হোম > বিশ্ব > ইউরোপ

ইতালি, ফ্রান্স ও স্পেনে ড্রোন হামলার পরিকল্পনা করছে রাশিয়া: সিআইএর সতর্কতা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

রাশিয়া তৈরি ‘জারবেরা’ ড্রোন। এগুলো ঘণ্টায় প্রায় ১৬০ কিলোমিটার গতিতে উড়তে পারে। ছবি: এএফপি

দক্ষিণ ও পশ্চিম ইউরোপে নিজেদের সংঘাতের সীমানা বাড়াতে ইতালি, স্পেন এবং ফ্রান্সে ড্রোন হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছে রাশিয়া। সম্প্রতি মার্কিন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর একটি সতর্কবার্তার বরাতে স্প্যানিশ দৈনিক এল মুন্দো এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে।

এল মুন্দোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পূর্ব ইউরোপ ও বাল্টিক অঞ্চলের বাইরে এবার ভূমধ্যসাগরীয় এবং পশ্চিম ইউরোপীয় অঞ্চলে ড্রোন হামলা চালানোর ছক কষছে মস্কো।

স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমটির দাবি অনুযায়ী, সমুদ্রের আন্তর্জাতিক জলসীমায় থাকা মালবাহী কনটেইনার জাহাজ থেকে ড্রোন উৎক্ষেপণ করে এই হামলা চালানোর পরিকল্পনা করছেন ভ্লাদিমির পুতিন। লক্ষ্যবস্তু হিসেবে রাখা হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর, বিমানবন্দর ও কৌশলগত অবকাঠামোগুলোকে।

বণিক জাহাজ থেকে উৎক্ষেপণ করা এই ড্রোনগুলো স্পেনের পূর্বাঞ্চলের অর্ধেক এলাকা (যার মধ্যে রাজধানী মাদ্রিদ ও পর্যটনকেন্দ্র আন্দালুসিয়া অন্তর্ভুক্ত), ইতালির উত্তর-পূর্ব অংশ বাদে প্রায় পুরো ভূখণ্ড এবং ফ্রান্সের তুলুস, মার্সেইসহ দক্ষিণাঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম।

ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোর ওপর হামলা ও উসকানিমূলক তৎপরতার সম্ভাব্য বৃদ্ধির বিষয়ে প্যারিস, মাদ্রিদ ও রোমকে সিআইএ ইতিমধ্যে সতর্ক করেছে। লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে এল মুন্দো জানায়, রাশিয়া সমুদ্রে অবস্থানরত জাহাজ থেকে কনটেইনারের ভেতরে লুকিয়ে রাখা ড্রোন ব্যবহার করবে। আর এটি করা মোটেও কঠিন কোনো কাজ নয়।

লিথুয়ানিয়ার কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে, সম্ভাব্য এই হামলায় রাশিয়া মূলত ‘জারবেরা’ নামের একধরনের ছোট আকারের ড্রোন ব্যবহার করতে পারে। ড্রোনটি দৈর্ঘ্যে প্রায় দুই মিটার ও এর ডানার বিস্তার ২ দশমিক ৫ মিটার। এগুলো ঘণ্টায় প্রায় ১৬০ কিলোমিটার গতিতে উড়তে পারে এবং এদের সর্বোচ্চ পাল্লা প্রায় ৬০০ কিলোমিটার।

বাণিজ্যিক জাহাজের শিপিং কনটেইনারে ড্রোনগুলো লুকিয়ে রাখা যায় এবং সহজে ক্যাটাপল্টের সাহায্যে এগুলো উড্ডয়ন করানো সম্ভব।

জারবেরা ড্রোনের বিস্ফোরক বহনের ক্ষমতা (প্রায় ৪-৫ কেজি) কম হওয়ায় এটি কোনো বড় স্থাপনা একবারে ধ্বংস করতে পারবে না, তবে আগুন ধরিয়ে দেওয়া কিংবা সাময়িকভাবে কোনো বিমানবন্দর বা বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার মতো ক্ষতি করতে পারে।

গত ২৫ আগস্ট সিআইএর প্রধান জন র‍্যাটক্লিফ মস্কো যাওয়ার পরপরই ইউরোপীয় দেশগুলোকে এই সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়ার তথ্যমতে, র‍্যাটক্লিফের এই আকস্মিক সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোতে কোনো ধরনের আক্রমণ না করার ব্যাপারে রাশিয়াকে সরাসরি হুঁশিয়ার করা।

এদিকে ড্যানিশ প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থাও জানিয়েছে, ন্যাটোর বিরুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক পদক্ষেপের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। তবে এখনই সরাসরি কোনো পূর্ণাঙ্গ আক্রমণের সম্ভাবনা কম থাকলেও তা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্স, স্পেন বা ইতালিতে হামলা চালানোর মূল উদ্দেশ্য সরাসরি কোনো অঞ্চল দখল নয়। এর উদ্দেশ্য, ইউক্রেনকে সহায়তা প্রদানকারী পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন বাড়ানো।

উল্লেখ্য, সামনের বছর এই তিন দেশেই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা কৌশলবিদ কেয়ার জাইলস ব্রিটিশ দৈনিক টেলিগ্রাফকে বলেন, রাশিয়ার সীমান্ত থেকে দূরত্ব স্পেনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয় না। রাশিয়ার লক্ষ্য কেবল সীমান্তঘেঁষা দেশগুলোই নয়, ইউরোপের যেখানেই দুর্বলতা রয়েছে, তারা সেখানেই আঘাত করবে। জাইলসের মতে, আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় স্পেন ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো রাশিয়ার এমন হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে।

গত কয়েক বছরে মূল ভূখণ্ডের বাইরেও রাশিয়া ইতিমধ্যে তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘনের কার্যক্রম বাড়িয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সকালে চারটি রুশ ড্রোন মলদোভার আকাশসীমায় অনুপ্রবেশ করে, যার মধ্যে একটি দেশটির উত্তরাঞ্চলে বিস্ফোরিত হয়। ওই ঘটনার পর মলদোভার প্রেসিডেন্ট মায়া সান্দু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, রাশিয়ার এই আক্রমণ ইউরোপের সার্বিক নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলছে।

এল মুন্দোর প্রতিবেদনটি ইতালিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ইতালীয় প্রধান বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির সংসদ সদস্য (এমপি) লিয়া কোয়ার্তাপেল সরকারের কাছে অবিলম্বে ব্যাখ্যা চেয়েছেন যে, সংবাদটি সত্য কি না এবং সুরক্ষায় সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে পরে ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেতো স্প্যানিশ পত্রিকার এই তথ্যকে অমূলক বলে দাবি করেন।

অন্য দিকে, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ১৬ সেপ্টেম্বর প্রতিরক্ষা পরিষদের বৈঠক ডাকেন। পরে সব প্রধান রাজনৈতিক দল ও ২০২৭ সালের নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের এলিসি প্রাসাদেও ডাকেন। এরপর এক বিবৃতিতে মাখোঁ বলেন, ইউরোপে রাশিয়ার আগ্রাসনের ধরন বদলে যাচ্ছে, এখানে কেউ নিরাপদ নয়। একই সঙ্গে তিনি দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও প্রতিরক্ষাশিল্প কেন্দ্রগুলোকে সাইবার এবং ড্রোন হামলা থেকে রক্ষায় বিশেষ পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেন।