ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের কৌশলগত শহর কোস্তিয়ানতিনিভকার দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছে রুশ বাহিনী। বহুদিন ধরেই ক্রেমলিনের লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের তথাকথিত ‘ফর্ট্রেস বেল্ট’ বা দুর্গ-প্রতিরক্ষা বলয় দখল করা। যদিও ১২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ফ্রন্টের অন্য অংশগুলোতে রাশিয়ার অগ্রগতি অনেকটাই স্থবির হয়ে আছে, তবে কোস্তিয়ানতিনিভকা ঘিরে পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, শহরটির ভেতরেও এখন লড়াইয়ের ছাপ দেখা যাচ্ছে। ইউক্রেনের জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডারদের ভাষ্য, ছোট ছোট রুশ সেনাদল শহরের উপকণ্ঠে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করছে। এতে সামনে কাছাকাছি দূরত্বে সরাসরি সংঘর্ষ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কোস্তিয়ানতিনিভকা চারটি গুরুত্বপূর্ণ বসতি নিয়ে গঠিত প্রতিরক্ষা রেখার দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। শিল্পসমৃদ্ধ দোনেৎস্ক অঞ্চল ধরে রাখার ক্ষেত্রে এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইউক্রেনের অন্যতম প্রধান ভরসা। বিশ্লেষকদের মতে, কোস্তিয়ানতিনিভকার দিকে রাশিয়ার এই চাপ মস্কোর দীর্ঘস্থায়ী জনবল সুবিধার প্রতিফলন। যদিও ইউক্রেন মাঝারি পাল্লার ড্রোন হামলার মাধ্যমে রুশ সরবরাহব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, তবু তা এখনো রাশিয়ার আক্রমণ থামিয়ে দেওয়ার মতো পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
ফিনল্যান্ডভিত্তিক সংঘাত বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাক বার্ডের বিশ্লেষক এমিল কাস্তেহেলমি বলেন, ইউক্রেনের মাঝারি পাল্লার হামলার প্রভাব এতটা শক্তিশালী হয়নি যে রাশিয়াকে তাদের আক্রমণাত্মক অভিযান স্থগিত করতে হবে। তাঁর মতে, পেছনের এলাকায় বাড়তি ক্ষতি সত্ত্বেও রাশিয়া এখনো অন্তত কিছু সেক্টরে অভিযান চালিয়ে যেতে পারছে।
সামরিকভাবে কোস্তিয়ানতিনিভকা দখল করতে পারলে রুশ বাহিনী উত্তরমুখী অগ্রযাত্রার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি পাবে। বর্তমানে এই অক্ষই রুশ অভিযানের কেন্দ্রীয় অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে শহরটি দখলের পথ সহজ নয়। বিশ্লেষকদের ধারণা, পোকরোভস্ক ও আভদিভকার মতো দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল অবরোধ যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্প্রতি বলেছেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে পুরো দোনেৎস্ক অঞ্চল রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। চার বছরের বেশি সময় ধরে যুদ্ধ চললেও অঞ্চলটির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এখনো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত সপ্তাহে পুতিন দাবি করেন, রাশিয়া কোস্তিয়ানতিনিভকা দখলের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। যুদ্ধের আগে প্রায় ৭০ হাজার মানুষের শহরটিতে বর্তমানে মাত্র প্রায় ২ হাজার মানুষ বসবাস করছে।
তবে ইউক্রেনের ১৯ তম আর্মি কর্পসের জ্যেষ্ঠ কমান্ডাররা ইউক্রেনীয় গণমাধ্যমকে বলেন, পুতিনের এই বক্তব্য অতিরঞ্জিত। তাঁদের দাবি, শহরে ঢুকে পড়তে সক্ষম হওয়া ছোট ছোট রুশ দলগুলোকে ইউক্রেনীয় সেনারা লক্ষ্য করে ধ্বংস করছে। ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় অপারেশনাল কমান্ডের প্রধান মেজর জেনারেল ভিক্টর নিকোলিউক দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যমকে বলেন, বর্তমান জনবল ও সম্পদ পরিস্থিতি বজায় থাকলে কোস্তিয়ানতিনিভকা এখনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার ২৩ জুনের মূল্যায়নে জানায়, পরিস্থিতি ইউক্রেনের জন্য কঠিন হয়ে উঠলেও রুশ অনুপ্রবেশ এখনো দ্রুত সামরিক ভাঙন তৈরি করার মতো পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে ইউক্রেনীয় ওপেন-সোর্স মানচিত্র বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ডিপস্টেটের রুসলান মাইকুলা সতর্ক করেছেন, রাশিয়া ধীরে ধীরে দুই দিক থেকে শহরটিকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে। এতে শহর রক্ষার মূল্য কিয়েভের জন্য ক্রমশ বাড়ছে।
