হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত

আবু তাহের খান 

প্রতীকী ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বহুবিতর্কিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড-এআরটি) গত ৯ ফেব্রুয়ারি সই হলেও এর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক গত বছরের ২ এপ্রিল বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর বর্ধিত হারে শুল্ক আরোপের পর থেকেই। বস্তুত ওই বর্ধিত শুল্ক আরোপের বিষয়টিই হচ্ছে এ চুক্তির পটভূমি এবং সেই থেকে প্রায় এক বছর ধরে এ নিয়ে দেশব্যাপী ব্যাপক বিতর্ক চলছে। আর এত দীর্ঘ সময় ধরে এ নিয়ে আলোচনা চলমান থাকার পরিপ্রেক্ষিতে দেশের অধিকাংশ সাধারণ মানুষেরও এখন চুক্তিটির ভেতরকার অনেক খুঁটিনাটি সম্পর্কে কমবেশি জানা হয়ে গেছে। এবং সেই সুবাদে জনগণ যখন দেখতে পাচ্ছে যে গত ৫৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো সরকার কর্তৃক এ ধরনের রাষ্ট্রস্বার্থবিরোধী চুক্তি আর একটিও সই হয়নি এবং ভবিষ্যৎ পরিণামের ভয়াবহতার বিবেচনায় এর ধারেকাছেও আর কোনো চুক্তি নেই, তখন দল-মতনির্বিশেষে এ চুক্তি নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও বিরক্তির পরিমাণ দিন দিনই বাড়ছে।

রাষ্ট্রের কোনো বাণিজ্যিক বা অর্থনৈতিক ইস্যুতে জনসাধারণের মধ্যে এ ধরনের ব্যাপকভিত্তিক বিরূপ প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশে এর আগে আর কখনো দেখা গেছে বলে বয়সী নাগরিকেরাও স্মরণ করতে পারবেন বলে মনে হয় না। এ নাগরিক অসন্তুষ্টি ও ক্ষোভের সঙ্গে ২০২০ সালে ভারত সরকার কর্তৃক কৃষিপণ্য ক্রয়ের বিষয়ে বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানিকে দেওয়া সুবিধার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। বহুজাতিক কোম্পানিকে একচেটিয়া সুবিধাদানের জন্য নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় মেয়াদের বিজেপি সরকার সে সময়ে লোকসভায় তিনটি বিল উত্থাপন করেছিল, যার সবকটিই ছিল চরমভাবে কৃষক স্বার্থবিরোধী। এর প্রতিবাদে করোনা মহামারির সেই দুর্যোগের মধ্যেও ২০২০ সালের নভেম্বরে পাঞ্জাবের কৃষকেরা কোনো প্রকার দলীয় সমর্থন ও সংশ্লিষ্টতা ছাড়াই রাস্তায় নেমে আসেন, যে বিক্ষোভ পরবর্তী সময়ে হরিয়ানাসহ ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় বছরব্যাপী চলা ওই অরাজনৈতিক আন্দোলনের তীব্রতার মুখে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০২১ সালের জানুয়ারিতে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ওই বিলসমূহ স্থগিত করে রুল জারি করেন এবং শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালের ২৯ নভেম্বর লোকসভায় ওই বিলগুলো বাতিলের বিল পাস হয়। উল্লেখ্য, শুধু নিজেদের অর্থনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যেই বছরব্যাপী চলা ওই অরাজনৈতিক আন্দোলনে ৭৫০ জনের বেশি কৃষক নিহত হয়েছিলেন এবং আহত হয়েছিলেন কয়েক হাজার।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তির সঙ্গে ভারতের কৃষক আন্দোলনের তুলনা টেনে এ বিষয়ে বাংলাদেশের নতুন সরকারকে বেকায়দায় ফেলার বিন্দুমাত্র ও দূরতম কোনো উদ্দেশ্যও এ লেখার মধ্যে নিহিত নেই। বরং নতুন সরকার যাতে গোড়া থেকেই পর্যাপ্ত সাবধানতার সঙ্গে পথ চলতে পারে, সে জন্য একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে প্রসঙ্গটি উত্থাপন করা হলো। আশা করব যে সরকার এটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণে এগিয়ে আসবে। আর এ সুবাদে শুধু এইটুকু স্মরণ রাখতে বলব যে অরাজনৈতিক অর্থনৈতিক ইস্যুও যে অনেক সময় বড় মাপের জন-অসন্তুষ্টির কারণ হতে পারে, ভারতের উল্লিখিত কৃষক আন্দোলন তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। বাংলাদেশের সরকারকে বিনীতভাবে বলি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ এখন সত্যি সত্যি প্রচণ্ডভাবে ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট। প্রয়োজনে এ ব্যাপারে একটি জরিপ চালিয়ে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করে নেওয়া যেতে পারে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচনের আগে যে চুক্তিকে ক্ষমতাসীন বিএনপি সমর্থন দিয়েছে (গোপনে হলেও), এখন সে চুক্তি থেকে তারা বেরিয়ে যাবে কেমন করে? ধারণা করি, নির্বাচনের আগে ওই সমর্থন না দিলে ১২ ফেব্রুয়ারিতে হয়তো নির্বাচনই হতো না। এমতাবস্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বৃহত্তর স্বার্থে ওই চুক্তিকে সমর্থনদান ব্যতীত তাদের সামনে সেদিন হয়তো আর কোনো উপায়ই খোলা ছিল না। ফলে তারা বস্তুত কৌশলগত কারণে নির্বাচনের আগে ওই চুক্তিকে সমর্থন করেছিল, এ তথ্যটুকু তারা জনগণকে সরাসরি জানিয়ে দিলে জনগণও সেটি সহজভাবে গ্রহণ করবে বলেই মনে হয়। আশা করব যে, সরকার সেটি করবে এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার ব্যাপারে পদ্ধতিমাফিক প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ গ্রহণ করবে। উল্লেখ্য, ওই চুক্তির ৬.৬ নম্বর অনুচ্ছেদের শর্ত অনুযায়ী চুক্তি স্বাক্ষরের ৬০ দিনের মধ্যে ভিন্ন কোনো মতামত উপস্থাপিত না হলে পরবর্তী দিন থেকেই তা কার্যকর হয়ে যাবে। হতাশার সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে আজ এ চুক্তির ৬০তম দিন পেরিয়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে আগামীকাল থেকে এর পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতা শুরু হবে।

