হোম > বিশ্ব > ইউরোপ

কৃষ্ণসাগর অবরোধ: ইউক্রেনের কৃষি অর্থনীতির টুঁটি চেপে ধরেছে রাশিয়া

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ইউক্রেনের একটি কৃষি খামারে একজন ট্র্যাক্টরচালক। ছবি: এএফপি

রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনের কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরগুলো দিয়ে কৃষিপণ্য রপ্তানি প্রায় থমকে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন দেশটির কৃষকেরা। ভালো ফলন হওয়া সত্ত্বেও শস্য বিক্রি করতে না পারায় কৃষকদের অর্থসংকট তীব্র হচ্ছে। এর ফলে শুধু চলতি মৌসুম নয়, আগামী বছরের ফসল উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে রাশিয়ার আগ্রাসনের শুরুতে দক্ষিণ ইউক্রেনের একটি বড় অংশ রুশ দখলে চলে যাওয়ায় নিজের দুই-তৃতীয়াংশ জমি হারিয়েছিলেন কৃষক সেরহি রিবালকো। এবার রুশ হামলার কারণে সম্ভাবনাময় ফসলও বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।

ইউক্রেন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ গম, ভুট্টা ও সূর্যমুখী বীজ উৎপাদক দেশ। এসব কৃষিপণ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ কৃষ্ণসাগর দিয়ে রপ্তানি হয়। কিন্তু রাশিয়ার ধারাবাহিক হামলায় ওই রপ্তানি কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যেই ইউক্রেনে গম কাটার মৌসুম সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। রিবালকোর শস্য সংরক্ষণাগার ইতোমধ্যে প্রায় পূর্ণ। আগামী মাসে শুরু হওয়ার কথা ভুট্টা কাটার মৌসুম।

নিজের সাইলো বা গুদামে দাঁড়িয়ে ৫৭ বছর বয়সি রিবালকো বলেন, ‘এই শস্য পাঠানোর মতো কোনো গন্তব্য নেই। কৃষকদের জন্য এটি সম্পূর্ণ বিপর্যয়।’ আগে তিনি ইউক্রেনের বড় শস্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান নিবুলন এবং স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানায় শস্য বিক্রি করতেন। কিন্তু এখন কেউ শস্য কিনছে না বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে নিবুলন কোনো জবাব দেয়নি।

রিবালকো বলেন, ‘সবকিছু একেবারে থেমে গেছে। অর্থের প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। আয়ের পথ শুকিয়ে গেছে। কোনো রপ্তানি নেই।’

রপ্তানি বন্ধে চাপে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি

ইউক্রেনের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই আসে কৃষি খাত থেকে। ফলে কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরগুলোর অবরোধ দেশটির ইতোমধ্যে ভঙ্গুর যুদ্ধকালীন অর্থনীতির ওপর আরও চাপ তৈরি করছে। চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে ইউক্রেন ও রাশিয়া উভয়েই একে অপরের অর্থনীতিকে দুর্বল করতে কৃষ্ণসাগর ও আজভ সাগরে হামলা বাড়িয়েছে। ইউক্রেন রুশ জাহাজের ওপর হামলা বাড়িয়েছে।

রাশিয়াও বিশ্বের অন্যতম প্রধান খাদ্য রপ্তানিকারক। ফলে দুই দেশের মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হওয়ায় বৈশ্বিক খাদ্য মূল্যস্ফীতির ওপরও বড় প্রভাব পড়তে পারে। এরই মধ্যে রেকর্ড তাপপ্রবাহ, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং ইউক্রেনের যুদ্ধ খাদ্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে তুলছে।

ইউক্রেনের প্রধান কৃষক সংগঠন ইউক্রেনিয়ান অ্যাগ্রেরিয়ান কাউন্সিলের (ইউএসি) উপপ্রধান ডেনিস মার্চুক বলেন, ‘ইউক্রেন বিশ্বের প্রায় ৬ শতাংশ গম এবং প্রায় ১১ শতাংশ ভুট্টা সরবরাহ করে।’ সময়মতো সরবরাহ পৌঁছাতে না পারলে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু আমদানিনির্ভর দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি। এসব দেশ ইউক্রেনীয় শস্যের গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা।

