ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের কাছে ড্রোন প্রযুক্তির একটি প্রদর্শনীতে রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এ হামলাসহ ইউক্রেনজুড়ে একাধিক হামলায় অন্তত ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, দিনের আলোতে চালানো ওই হামলায় শতাধিক আহত হয়েছেন। প্রদর্শনীটিতে প্রতিরক্ষা খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা ছিলেন বলেও জানান তিনি।
তবে কিয়েভে প্রদর্শনীতে হামলার পর ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সেরহি বেস্ক্রেস্তনভ, যিনি ‘ফ্ল্যাশ’ নামেও পরিচিত এবং ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর প্রযুক্তি উন্নয়নে যুক্ত লিউবা শিপোভিচের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। তবে পরে তাঁরা দুজনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তাঁরা নিরাপদ আছেন। বেস্ক্রেস্তনভ বলেন, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে তিনি ওই অনুষ্ঠানে যাননি।
ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর মুখপাত্র ইউরি ইহনাত দেশটির টেলিভিশনকে জানান, এই হামলায় তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল, যার মধ্যে মাত্র একটি প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে।
রাশিয়াও এই হামলার সত্যতা স্বীকার করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দীর্ঘপাল্লার উচ্চনির্ভুল অস্ত্র ব্যবহার করে এমন একটি স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে, যেখানে রাশিয়ার বেসামরিক স্থাপনায় হামলার জন্য ব্যবহৃত ড্রোন প্রদর্শন করা হচ্ছিল।
তারা আরও জানায়, প্রদর্শনীতে ড্রোন নির্মাতাদের পাশাপাশি ইউক্রেনের ড্রোন ইউনিট এবং নিরাপত্তা সংস্থার এমন প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন, যারা ‘রাশিয়ার ভূখণ্ডে হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সরাসরি জড়িত’।
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর এ ধরনের প্রদর্শনীতে এটিই অন্তত তৃতীয় হামলা।
তবে এ ধরনের উন্মুক্ত আয়োজন এবং তার ব্যাপকভাবে প্রচার করার বিষয়টি নিয়ে ইউক্রেনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনাটির তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি। ইউক্রেনের প্রসিকিউটর জেনারেলের কার্যালয় জানিয়েছে, কে এই অনুষ্ঠান আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এবং কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ ছাড়া পূর্বাঞ্চলীয় শহর স্লোভিয়ানস্কে রাশিয়ার গ্লাইড বোমা হামলায় আরও পাঁচজন নিহত হয়েছেন। শনিবার ভোরে উত্তরাঞ্চলীয় শহর সুমিতে আরও দুই পুরুষের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সামরিক কর্তৃপক্ষ।
এর আগে শুক্রবার সন্ধ্যায় জেলেনস্কি জানান, রাশিয়া আরেকটি বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে তিনি গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছেন। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই এই হামলা হতে পারে।
এদিকে শুক্রবার ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার কিরভ শহরে ছয়জন নিহত এবং ২৬ জন আহত হয়েছেন। শহরটি সীমান্ত থেকে এক হাজার কিলোমিটারেরও বেশি (৬০০ মাইল) দূরে। এ ছাড়া রাশিয়ার সর্ববৃহৎ অনলাইন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘ওয়াইল্ডবেরিজ’-এর গুদামেও হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন।
জেলেনস্কির দাবি, কিরভে ইউক্রেন ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলোর একটি’তে আঘাত হেনেছে। ওই স্থাপনায় এমন যন্ত্রাংশ তৈরি হতো, যা ইউক্রেনের ওপর হামলায় ব্যবহৃত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রের সরঞ্জামে ব্যবহৃত হয়।
শুক্রবার সেন্ট পিটার্সবার্গ এলাকায় ওয়াইল্ডবেরিজের অন্তত দুটি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। অনলাইন খুচরা বিক্রেতা এই প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলায় রাশিয়ার বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
তেলের ডিপো ও শোধনাগারে মাসের পর মাস ড্রোন হামলা চালানোর পর এখন কিয়েভ বলছে, তারা ওয়াইল্ডবেরিজ পরিচালিত কেন্দ্রগুলোর মতো সরবরাহ ও লজিস্টিকস হাবকে লক্ষ্যবস্তু করছে। কারণ, এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। এর উদ্দেশ্য রুশ সেনাবাহিনীর সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত করা।
এদিকে, আগামী সপ্তাহে জেলেনস্কির যুক্তরাষ্ট্র সফরের কথা রয়েছে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার তাঁর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। ওয়াশিংটন ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে শান্তি আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র লরা লুমার বর্তমানে কিয়েভে অবস্থান করছেন। তিনি শুক্রবার জেলেনস্কির সাক্ষাৎকার নেন। লুমার জানান, জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহামের শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।