তবে এরূপ চরম হতাশার মধ্যেও আশার আলো টিকিয়ে রেখেছে চুক্তির ৬.৫ নম্বর অনুচ্ছেদ, যেখানে ৬০ দিনের লিখিত নোটিশ দিয়ে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে, যেমনটি করেছে মালয়েশিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গত বছরের ২৫ অক্টোবর স্বাক্ষরিত অনুরূপ বাণিজ্য চুক্তি থেকে মালয়েশিয়া গত ১৮ মার্চ পুরোপুরিভাবে বেরিয়ে গেছে। ২২২ সদস্যবিশিষ্ট মালয়েশিয়ার জাতীয় সংসদে কোনো রকমে মাত্র ৮১ সদস্যের অতিক্ষীণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতাসীন দল পাকাতান হারাপান (পিএইচ) যদি ওই চুক্তি বাতিল করে দিতে পারে, তাহলে ২১২ সদস্যের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি তা পারবে না কেন? তা ছাড়া, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে স্বাক্ষরিত চুক্তির দায় বর্তমান নির্বাচিত সরকার গ্রহণইবা করবে কেন? বরং তা গ্রহণ করলে সেটি হবে একই সঙ্গে নতুন করে আরও দুটি অন্যায় করা, যার একটি হচ্ছে এখতিয়ারবহির্ভূত অবৈধ কাজকে বৈধতাদান এবং অপরটি হচ্ছে এ চুক্তিতে দেশের স্বার্থবিরোধী যেসব শর্ত রয়েছে, বাতিলের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা মেনে নেওয়া। আশা করব, উল্লিখিত উভয় অন্যায় থেকেই সরকার নিজেদের বিরত রাখবে।

