে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত সের্গেই নেচায়েভ বার্লিনের পদক্ষেপকে ‘রুশ-জার্মান সম্পর্কের নজিরবিহীন উত্তেজনা’ বলে আখ্যা দেন। তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে ‘ভিত্তিহীন, অযৌক্তিক এবং অবিবেচনাপ্রসূত’ বলে বর্ণনা করেন এবং এর পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।
এদিকে, সম্প্রতি জার্মান গণমাধ্যম জানিয়েছে, এসব ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ পর বিমানবন্দরের কাছের একটি মাঠে তৃতীয় একটি ড্রোনও পাওয়া যায়। এতে ধারণা তৈরি হয়েছে, হামলায় একাধিক ড্রোন ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকতে পারে। ঘটনাটির তদন্ত করছে জার্মানির ফেডারেল প্রসিকিউটর অফিস। চলমান তদন্তের কথা উল্লেখ করে সিএনএনের প্রশ্নের জবাব দিতে সংস্থাটি অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
লিপজিগ/হালে ইউরোপের অন্যতম ব্যস্ত কার্গো বিমানবন্দর। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর প্রথম দিকেই কিয়েভের উত্তর-পশ্চিমে হস্তোমেল শহরে অবস্থিত নিজস্ব ঘাঁটি রাশিয়া ধ্বংস করার পর থেকে ইউক্রেনের কার্গো বিমান সংস্থা আন্তনভ এয়ারলাইন্স এই বিমানবন্দরকে তাদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। বিস্ফোরকবোঝাই ড্রোনটি বিমানবন্দরে থাকা ইউক্রেনের ওই বিমানগুলোর একটি বিমানের কাছেই পাওয়া যায়।