হংকংয়ের আদালত মিডিয়া টাইকুন জিমি লাইকে বিদেশি শক্তির সঙ্গে আঁতাত এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক প্রকাশনার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ২০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। আজ সোমবার তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত হংকং হাই কোর্ট বেঞ্চে ৭৭ বছর বয়সী অ্যাপল ডেইলি পত্রিকার (বর্তমানে বন্ধ) প্রতিষ্ঠাতার এই সাজা ঘোষণা করা হয়।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, বিচারিক প্রক্রিয়া চলাকালীন জিমি লাই ইতিমধ্যেই পাঁচ বছরের বেশি সময় কারাগারে কাটিয়েছেন।
গত ডিসেম্বরে বেইজিংয়ের জারি করা কঠোর জাতীয় নিরাপত্তা আইনের অধীনে বিদেশি শক্তির সঙ্গে আঁতাত করার দুটি অভিযোগ এবং রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক প্রকাশনার একটি অভিযোগে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন।
সাজা ঘোষণার আগে পশ্চিমা দেশগুলো এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো লাইয়ের মুক্তির দাবি জানিয়ে আসছিল। কেউ কেউ এই বিচার প্রক্রিয়াকে স্রেফ একটি ‘প্রহসন’ বলে নিন্দা জানিয়েছে।
লাইয়ের পরিবার, আইনজীবী, সমর্থক এবং সাবেক সহকর্মীরা সতর্ক করেছেন যে, তিনি হৃদরোগ এবং উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছেন, যার ফলে কারাগারেই তাঁর মৃত্যু হতে পারে।
জিমি লাই ছাড়াও সোমবার অ্যাপল ডেইলির ছয় সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মী, এক সক্রিয় কর্মী এবং একজন প্যারা লিগ্যালকেও সাজা দেওয়া হবে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জানিয়েছেন, গত মাসে বেইজিংয়ে চীনা নেতা সি চিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে তিনি লাইয়ের বিষয়টি উত্থাপন করেছেন এবং সেই আলোচনা ‘সম্মানজনক’ ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। উল্লেখ্য যে, জিমি লাই একজন ব্রিটিশ নাগরিক।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও লাইয়ের মুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন। কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস এক বিবৃতিতে বলেছে, লাইয়ের এই বিচার ‘শুরু থেকেই একটি প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয় এবং এটি হংকংয়ের সেই আইনের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করে যা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষার কথা বলে।’
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস বলেছে, এই সাজা ‘শুধু জিমি লাইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এই অঞ্চলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি চূড়ান্ত সংকেত দেবে।’
বেইজিং অবশ্য এ ধরণের সমালোচনাকে হংকংয়ের বিচার ব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে। অন্যদিকে, হংকং কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে লাইয়ের মামলার সঙ্গে ‘বাকস্বাধীনতা বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কোনো সম্পর্ক নেই।’
সাজা ঘোষণার আগে হংকংয়ের ওয়েস্ট কাউলুন আদালতের বাইরে কয়েক ডজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং একটি সাঁজোয়া যান মোতায়েন করা হয়। আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকসহ বহু মানুষ ভিড় করেন।
হংকং ফ্রি প্রেসের খবর অনুযায়ী, এক মহিলার কাছে অ্যাপল ডেইলির একটি চাবির ছড়া পাওয়ার পর পুলিশ তাঁকে আটক করে। এ ছাড়া এখন বিলুপ্ত লিগ অব সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস-এর সদস্য সাং কিন-শিংসহ আরও অন্তত দুই সক্রিয় কর্মীকে তল্লাশি করা হয়। বার্তা সংস্থা এএফপি-কে সাং বলেন, ‘আমরা আশা করি যে (লাই) পুনরায় স্বাধীনতা ফিরে পাবেন... তাঁর বার্ধক্যের কারণে আমি অত্যন্ত চিন্তিত।’
হংকংয়ে সংবাদপত্রের ওপর ক্রমবর্ধমান কড়াকড়ির প্রেক্ষাপটে এই সাজা ঘোষণা করা হলো।
হংকং জার্নালিস্টস অ্যাসোসিয়েশন ২০২৪ সালে জানিয়েছিল যে, কয়েক ডজন সাংবাদিক ‘পরিকল্পিত এবং সংগঠিত’ হয়রানি ও হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন, যার মধ্যে ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস এবং এমনকি মৃত্যুর হুমকিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস-এর তথ্য অনুযায়ী, হংকংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা আইন কার্যকর হওয়ার পরবর্তী চার বছরে অন্তত ৯০০ সাংবাদিক তাঁদের চাকরি হারিয়েছেন।