মস্কো ও আশপাশের এলাকায় রাতভর ৬২০ টিরও বেশি ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। এই ঘটনার পরপরই রাশিয়া ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। রুশ কর্মকর্তাদের দাবি, ইউক্রেনের এসব হামলায় ব্রিটিশ তৈরি ড্রোনও ব্যবহার করা হচ্ছে। ইউক্রেনকে ড্রোন সরবরাহের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য সরাসরি সংঘাতকে আরও উসকে দিচ্ছে অভিযোগ তুলে মস্কো বলেছে, লন্ডনের এই পদক্ষেপের ‘পরিণতি’ অনিবার্য এবং এর জন্য যুক্তরাজ্যকে ‘মূল্য চোকাতে হবে’।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, রাশিয়ার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন—গতকাল রোববার দিবাগত রাতে মস্কোকে লক্ষ্য করে ৬২০ টিরও বেশি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে রুশ রাজধানীর ওপর ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় হামলাগুলোর একটি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানিয়েছেন, সোমবার সন্ধ্যা থেকে মঙ্গলবার ভোর ৫টা পর্যন্ত রাজধানী অঞ্চলের আকাশে রুশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ১৮০টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। পরে রাজধানীর দিকে আসার পথে আরও ১৭টি ড্রোন ধ্বংস করা হয় বলেও জানান তিনি। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাস এই হামলাকে গত দুই বছরের মধ্যে মস্কোর ওপর সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলা হিসেবে বর্ণনা করেছে।
মস্কো অঞ্চলের গভর্নর আন্দ্রেই ভোরোবিওভ টেলিগ্রামে জানিয়েছেন, ড্রোন হামলায় তিনজন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১০ বছরের একটি মেয়েও রয়েছে। তিনি বলেন, সবচেয়ে গুরুতর ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে পাভলভস্কি পোসাদ জেলায়, যেখানে একটি বাড়িতে আগুন ধরে যায়। বোগোরোদস্কি জেলায় আরও কয়েকটি বাড়ি ও একটি অতিথিশালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও জানান তিনি।
মঙ্গলবারের ড্রোন হামলায় মস্কোর পূর্বদিকে অবস্থিত ই-কমার্স জায়ান্ট ওয়াইল্ডবেরিজের একটি গুদামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ভবনের দেয়ালে ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ আঘাত হানার পর তাদের লজিস্টিকস কমপ্লেক্সে ‘সামান্য ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেন ওয়াইল্ডবেরিজের একাধিক গুদামে হামলা চালিয়েছে। কিয়েভের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি রাশিয়ার ড্রোন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান সরবরাহ করে।
এদিকে, ইউক্রেনের বিমানবাহিনী জানিয়েছে, রাতভর চালানো ১৪৭টি ‘শত্রু’ ড্রোন হামলার মধ্যে ১১১টি ড্রোন তারা ভূপাতিত বা নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়েছে। খারকিভ অঞ্চলের গভর্নর ওলেহ সিনিয়েহুবভ জানিয়েছেন, রাশিয়ার রাতভর হামলায় ইজিয়ুম শহরে পাঁচজন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৯ বছরের একটি ছেলেও রয়েছে।
অপরদিকে, রুশ ড্রোনের হামলায় কিয়েভ অঞ্চলের ব্রোভারি শহরে আগুন ধরে যায় এবং বেশ কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার মধ্যে একটি অফিস ভবন ও কয়েকটি গুদাম রয়েছে বলে জানিয়েছেন শহরের মেয়র ইহোর সাপোজকো।
যুদ্ধের সম্মুখসারিতে লড়াই প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে এবং শান্তি আলোচনা কার্যত থমকে আছে। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া ও ইউক্রেন দূরপাল্লার হামলা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা ২০২২ সালের যুদ্ধের প্রথম কয়েক মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, শুধু জুলাই মাসেই ইউক্রেনে ৪৩৭ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। ২০২২ সালের মে মাসের পর এটি কোনো এক মাসে বেসামরিক নিহতের সর্বোচ্চ সংখ্যা। রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জুলাই মাসে ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ায় ৭৯ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। আগের মাসের তুলনায় এই সংখ্যা বেড়েছে।
ব্রিটিশ তৈরি ড্রোন রাশিয়ার ভূখণ্ডে চালানো হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়ার পর রাশিয়া যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে ‘ইচ্ছাকৃতভাবে ইউক্রেন সংকটকে আরও উত্তেজনার দিকে ঠেলে দেওয়ার’ অভিযোগ তুলেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে অবস্থিত রুশ দূতাবাস এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘এভাবে যুক্তরাজ্য রক্তাক্ত অপরাধ ও সন্ত্রাসী হামলার সহযোগী এবং সহ-অপরাধী হিসেবে কাজ করছে।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘লন্ডনের পদক্ষেপের অনিবার্য পরিণতি হবে, যার জন্য তাদের জবাবদিহি করতে হবে।’ রাশিয়া আরও সতর্ক করে বলেছে, সংঘাতে যুক্তরাজ্যের সম্পৃক্ততা যত গভীর হবে, ‘তত বেশি মূল্য’ দেশটিকে চোকাতে হবে।
জবাবে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বিবিসি নিউজকে জানিয়েছেন, ব্রিটেন ইউক্রেনের পাশে ‘কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’ দাঁড়িয়ে আছে। বিবৃতিতে ওই মুখপাত্র বলেন, ‘রাশিয়ার কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয় যে, ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এবং যুক্তরাজ্য ও আমাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে রুশ আগ্রাসনের মোকাবিলায় এই সরকারের দৃঢ় সংকল্প রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ (রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির) পুতিনের অবৈধ আগ্রাসন থেকে নিজেদের রক্ষা করতে ইউক্রেনের যে সরঞ্জাম প্রয়োজন, তা সরবরাহ করতে যুক্তরাজ্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে ফের পাল্টাপাল্টি হামলার খবরের মধ্যেই যুক্তরাজ্যকে রাশিয়ার এই হুঁশিয়ারি দেওয়া হলো। দুটি পৃথক ব্রিটিশ কোম্পানি তৈরি করা ওই ড্রোনগুলো রাশিয়ার ভূখণ্ডের ভেতরে ব্যাপকভাবে এবং সফলভাবে সামরিক ও শিল্প স্থাপনায় হামলা চালাতে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে তেল শোধনাগার এবং অনলাইন খুচরা বিক্রেতা ওয়াইল্ডবেরিজের গুদামও রয়েছে।