হোম > বিশ্ব > চীন

বিশেষভাবে বানানো মার্কিন বোয়িং বিমানে দিল্লিতে সি, কী আছে এতে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

২৪ ঘণ্টার সফরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে গিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। ছবি: পিটিআই

১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ২৪ ঘণ্টার সফরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে গিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। সেখানে চীনা প্রেসিডেন্ট ভ্রমণ করছেন এয়ার চায়না পরিচালিত বিশেষ বোয়িং ৭৪৭-৮ উড়োজাহাজে। এ সফরে সবার নজর কেড়েছে মার্কিন উড়োজাহাজ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের তৈরি এই উড়োজাহাজটি।

চীনা প্রেসিডেন্টের মোবাইল কমান্ড সেন্টার হিসেবে পরিচিত এই রাষ্ট্রীয় উড়োজাহাজটি একটি পরিবর্তিত বোয়িং। উড়োজাহাজটি শুরুতে এয়ার চায়নার বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। ২০১৪ সালের শেষ দিকে এটি বাণিজ্যিক সেবায় যুক্ত হয়।

২০১৫ সালের মে মাসে উড়োজাহাজটিকে স্থায়ীভাবে বাণিজ্যিক সেবা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এরপর কয়েক মাস ধরে ব্যাপক পরিবর্তনের কাজ চলে। এতে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা ও বিলাসবহুল ভিআইপি অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়। ২০১৬ সালের শরৎকালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের প্রধান রাষ্ট্রীয় উড়োজাহাজ হিসেবে সেবায় যুক্ত হয়।

এর আগে চীনের নেতারা বাণিজ্যিক বোয়িং ৭৪৭-৪০০ উড়োজাহাজ ব্যবহার করতেন। কূটনৈতিক সফরের প্রায় ২০ দিন আগে চীনা উড়োজাহাজবাহিনী এসব উড়োজাহাজে সাময়িকভাবে ভিভিআইপি কেবিন স্থাপন করত। সফর শেষে জনসাধারণের জন্য পরিচালিত বাণিজ্যিক রুটে ব্যবহারের আগে সেগুলো আবার সাধারণ যাত্রীবাহী আসনে ফিরিয়ে নেওয়া হতো। বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ ব্যবহার করায় খরচ কমত এবং চীন বিদ্যমান উড়োজাহাজ পরিবহন অবকাঠামোও কাজে লাগাতে পারত।

উড়োজাহাজটির বৈশিষ্ট্য

৭৪৭-৮ উড়োজাহাজটির দৈর্ঘ্য ৭৬ দশমিক ৪ মিটার। এর সর্বোচ্চ উড্ডয়ন ওজন (এমটিওডব্লিউ) প্রায় ৪ লাখ ৪২ হাজার কেজি।

উড়োজাহাজটিতে জেনারেল ইলেকট্রিকের তৈরি চারটি GEnx-2B67 টার্বোফ্যান ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। উড়োজাহাজটির সর্বোচ্চ গতি ম্যাক ০.৮৫৫, যা ঘণ্টায় প্রায় ৯৮২ কিলোমিটারের সমান।

জ্বালানি পুনরায় নেওয়ার প্রয়োজন ছাড়াই উড়োজাহাজটি প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বা প্রায় ৮ হাজার নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত উড়তে পারে।

প্রেসিডেন্টের বাহন হিসেবে প্রস্তুত করতে উড়োজাহাজটিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। এতে স্যাটেলাইটনির্ভর সামরিক মানের এনক্রিপ্টেড যোগাযোগব্যবস্থা রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে সরকার ও সামরিক বাহিনীর কমান্ড সেন্টারগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে পারেন।

এতে উন্নত হুমকি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের পাল্টাব্যবস্থা এবং ইলেকট্রোম্যাগনেটিক পালস বা ইএমপি প্রতিরোধী ব্যবস্থা রয়েছে। এসব ব্যবস্থা পারমাণবিক মাত্রার ইলেকট্রনিক যুদ্ধের প্রভাব থেকে উড়োজাহাজের অ্যাভিওনিকস ও যোগাযোগব্যবস্থা সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করে।