তাঁর ভাষায়, সামনে হয় আরও বড় ঝুঁকি নিয়ে প্রতিরক্ষা জোরদার করতে হবে, নয়তো পিছু হটার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন যে প্রতিটি দিন ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে। এমিল কাস্তেহেলমি বলেন, কোস্তিয়ানতিনিভকার পতন এখন অনেকটাই সময়ের অপেক্ষা বলে মনে হচ্ছে।
এদিকে দুর্গ-প্রতিরক্ষা বেল্টের উত্তর অংশেও রুশ বাহিনী চাপ বাড়াচ্ছে। এতে স্লোভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোরস্ক শহর নিয়মিত বিমান ও ড্রোন হামলার আওতায় চলে এসেছে। শহর দুটি এখন রুশ অবস্থান থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে। মাঠপর্যায়ের সেনাদের তথ্য অনুযায়ী, কোস্তিয়ানতিনিভকা থেকে উত্তরের সরবরাহপথে গোলাবর্ষণ, ড্রোন হামলা ও গাইডেড বোমার কারণে অবকাঠামো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সম্প্রতি রয়টার্স ইউক্রেনের জাতীয় পুলিশের ‘প্রিডেটর’ রাইফেল ব্রিগেডের সদস্যদের সঙ্গে ওই এলাকায় যায়। তাদের কাজ ছিল ড্রোন ও দূরনিয়ন্ত্রিত মাইন ঠেকিয়ে সরবরাহপথ সচল রাখা। সেখানে দেখা যায়, রাস্তার ওপরে টানানো অ্যান্টি-ড্রোন জালের ওপর ফাইবার-অপটিক কেবল ছড়িয়ে আছে। এগুলো এফপিভি ড্রোন পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়। প্রচণ্ড রোদে সেগুলো ঝলমল করছিল।
বর্তমানে ওই এলাকায় খাবার, পানি ও সরঞ্জাম পৌঁছাতে স্থলভিত্তিক রোবটই প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। সৈন্যরা কোয়াড বাইকে দ্রুত চলাচল করছে। ৩৪ বছর বয়সী সেনাসদস্য ওলেক্সান্দর কসমিন বলেন, পরিস্থিতি এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে সাধারণ যানবাহনে নিহত ও আহতদের সরিয়ে নেওয়া যায় না। সবকিছুই হেঁটে করতে হয়।
কাছাকাছি এলাকায় বেসামরিক জীবনও দ্রুত ভেঙে পড়ছে। কোস্তিয়ানতিনিভকার উত্তরে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরের দ্রুঝকিভকায় বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে। একটি আবাসিক সড়কে একটি ভ্যানের ভেতর স্বামী-স্ত্রীকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। রুশ ড্রোনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ওই গাড়ির ছাদে বেসামরিক যান হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য বাঁধা সাদা ফিতা তখনও উড়ছিল। ৫৯ বছর বয়সী লারিসা সেরেদা পুলিশি উদ্ধার গাড়িতে বসে বলেন, তিনি ভয়ে এলাকা ছাড়ছেন কারণ আকাশে ড্রোন উড়ছে। তবে যুদ্ধ শেষ হলে তিনি বাড়িতে ফিরে আসার আশা করছেন।
এদিকে ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রও চাপের মুখে পড়ছে। ইউক্রেন ক্রিমিয়ায় সরবরাহপথ এবং রাশিয়ার তেল খাতে দীর্ঘপাল্লার হামলা বাড়িয়েছে। রুশ-নিয়ন্ত্রিত এলাকার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কৃষ্ণসাগরীয় উপদ্বীপ ক্রিমিয়ায় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে এবং ব্যক্তি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছে জ্বালানি বিক্রি স্থগিত রাখা হয়েছে।
বৃহত্তর যুদ্ধক্ষেত্রে রুশ বাহিনীকে অতিরিক্ত বিস্তৃত অবস্থানে দেখা যাচ্ছে। ইউক্রেনীয় বিশ্লেষক মাইকুলার দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই সামনের সারির হামলায় মাত্র একজন বা দুজন সৈন্য অংশ নিচ্ছে। তবে দোনেৎস্ক অঞ্চলে ক্রেমলিন-সমর্থিত প্রশাসনের প্রধান দেনিস পুশিলিন রয়টার্সকে বলেন, আরও শহর দখলের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তাঁর মতে, অগ্রগতি দ্রুত হচ্ছে নাকি ধীরে হচ্ছে, সেটিই আসল বিষয় নয়।
অপরদিকে ইউক্রেনের হামলা, এমনকি মস্কোর ভেতরেও আঘাত বাড়তে থাকায় রুশ কট্টরপন্থী মহল পুতিনকে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত শান্তি প্রক্রিয়া থেকে সরে এসে যুদ্ধ আরও জোরদার করার আহ্বান জানাচ্ছে।