জার্মানির রাজধানী বার্লিনে বার্ষিক প্রাইড (এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়) উৎসবের ঠিক শেষ মুহূর্তে এক ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় অন্তত একজন নারী নিহত এবং আরও ২৯ জন আহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় গত শনিবার (২৫ জুলাই) রাতের এই ঘটনায় পুরো জার্মানিতে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
জার্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেক্সান্ডার ডোব্রিন্ডট জানিয়েছেন, এটি একটি ‘ইসলামপন্থী সন্ত্রাসীদের হামলা’। ঘটনার পর থেকে ২১ বছর বয়সী এক সন্দেহভাজন যুবককে ধরতে দেশজুড়ে ব্যাপক অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ।
যেভাবে ঘটেছিল হামলা
শনিবার রাত ১০টার ঠিক আগে বার্লিনের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত বিখ্যাত টিয়ারগার্টেন পার্কের দক্ষিণাংশে ক্রিস্টফার স্ট্রিট ডে (সিএসডি) উদ্যাপনের শত শত মানুষের ওপর একটি সাদা রঙের গাড়ি তুলে দেওয়া হয়। গাড়িটি একটি গাছের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খেয়ে থামার পর চালক গাড়ি থেকে নেমে পড়ে এবং হাতে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর এলোপাতাড়ি আক্রমণ চালায়।
এই হামলায় ২৯ জন গুরুতর আহত হন, যাদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। ঘটনাস্থলটি কড়া নিরাপত্তার মধ্যে থাকা সিএসডি প্যারেড রুট এবং ব্রান্ডেনবার্গ গেটের মূল মঞ্চ থেকে মাত্র কয়েক শ মিটার দূরে অবস্থিত ছিল।
ক্রিস্টোফার স্ট্রিট ডে বা সিএসডি হলো সমকামী, উভকামী ও রূপান্তরকামী নারী-পুরুষ এবং কুইয়ার (এলজিবিটিকিউ) সম্প্রদায়ের মানুষের একটি বার্ষিক উৎসব। এই দিনে তাঁরা সমান অধিকারের দাবি, বৈষম্য-বঞ্চনার বিরুদ্ধে ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার পক্ষে মিছিল-সমাবেশ ও নানা কর্মসূচি আয়োজন করেন। জার্মানিতে এই দিনটিতে সবচেয়ে বড় মিছিল হয় বার্লিন ও কোলন শহরে।
সন্দেহভাজন কে এই আবদুল বালৌত
জার্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই হামলার মূল সন্দেহভাজন হলেন ২১ বছর বয়সী আব্দুল বালৌত। তিনি লেবানিজ বংশোদ্ভূত একজন জার্মান নাগরিক।
পুলিশ ও গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আবদুল বালৌত আগে থেকেই উগ্রবাদ এবং বিভিন্ন অপরাধের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে ছিল। গত মে মাসেই ইসলামিক স্টেটে (আইএস) যোগ দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টার অভিযোগে তাঁর একটি সাজা হয়েছিল। পরে সেটির রায় স্থগিত ছিল।
পুলিশ তাঁর বিবরণ দিয়ে জানিয়েছে, সে প্রায় ১ দশমিক ৯০ মিটার (৬ ফুট ২ ইঞ্চি) লম্বা, পাতলা গড়নের এবং কালো চুলের অধিকারী। ঘটনার সময় তাঁর পরনে ছিল কালো হুডি ও সাদা প্যান্ট।
পলাতক এই সন্দেহভাজনের খোঁজে বার্লিনের বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি দেশের সব বিমানবন্দর, ট্রেন স্টেশন ও সীমান্ত এলাকায় রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে।
এই হামলার পর জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্ৎস এক বিবৃতিতে দেশবাসীকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এই সন্ত্রাসীদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আমাদের সমাজে বিভাজন তৈরি করা।’ নিহতদের স্মরণে বার্লিনের মারিয়েনকির্চে গির্জায় বিশেষ স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং জার্মান বুন্দেসবাগের (সংসদ ভবন) জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে।
এদিকে এই ঘটনার পর অভিবাসন নীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে দেশটিতে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধী দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানির (এএফডি) আইনপ্রণেতারা সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ বলে সমালোচনা করেছেন। তবে শত শঙ্কার মধ্যেও এলজিবিটিকিউ সম্প্রদায়ের মানুষেরা জানিয়েছেন, তাঁরা আগামী বছর আরও জাঁকজমকভাবে এই উৎসবে অংশ নেবেন। সন্ত্রাসীদের কাছে কখনো মাথানত করবেন না।