ইএমপি প্রতিরোধী ব্যবস্থা বলতে এমন একধরনের উপকরণ, প্রতিবন্ধকতা ও ফিল্টারের সমন্বয়কে বোঝায়, যা শক্তিশালী ইলেকট্রোম্যাগনেটিক শক্তির আকস্মিক বিস্ফোরণ ঠেকাতে, শোষণ করতে বা অন্যদিকে সরিয়ে দিতে তৈরি করা হয়। এ ধরনের শক্তির বিস্ফোরণে ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

শুধু চীনের প্রেসিডেন্ট ও স্টেট কাউন্সিলের প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সফরের জন্য এই প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজ ব্যবহারের অনুমতি পান। অন্য রাষ্ট্রীয় নেতারা তাঁদের সফরের জন্য ভাড়ায় নেওয়া উড়োজাহাজ ব্যবহার করেন।

এসব ভাড়ায় নেওয়া উড়োজাহাজ সাধারণত এয়ার চায়নার যাত্রীবাহী বহরের অংশ। কূটনৈতিক সফর না থাকলে এগুলো বাণিজ্যিক রুটে চলাচল করে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য প্রয়োজনীয় নমনীয়তা বজায় রাখার পাশাপাশি উড়োজাহাজ পরিবহন সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হয়।

প্রেসিডেন্টের জন্য বিশেষ উড়োজাহাজ তৈরির ভাবনা

প্রেসিডেন্টের জন্য রাষ্ট্রীয় উড়োজাহাজ চালুর আগে চীনের প্রেসিডেন্টরা বাণিজ্যিক বোয়িং ৭৪৭-৪০০ উড়োজাহাজে ভ্রমণ করতেন। কূটনৈতিক সফরের প্রায় ২০ দিন আগে এসব উড়োজাহাজে সাময়িকভাবে ভিভিআইপি কেবিন স্থাপন করা হতো। পরে বাণিজ্যিক রুটে ব্যবহারের জন্য সেগুলো আবার সাধারণ যাত্রীবাহী আসনে ফিরিয়ে নেওয়া হতো।

২০১৫ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও তাঁর স্ত্রী পেং লিয়ুয়ান যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেলে তাঁরা একটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজে ভ্রমণ করেন।

চায়না ডেইলির এক প্রতিবেদনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রটোকল বিভাগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত পরিচালক লু পেইশিনকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল, ‘চীনের নেতাদের জন্য কোনো “বিশেষ উড়োজাহাজ” নেই। উড়োজাহাজগুলো এয়ার চায়না সরবরাহ করে।’

লুর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের যেকোনো সফরের আগে উড়োজাহাজের ভেতরের অংশ সাময়িকভাবে পরিবর্তন করে সেখানে সোফা ও বিছানা বসানো হতো। এ ছাড়া নিরাপত্তা পরীক্ষা চালাতে এক মাস সময় ব্যয় করা হতো এবং উড়োজাহাজের কর্মীদেরও সতর্কতার সঙ্গে বাছাই করা হতো।

চীন মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এর আদলে তৈরি প্রেসিডেন্টের জন্য একটি উড়োজাহাজ চালু করতে যাচ্ছিল। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সান আন্তোনিও আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজবন্দরে একটি বিশেষ উড়োজাহাজে পরিবর্তন আনা হয়। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট চিয়াং জেমিনের ব্যবহারের জন্য সেটি প্রস্তুত করা হয়েছিল। তবে বেইজিংয়ে পৌঁছানোর পর দেখা যায়, উড়োজাহাজটির ভেতরে লুকিয়ে ২৭টি আড়িপাতার যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

চীন সে সময় এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি। তবে কয়েক মাস পর এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, ‘চীনের ওপর আড়ি পাতা একেবারে অপ্রয়োজনীয়।’