স্পেনের দুর্গম পাহাড়ে নেকড়ের দলে ১২ বছর কাটিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচিত হওয়া মার্কোস রদ্রিগেজ পানতোজা মারা গেছেন। ‘স্পেনের মোগলি’ নামে পরিচিত মানুষটির বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। ১৫ আগস্ট স্পেনের উত্তরাঞ্চলীয় ওউরেন্স প্রদেশে তাঁর মৃত্যু হয়।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) ডেইলি মেইলের প্রতিবেদনে বলা হয়, পানতোজার জীবনকাহিনি যেন রূপকথাকেও হার মানায়। মাত্র সাত বছর বয়সে ১৯৫৪ সালে তাঁকে স্পেনের সিয়েরা মোরেনা পাহাড়ি এলাকায় ছাগল চরানোর কাজে পাঠানো হয়। এর আগে তাঁর মা সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যান এবং পরে নির্যাতনকারী বাবা অন্য এক নারীর কাছে চলে যান।
পাহাড়ে এক বৃদ্ধ ছাগলপালকের কাছ থেকে আগুন জ্বালানো ও প্রয়োজনীয় কিছু সরঞ্জাম তৈরির কৌশল শিখেছিলেন পানতোজা। কিন্তু একসময় ওই বৃদ্ধও মারা যান। এরপর সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়ে ছোট্ট ছেলেটি।
বেঁচে থাকার জন্য তিনি তখন পশুপাখিদের অনুসরণ করতে শুরু করেন। কোন ফল বা গাছের শিকড় খাওয়া যায়, তা প্রাণীদের দেখেই শিখেছিলেন। একসময় একটি মা নেকড়ে তাঁকে খাবার দিতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে তাঁকে নিজের দলের সদস্য হিসেবে গ্রহণ করে।
২০১৩ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পানতোজা স্মরণ করেছিলেন সেই মুহূর্তের কথা। তিনি জানান, নেকড়েটি তাঁর শাবকদের মাংস খাওয়ানোর পর তাঁর দিকেও এক টুকরা মাংস ছুড়ে দেয়। ভয় পেলেও পরে সেটি খেয়ে ফেলেন তিনি। এরপর নেকড়েটি তাঁকে জিভ দিয়ে চেটে দেয়। পানতোজার ভাষায়, এর পর থেকেই তিনি যেন সেই পরিবারের একজন হয়ে যান।
পাহাড়ে তাঁর সঙ্গী ছিল একটি সাপও। ছাগলের দুধ খাওয়ানোর কারণে সাপটি প্রায়ই তাঁর পেছনে পেছনে ঘুরত বলে তিনি দাবি করেছিলেন।
১৯৬৫ সালে, ১৯ বছর বয়সে স্পেনের সিভিল গার্ড তাঁকে খুঁজে পায়। তত দিনে তিনি প্রায় ১২ বছর কোনো মানুষের সংস্পর্শ ছাড়াই কাটিয়েছেন। তাঁকে অর্ধনগ্ন ও খালি পায়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতে দেখা গিয়েছিল। মানুষের ভাষার বদলে তিনি মূলত গোঁ গোঁ শব্দে যোগাযোগ করতেন।
পাহাড় থেকে তাঁকে জোর করে নিয়ে আসতে হয়েছিল। পানতোজার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি নেকড়ের মতো চিৎকার করতেন এবং কামড়ানোর চেষ্টা করতেন। সভ্য সমাজে ফিরে আসাই ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভীতিকর অভিজ্ঞতা।
পরে একটি এতিমখানায় পানতোজাকে আবার সোজা হয়ে হাঁটা, টেবিলে বসে খাওয়া ও কথা বলা শেখানো হয়। গাড়ির শব্দ, জনসমাগম, এমনকি বিছানায় ঘুমানোও তাঁকে আতঙ্কিত করত।
পরবর্তী জীবনে তিনি সেনাবাহিনীতে কাজ করেন, রাখাল ও হোটেলশিল্পেও কর্মরত ছিলেন। তবে সমাজের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেননি কখনোই। বহু বছর পর পাহাড়ে ফিরে গেলেও দেখেন, তাঁর পরিচিত গুহার জায়গায় তৈরি হয়েছে বাড়িঘর ও বৈদ্যুতিক গেট। সবচেয়ে বেদনাদায়ক ছিল—নেকড়েরাও আর তাঁকে নিজেদের একজন হিসেবে গ্রহণ করেনি।
২০১০ সালে তাঁর অসাধারণ জীবনকাহিনি নিয়ে স্পেনে নির্মিত হয় চলচ্চিত্র—‘Among Wolves’।