অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন কোনো আপত্তি জানায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা এবং পশ্চিমা কূটনীতিকরা এ তথ্য জানিয়েছেন। মার্কিন সংবাদমাদ্যম অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
যুক্তরাজ্যের এই উদ্যোগে আরও ১১টি পশ্চিমা দেশ যোগ দিয়েছে। ওয়াশিংটনের এই উদ্যোগে বাধা না দেওয়াকে পশ্চিম তীরে নেতানিয়াহু সরকারের নীতির প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের হতাশার একটি ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে, গতকাল মঙ্গলবার যুক্তরাজ্য ঘোষণা করে—পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি নির্মাণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তারা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি বসতিগুলো থেকে পণ্য আমদানির ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেবে যুক্তরাজ্য।
নেতানিয়াহু সরকার অধিকৃত পশ্চিম তীরের সংবেদনশীল বসতি এলাকা ‘ই১ ’–এ নতুন একটি ইসরায়েলি বসতি নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ই১ এলাকায় বসতি নির্মাণ হলে পশ্চিম তীর কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাবে এবং ভবিষ্যতে কোনো স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে তার ভূখণ্ডের মধ্যে ভৌগোলিক সংযোগ বা ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের পরপর দুই দলীয় সরকার, অর্থাৎ রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় প্রশাসনই ই১ এলাকায় ইসরায়েলি বসতি নির্মাণের বিরোধিতা করে এসেছে।
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে কানাডা, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, আইসল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্পেন ও সুইডেন ঘোষণা দিয়েছে যে—তারা অধিকৃত পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতিগুলো থেকে পণ্য বাণিজ্যের ওপর নিজ নিজ দেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার অথবা ইউরোপীয় পর্যায়ে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা সমর্থন করার উদ্যোগ নেবে।
এদিকে পশ্চিম তীরের বসতি নিয়ে যুক্তরাজ্যের পদক্ষেপের জবাবে নেতানিয়াহু সরকার ইসরায়েলের পূর্ব জেরুজালেমের ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে। এই কনস্যুলেট ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার দায়িত্বে ছিল। এ ছাড়া ইসরায়েল ব্রিটিশ কূটনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদেরও বহিষ্কার করেছে। এসব কর্মকর্তা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন গাজা বিষয়ক একটি টাস্কফোর্সে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে পরিচালিত ব্রিটিশ সামরিক প্রশিক্ষণ মিশনও বন্ধ করে দিয়েছে নেতানিয়াহু সরকার।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। এই ফোনালাপ সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প বার্নহামকে এই উদ্যোগ থেকে সরে আসতে বলেননি এবং সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্যও কোনো অনুরোধ করেননি।
সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা তাদের ব্রিটিশ নেতাদের বলেছেন, পশ্চিম তীর নিয়ে নেতানিয়াহু সরকারের নীতির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রও তাদের উদ্বেগের সঙ্গে একমত। তবে নির্দিষ্ট এই নিষেধাজ্ঞাগুলোর বিষয়ে ওয়াশিংটনের মত এক নয়।
মঙ্গলবার সাংবাদিকরা যুক্তরাজ্যের পদক্ষেপ নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে প্রশ্ন করেন। তবে তিনিও যুক্তরাজ্যের সিদ্ধান্তের নিন্দা করেননি। রুবিও বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি এবং তিনিও করেননি। যুক্তরাজ্য যে এই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে আগে জানানো হয়েছিল এবং কেন তারা এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেই ব্যাখ্যাও ওয়াশিংটন শুনেছে। রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো স্থিতিশীলতা। মধ্যপ্রাচ্যের এই নাজুক সময়ে পশ্চিম তীরে সহিংসতা বা উত্তেজনা বেড়ে যাক, তারা তা চান না।
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউস ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবির মন্তব্য থেকেও নিজেদের দূরে সরিয়ে নেয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাকাবি যুক্তরাজ্যের নতুন নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা অ্যাক্সিওসকে বলেন, হাকাবির ওই মন্তব্য হোয়াইট হাউস বা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে দেওয়া হয়নি।
হাকাবি বলেন, যুক্তরাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্ত ইহুদি জনগণের বিরুদ্ধে বৈষম্যের শামিল। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য যদি সত্যিই তাদের কাছে ভুল মনে হওয়া বিষয়গুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী হয়, তাহলে উত্তর কোরিয়া, চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা কোথায়? হাকাবি আরও বলেন, যুক্তরাজ্যের এই পদক্ষেপ একটি অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত। তবে বাস্তবতা হলো, যুক্তরাজ্য এর আগে রাশিয়া, উত্তর কোরিয়া ও চীনের বিরুদ্ধেও বহুবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের অবস্থানের এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে অবস্থান করছে, অন্যদিকে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে নেতানিয়াহু সরকারের নীতির প্রতি নিজেদের উদ্বেগও প্রকাশ করছে।