ফলন ভালো, কিন্তু বাজার নেই

এ বছর ইউক্রেন প্রায় ৬ কোটি টন শস্য উৎপাদনের আশা করছে, যা ২০২৫ সালের উৎপাদনের প্রায় সমান। কিন্তু কৃষকদের কাছে পরবর্তী বছরের ফসল নিয়ে আশাবাদ খুবই কম। রপ্তানি বন্ধ থাকলে পরবর্তী ফসল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করা তাদের পক্ষে কঠিন হবে। জুলাইয়ে কৃষ্ণসাগরীয় বাণিজ্যে বিঘ্ন এবং বিশ্বব্যাপী সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় শিকাগোর বৈশ্বিক বেঞ্চমার্ক শস্যের দাম এক বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল। বিপরীতে, ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ বাজারে শস্য জমে যাওয়ায় স্থানীয় দাম ব্যাপকভাবে কমেছে।

সব ধরনের শস্যের উৎপাদন নিয়ে বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, কৃষকেরা শুধু গম রপ্তানি করে লাভ করতে পারবেন। অন্যান্য শস্যের ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচও তোলা সম্ভব হবে না। মার্চুক বলেন, ‘জ্বালানি কেনা, শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া এবং শীতকালীন ফসলের বপনের প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে এই অর্থের প্রয়োজন।’

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর নিজের কৃষি ব্যবসা পুনর্গঠনের জন্য বিপুল ঋণ নিয়েছেন রিবালকো। তাঁর হিসাবে, ফসল কাটার মৌসুমে ঋণ পরিশোধ, শ্রমিকদের মজুরি এবং জ্বালানি কেনার জন্য তাঁর খামারের প্রতি মাসে প্রায় ২ কোটি হৃভনিয়া বা ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৭৪ ডলার আয় করতে হয়। এই অর্থ না পেলে শরতের জমি প্রস্তুতের কাজও হুমকির মুখে পড়বে বলে জানান তিনি।

কৃষ্ণসাগরে ফের সংকট

কৃষ্ণসাগরের জলসীমা বুলগেরিয়া, জর্জিয়া, রোমানিয়া ও তুরস্কের পাশাপাশি রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে ভাগাভাগি করা। শস্যের পাশাপাশি এই জলপথ দিয়ে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত তেলজাত পণ্যও পরিবহন করা হয়। অবরোধের আগে ইউক্রেন প্রতি মাসে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ মেট্রিক টন কৃষিপণ্য কৃষ্ণসাগর দিয়ে রপ্তানি করত—বলছে দেশটির কৃষি মন্ত্রণালয়।

২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেনের কৃষিপণ্য রপ্তানি ব্যাহত হয়েছিল। সে সময় বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের আশঙ্কায় জাতিসংঘ ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় একটি চুক্তি হয়, যার মাধ্যমে কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেনীয় শস্য পরিবহনের সুযোগ তৈরি হয়। রাশিয়া ২০২৩ সালে ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইউক্রেন নিজস্ব ‘শস্য করিডোর’ চালু করে। কৃষ্ণসাগরের পশ্চিম উপকূল ধরে রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার মতো ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর জলসীমা দিয়ে এই করিডোর পরিচালিত হতো।

কিন্তু জুলাই ও আগস্টের শুরুতে রাশিয়া ইউক্রেনের কৃষ্ণসাগরীয় বন্দর অবকাঠামোর ওপর ৭০ টির বেশি হামলা এবং জাহাজের ওপর ৬২টি হামলা চালানোর পর আবারও রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে বলে ইউক্রেনের বন্দর প্রশাসন জানিয়েছে।

বুধবার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের প্রথম দুই সপ্তাহে ইউক্রেনের শস্য রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৫ শতাংশ কমেছে। রাশিয়ার দাবি, তাদের হামলার লক্ষ্য বৈধ সামরিক অবকাঠামো, সামরিক সরবরাহব্যবস্থা এবং বিদেশি অস্ত্র পরিবহনকারী জাহাজ।

বিকল্প রপ্তানি পথও সংকুচিত

সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও শুকিয়ে রাখা গেলে শস্য কয়েক বছর পর্যন্ত ভালো থাকে। কিন্তু ইউক্রেনে সংরক্ষণ সক্ষমতার ঘাটতি ১ কোটি ১০ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে বলে কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। অস্থায়ীভাবে খামারেই শস্য সংরক্ষণের জন্য বিশেষায়িত ব্যাগ সরবরাহ করতে ইউক্রেন তার অংশীদার দেশগুলোর কাছে সহায়তা চেয়েছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, বিকল্প রপ্তানি পথ এখন জরুরি। তবে আগের তুলনায় এবার এমন পথ খুঁজে বের করা অনেক কঠিন হতে পারে। ২০২২ সালের শুরুতে কৃষ্ণসাগরীয় বন্দরগুলো অবরুদ্ধ হলে ইউক্রেন কৃষিপণ্য রপ্তানি দেশের পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে রেল ও সড়কপথে সরিয়ে নিয়েছিল। কিয়েভ স্কুল অব ইকোনমিকসের ওলেহ নিভিয়েভস্কি বলেন, বিকল্প রপ্তানি পথ নিয়ে আলোচনার সুযোগও সংকুচিত হয়েছে। এর একটি কারণ প্রতিবেশী পোল্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি। দেশটির কৃষকেরা এর আগে তুলনামূলক সস্তা ইউক্রেনীয় শস্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।

এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আরও কঠোর বাণিজ্যব্যবস্থা, দানিয়ুব নদীর পানির স্তর কমে যাওয়া এবং রুশ হামলায় রেল অবকাঠামোর ক্ষতি ইউক্রেনের বিকল্প রপ্তানি পথ সীমিত করেছে। নিভিয়েভস্কি টেলিগ্রামে বলেন, ‘বন্দর অবরোধের অর্থনৈতিক পরিণতি গতবারের তুলনায় কম নয়, বরং আরও গুরুতর হতে পারে, এই সম্ভাবনার জন্য ইউক্রেনের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।’

কোটি কোটি ডলারের ক্ষতির আশঙ্কা

ইউক্রেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত মাসে জানিয়েছে, অবরোধের কারণে বছরের বাকি সময়ে দেশটি প্রায় ২৫০ কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা আয় হারাতে পারে। ইউএসির হিসাব অনুযায়ী, বাড়তি পরিবহন ব্যয়ের কারণে দেশটির কৃষকদের ক্ষতি হতে পারে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার। তবে কৃষকদের দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে এখনই কোনো হিসাব দেওয়া খুব তাড়াতাড়ি হবে বলে মার্চুক জানান।

২০২২ সাল থেকে ইউক্রেনের কৃষি খাতে যুদ্ধজনিত ক্ষতির পরিমাণ ইতোমধ্যে ৯ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। সক্রিয় যুদ্ধ, ব্যাপক মাইন পাতা ও গোলাবর্ষণ এবং সেচব্যবস্থার ঘাটতির কারণে চাষাধীন জমির পরিমাণও প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমেছে।

কৃষকদের সহায়তায় সরকার জরুরি একটি প্যাকেজ চালু করেছে। এর আওতায় রাষ্ট্রীয় ঋণ কর্মসূচি সম্প্রসারণ, ঋণ পাওয়ার শর্ত সহজ করা এবং কার্যকরী মূলধনের ঋণের সুদের হার কমানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে কৃষকদের আরও সহায়তা প্রয়োজন। খারকিভ অঞ্চলের একটি খামারের পরিচালক ফেলিক্স ফিয়োদোরভ রয়টার্সকে বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এ বছরের ফসল, গমও, প্রায় দ্বিগুণ ভালো। কিন্তু দাম গত বছরের অর্ধেক।’

রিবালকো শ্রমিকদের মজুরি ও কর পরিশোধ করতে হিমশিম খাওয়ায় নগদ অর্থ জোগাড়ের জন্য তাঁর কিছু আগাম গম কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। সেই অর্থ দিয়ে কয়েক দিনের ডিজেল কেনার খরচও মেটাতে হয়েছে তাঁকে।

পরবর্তী বছরের ফসল নিয়ে শঙ্কা

এখন সবচেয়ে জরুরি সমস্যা হলো কোনোভাবে পরবর্তী বছরের ফসল নিশ্চিত করা। রিবালকো বলেন, ‘ইউক্রেন যদি আজ তার ফসল বপন না করে, যদি পোলিশ ও জার্মানদের প্রয়োজনীয় রেপসিড বপন না করে, গম বপন না করে, শীতকালীন ফসলের বীজ না ফেলে এবং বসন্তের কাজের জন্য মাটি প্রস্তুত না করে, তাহলে এক বছর পর আমরা সত্যিকারের খাদ্য সংকট দেখতে পাব।’

কৃষ্ণসাগরের বন্দরগুলোতে রুশ হামলা এভাবে চলতে থাকলে সংকটটি শুধু ইউক্রেনের কৃষকদের আয় ও জীবিকাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি দেশটির যুদ্ধকালীন অর্থনীতি, পরবর্তী কৃষি মৌসুমের প্রস্তুতি এবং আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের খাদ্যনিরাপত্তাকেও একসঙ্গে চাপে ফেলতে পারে। যুদ্ধের গোলা শেষ পর্যন্ত যে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই পড়ে না, শস্যের সাইলোতেও তার হিসাব লেখা হয়।