উল্লিখিত চুক্তিতে রাষ্ট্রস্বার্থবিরোধী কী কী শর্ত ও উপাদান আছে, তা নিয়ে ইতিমধ্যে এত বেশি আলোচনা হয়েছে যে সেসবের পুনরাবৃত্তি আর প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। তারপরও সারসংক্ষেপ হিসেবে ভয়ংকর এ দানবীয় চুক্তির কয়েকটি ভয়াবহ ফলাফলের কথা এখানে অতিসংক্ষেপে তুল ধরা হলো: এক. নিজেদের প্রয়োজন থাক বা না থাক, এ চুক্তির কারণে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিপুলসংখ্যক ও পরিমাণ পণ্য আগামী ৫ থেকে ১৫ বছর ধরে বাধ্যতামূলকভাবে ক্রয় করতে হবে। দুই. এমন কোনো দেশ থেকে বাংলাদেশ পণ্য ক্রয় করতে পারবে না, যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক বিরোধ রয়েছে। আর ওই শর্তের কারণেই বাংলাদেশ এখন রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ভিক্ষা করে তাদের পেছনে পেছনে ঘুরছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া মেলেনি। তিন. এ চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণে শুল্ক ছাড় দেওয়ার ফলে প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশকে বছরে ন্যূনতম ১ হাজার ৩৮০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাতে হবে। চার. চুক্তিতে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে যেসব শুল্ক ছাড় দিয়েছে, বিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ কর্তৃক অনুরূপ ছাড় এখন অন্য দেশকেও দিতে হবে এবং রাজস্ব হারানোর ঘটনা তাই অন্য দেশের সঙ্গেও ঘটবে। পাঁচ. এর বাইরে লাভজনকতা ও যাত্রী-ঝুঁকি যাচাই না করেই বিনা দরপত্রে ১৪টি বোয়িং ক্রয়সহ অন্য আরও বেশ কিছু বিষয় তো রয়েছেই।

‘ডিপ স্টেটের’ আশীর্বাদ বা পরিকল্পনায় ক্ষমতায় থাকা অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশের স্বার্থবিরোধী যে চুক্তি করে গেছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার সব বস্তুগত পরিস্থিতিই এখন দেশে বিদ্যমান রয়েছে। বৃহত্তর জনগণ চায় এটি বাতিল হোক, চুক্তির শর্তে এটি বাতিলের সুযোগ রয়েছে এবং সংসদে রয়েছে সরকারের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা। এমতাবস্থায় এই ত্রিমাত্রিক সহায়ক পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে সরকার যত দ্রুত সম্ভব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত দাসত্বমূলক বাণিজ্য চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসবে, দেশ ও জনগণের জন্য ততই মঙ্গল। আর যুক্তরাষ্ট্রকে অত ভয় পাওয়ারও যে তেমন কোনো কারণ নেই, তার কিছু নমুনা তো ইরান ইতিমধ্যে বিশ্বের সামনে হাজির করেই দিয়েছে। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অবশ্যই কোনো বৈরিতা চাই না, বরং নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ ও কৌশলী কূটনীতির স্বার্থে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কই আমাদের কাম্য। কিন্তু একই সঙ্গে যুক্তি ও ন্যায্যতার আলোকে নিজেদের সার্বভৌমত্বকেও আমরা ঊর্ধ্বে তুলে রাখতে চাই।

লেখক: সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬: বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি ও উত্তরণের পথ

বিশ্বরাজনীতির উত্তাপ ও বাংলাদেশের কৃষি

গণভোট অবৈধ হলে গণভোটের রায় কীভাবে বৈধ

সংবিধান সংশোধন বনাম সংস্কার

দেশীয় জাত সংরক্ষণে বীজ মেলা

শক্তিশালী গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন কৃষকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি

যুদ্ধ বন্ধ হলেও আমরা জ্বালানি সংকট থেকে মুক্ত হব না: অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম

সংসদ সদস্যদের কাজটা কী

পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে ভাবনা

বিচার বিভাগে ‘এআই’ ব্যবহার নীতিমালা জরুরি