রাতভর ইউক্রেনে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, হামলায় রাজধানী কিয়েভে তিনজন নিহত হয়েছে। আর দেশজুড়ে প্রায় ছয় লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন। বুধবার ভোররাতে এসব হামলা চালানো হয়।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি আরও বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার দাবি করেছিলেন, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের সমঝোতা কার্যকর হয়েছে। অথচ এ দিকে রাজধানী কিয়েভ ও এর আশপাশের অঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালানো হয়েছে।
কিয়েভে তিনজন নিহত হলেও রাশিয়া বলেছে, তাদের ব্যাপক হামলায় ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত যোগাযোগ ও জ্বালানি স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
এ দিকে স্টারলিংক যোগাযোগব্যবস্থায় গতিসীমা আরোপের কারণে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক অভিযান ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জেলেনস্কির এক উপদেষ্টা। বুধবার টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে সেরহি বেসক্রেস্তনভ বলেন, ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স রাতারাতি স্টারলিংক টার্মিনালগুলোর ওপর গতিসীমা আরোপ করেছে।
তিনি আরও বলেন, ‘ইউক্রেনের সেনাদের এ বিষয়ে আগে থেকে জানানো হয়নি। এটা স্পষ্ট যে এ পদক্ষেপ কোনো কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে না। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।’
ঘণ্টায় ১০০ মাইল বা ১৬০ কিলোমিটার গতিসীমার কারণে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি সামরিক অভিযান ব্যাহত হয়েছে বলেও জানান জেলেনস্কির উপদেষ্টা।
পরবর্তী আরেকটি পোস্টে তিনি জোর দিয়ে বলেন, রাশিয়ার নতুন প্রযুক্তির জেট ইঞ্জিনচালিত ড্রোনগুলোকে আকাশেই ধ্বংস করতে ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্টারলিংক সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।
পরে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বিবিসিকে জানায়, গত রাতে ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে স্টারলিংক সংযোগ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ শনাক্ত করা হয়েছে। তবে ঠিক কত গতির পর এ সীমাবদ্ধতা কার্যকর হচ্ছে, তা এখনো যাচাই করা হচ্ছে।
সূত্রটি আরও জানায়, এ পরিস্থিতিতে সামরিক অভিযান উল্লেখযোগ্যভাবে জটিল হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে রসদ সরবরাহ, চালকবিহীন ব্যবস্থার ব্যবহার, মাঝারি পাল্লার হামলা এবং অন্যান্য কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সমস্যাটির ‘মূল কারণ’ খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানায় সূত্রটি।
ইউক্রেনের সেনাদের ইন্টারনেট সংযোগ দিতে স্টারলিংক এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। এর সাহায্যে সেনারা রুশ লক্ষ্যবস্তুর দিকে পাঠানো ড্রোন কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
গত ফেব্রুয়ারিতে রুশ বাহিনীর জন্য স্টারলিংক ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন ইলন মাস্ক। এতে ইউক্রেনে রাশিয়ার অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয় এবং রুশ সামরিক কমান্ডারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। স্টারলিংকের গতি সীমিত করার খবর নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স।
জেলেনস্কি এর আগে বলেছেন, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের সমঝোতায় সই না করলে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান সীমিত করার হুমকি দিয়েছিল। তবে মঙ্গলবার ট্রাম্প অস্বীকার করেন, ওয়াশিংটন ইউক্রেনের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি বন্ধ রেখেছে।
ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, রাতভর রাশিয়া ৩৯টি ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১২৮টি ড্রোন ছুড়েছে। এর মধ্যে চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১১৫টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
টানা দ্বিতীয় রাতের মতো রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হলো কিয়েভ। এর মধ্যেই বুধবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহামের সঙ্গে ডাউনিং স্ট্রিটে বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন জেলেনস্কি। কিয়েভে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সরবরাহ ত্বরান্বিত করার বিষয়ে ওই বৈঠকে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
গত দুই রাতেই কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইউক্রেনের রাজধানীতে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সতর্কসংকেত বাজানোর আগেই এসব হামলা হয়েছে।
রুশ ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে সতর্কসংকেত জারি করা এবং সেগুলো ভূপাতিত করার চেষ্টা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের স্যাটেলাইট ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে ইউক্রেন।
অন্যদিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রাতভর রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ইউক্রেনের ৯০২টি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। এসব অঞ্চলের মধ্যে রাজধানী মস্কো এবং ২০১৪ সালে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপদ্বীপ ক্রিমিয়াও রয়েছে।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছিলেন, ‘অবিলম্বে রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধের ক্ষেত্রে জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের সমঝোতা কার্যকর হচ্ছে। উভয় পক্ষ এতে সম্মত হয়েছে। এটি ভঙ্গ করবেন না!’
এরপর থেকে জেলেনস্কি বারবার বলে আসছেন, মস্কো একই পদক্ষেপ নিলে ইউক্রেনও রাশিয়ার তেল শোধনাগার ও অন্যান্য জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ করতে প্রস্তুত। তবে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেছেন, যুদ্ধবিরতির ফলে যে ‘সাময়িক স্বস্তি’ তৈরি হবে, ইউক্রেন তার যোগ্য নয়। তিনি আরও বলেন, কোনো যুদ্ধবিরতি হলে ইউরোপ ইউক্রেনে ‘নতুন অস্ত্রের জোগান বাড়াতে’ পারবে, যার ফলে দেশটি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।