চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর শেনঝেনে একটি হোটেলে কাটানো এক রাত হংকংয়ের বাসিন্দা এরিক ও তাঁর বান্ধবী এমিলির জীবনে ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে। তিন সপ্তাহ পর এরিক জানতে পারেন—হোটেল কক্ষে তাঁদের ব্যক্তিগত মুহূর্ত গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে এবং তা হাজারো মানুষের সামনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এক অনুসন্ধানে বিবিসি জানিয়েছে, যে অনলাইন চ্যানেল ব্যবহার করে এরিক একসময় পর্নোগ্রাফি দেখতেন, সেই মাধ্যমেই এবার তিনি নিজেকে শিকার হিসেবে আবিষ্কার করেছেন।
এরিকের ভাষায়, তিনি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছিল—হোটেল কক্ষে ঢোকা, ব্যাগ নামানো, আলো জ্বালানো, এমনকি যৌন সম্পর্কের দৃশ্যও। সবই তাঁদের অজান্তে ধারণ করা হয়। চীনে পর্নোগ্রাফি তৈরি ও বিতরণ আইনত নিষিদ্ধ হলেও, তথাকথিত ‘স্পাই-ক্যাম পর্নো’ সেখানে অন্তত এক দশক ধরে সক্রিয়।
গত কয়েক বছরে এই গোপন ক্যামেরা নিয়ে আতঙ্ক চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে নারীরা কীভাবে ক্যামেরা শনাক্ত করা যায়—সে বিষয়ে পরামর্শ আদান-প্রদান করছেন। কেউ কেউ হোটেল কক্ষে প্রবেশ করেও তাঁবু টানিয়ে রাত কাটানোর মতো পন্থাও বেছে নিচ্ছেন।
বিবিসি জানিয়েছে, ২০২৪ সালের এপ্রিলে চীনা সরকার নতুন নিয়ম জারি করে হোটেলমালিকদের নিয়মিত গোপন ক্যামেরা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করলেও বাস্তবে সমস্যা কমেনি। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের দীর্ঘ ১৮ মাসের অনুসন্ধানে দেখা গেছে—হাজার হাজার স্পাই-ক্যাম ভিডিও এখনো বিভিন্ন হোটেল কক্ষ থেকে ধারণ করে পর্নো হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। এসব কনটেন্ট মূলত নিষিদ্ধ ম্যাসেজিং অ্যাপ টেলিগ্রামে প্রচারিত হচ্ছে।
এ সময়ের মধ্যে ছয়টি আলাদা ওয়েবসাইট ও অ্যাপের সন্ধানও পাওয়া গেছে। এগুলোতে মোট ১৮০টির বেশি হোটেল কক্ষে গোপন ক্যামেরা বসিয়ে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও তৈরি করা হয়েছে। এসব ক্যামেরা শুধু ভিডিও ধারণই নয়, সরাসরি সম্প্রচারও করে। একটি ওয়েবসাইট সাত মাস পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, সেখানে ৫৪টি ক্যামেরা সক্রিয় ছিল। এগুলোর অর্ধেকই যেকোনো সময় চালু থাকত। বিবিসির হিসাব অনুযায়ী, এই সময়ে হোটেলের হাজার হাজার অতিথি অজান্তেই ক্যামেরাবন্দী হয়েছেন।
এরিক স্বীকার করেন, কিশোর বয়সে তিনি এমন ভিডিও দেখতেন। কিন্তু নিজে ভুক্তভোগী হওয়ার পর সেই দৃষ্টিভঙ্গি এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। ভিডিও সম্প্রচারের ঘটনাটি তিনি তাঁর বান্ধবী এমিলিকে জানালে তিনি এটিকে রসিকতা ভেবেছিলেন। তবে ভিডিও দেখার পর এমিলি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। সহকর্মী বা পরিবারের কেউ দেখে ফেলতে পারে—এই ভয়ে তাঁরা সপ্তাহের পর সপ্তাহ একে অপরের সঙ্গে কথা বলেননি।
এই শিল্পের পেছনের কাঠামো আরও ভয়াবহ। বিবিসির অনুসন্ধানে ‘একেএ’ নামে পরিচিত এক এজেন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে, যিনি মাসিক ৪৫০ ইউয়ানের বিনিময়ে সরাসরি সম্প্রচারের ওয়েবসাইটে প্রবেশের সুযোগ দিতেন। ওই ওয়েবসাইটে একসঙ্গে একাধিক হোটেল কক্ষের দৃশ্য দেখা যেত। কক্ষগুলোতে অতিথিরা কার্ড ঢোকালেই ক্যামেরা সক্রিয় হয়ে উঠত। দর্শকেরা চাইলে এসব ভিডিও ডাউনলোডও করতে পারতেন।
একেএ পরিচালিত একটি টেলিগ্রাম চ্যানেলে প্রায় ১০ হাজার সদস্য ছিল। সেখানে দর্শকেরা হোটেল কক্ষে প্রবেশ করা অতিথিদের চেহারা, কথাবার্তা ও যৌন সম্পর্ক নিয়ে মন্তব্য করতেন। নারীদের প্রায়ই অশালীন ভাষায় আক্রমণ করা হতো। একটি ক্যামেরা ঝেংঝৌ শহরের একটি হোটেল কক্ষে শনাক্ত করা হয়, যা দেয়ালের ভেন্টিলেশনের ভেতরে লুকানো ছিল এবং সরাসরি বিদ্যুৎ সংযোগে যুক্ত ছিল। বাজারে বহুল বিক্রীত ক্যামেরা ডিটেক্টরও সেটি শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়।
অনুসন্ধানে অন্তত এক ডজন এমন এজেন্টের অস্তিত্ব মিলেছে, বলে জানিয়েছে বিবিসি। হংকংভিত্তিক এনজিও রেইনলিলির প্রতিনিধি ব্লু লি জানান, গোপনে ধারণ করা যৌন ভিডিও অপসারণের জন্য সহায়তা চাওয়ার সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু টেলিগ্রাম এসব অনুরোধে সাড়া দেয় না। বিবিসির পক্ষ থেকে অভিযোগ জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
এরিক ও এমিলি এখনো আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তাঁরা হোটেলে থাকতে এখন ভয় পান। আর জনসমক্ষে টুপি পরে চলেন যেন কেউ দেখে চিনে না ফেলে। একটি রাতের গোপনীয়তা যে আজীবনের মানসিক ক্ষত হয়ে উঠতে পারে, এরিক ও এমিলির গল্পটি এর নির্মম সাক্ষ্য।