হোম > বিশ্ব > চীন

ঘুমের ওষুধ-কাশির সিরাপের নেশায় আসক্ত হচ্ছে চীনা কিশোর-কিশোরীরা

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

চীনের কিশোর-কিশোরীরা কোনো প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ইন্টারনেট থেকে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ কিনছে। ছবি: সংগৃহীত

চীনের একটি উপকূলীয় প্রদেশের শিক্ষার্থী শিয়াওমেই। মাত্র ১৪ বছর বয়সে অতিরিক্ত মাত্রায় কাশির ওষুধ সেবন করে ফেলে মেধাবী এই শিক্ষার্থী। বয়সে তার চেয়ে কিছুটা বড় এক তরুণের মন জয় করতে সে এই কাজটি করে। ওই তরুণ তাকে বলেছিল, এই ওষুধ খেলে মানসিক চাপ বা ক্লান্তি দূর হবে। কথাটি শুনে তাকে ‘ইমপ্রেস’ করতে এবং নিজেও একটু স্বস্তি পেতে ওষুধ সেবন শুরু করে সে। সাধারণ ওষুধের দোকানে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন) ছাড়া এই ওষুধ কেনা ঝামেলার ছিল, কিন্তু ইন্টারনেট থেকে সে অনায়াসেই তা কিনে ফেলে।

এই ওষুধ সেবনের পর শুরুতে কেবল কিছুটা মাথা ঝিমঝিম করেছিল তার। কিন্তু খুব দ্রুতই সে এর একধরনের অসাড় অনুভূতির প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে; যা তার কাছে আসন্ন পরীক্ষার মানসিক চাপ থেকে সাময়িক মুক্তির একমাত্র আশ্রয় মনে হতো। অতিরিক্ত মাত্রায় এই ওষুধ সেবনে হ্যালুসিনেশন (দৃষ্টিবিভ্রম) এবং শারীরিক ভারসাম্য হারানোর মতো মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

একপর্যায়ে অনলাইন চ্যাট গ্রুপে অন্যদের পরামর্শে শিয়াওমেই আরও কিছু ওষুধ খেতে শুরু করে। সে ব্যথানাশক ও মৃগীরোগের ওষুধসহ অন্যান্য প্রেসক্রিপশনের ওষুধে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। কখনো সে ৫টি, আবার কখনো বিভিন্ন ওষুধের ভিন্ন প্রভাব পেতে ১০টিরও বেশি ট্যাবলেট একসঙ্গে গিলে ফেলত।

টানা দুই বছর ধরে কোনো প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ইন্টারনেট থেকে কিনে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ব্যবহার করে গেছে।

শিয়াওমেই বিবিসিকে বলে, ‘পড়াশোনা নিয়ে যখন খুব বেশি চাপ অনুভব করতাম, পরীক্ষায় ভালো করতে না পারতাম কিংবা মা-বাবার সঙ্গে ঝগড়া হলেও এসব ওষুধ খেতাম। আমি বাস্তবতা থেকে পালাচ্ছিলাম।’

বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্মে চ্যাটরুমে অনুসন্ধান চালিয়ে বিবিসি চীনা কিশোর-কিশোরীর কাছ থেকে ঠিক একই রকম আশঙ্কাজনক গল্প শুনতে পেয়েছে। তারা সবাই মূলত একটি বিষয় থেকেই পালাতে চাইছে—প্রচণ্ড মানসিক চাপ। আর এই চাপ থেকে মুক্তি পেতে তারা বেছে নিয়েছে এই বিপজ্জনক ‘ফার্মাসিউটিক্যাল হাই’ বা ওষুধের নেশা।

স্নায়বিক যন্ত্রণার বেশি পাওয়ারের ওষুধ অতিরিক্ত মাত্রায় খাওয়ার পর এক কিশোরী একটি ভয়েস নোট পাঠায়, যেখানে জড়িয়ে যাওয়া অস্পষ্ট গলায় সে বলছিল, ‘আমার মনে হচ্ছে শরীরটা আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। মাথা চরমভাবে ঘুরছে।’ একজন তাকে পরামর্শ দেয়, ‘চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ো, কাল ঠিক হয়ে যাবে।’

এক কিশোর আবার তার বাবার পুরোনো প্রেসক্রিপশন ব্যবহার করে এক ভুয়া নতুন প্রেসক্রিপশন বানিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। এমনকি চ্যাট রুমে ওষুধ কেনার কায়দাকানুন নিয়ে পরামর্শও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল।

পার্কিনসন্স রোগীদের কাঁপুনি কমানোর কাজে ব্যবহৃত একটি ওষুধের কথা উল্লেখ করে এক ব্যবহারকারী লিখেছে, ‘হ্যালুসিনেশন বা বিভ্রম চাইলে এটি কিনতে পারো, কারণ এটি এখনো নিষিদ্ধ করা হয়নি।’ যদিও অতিরিক্ত মাত্রায় এই ওষুধ সেবনে মানুষের চরম বিভ্রান্তি ও মস্তিষ্ক বিকৃতি ঘটতে পারে।

অন্য একজন আবার জানতে চায়, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এটি খুঁজে পেতে ঠিক কোন কি-ওয়ার্ড লিখে সার্চ করা লাগবে?

সমস্যাটির ব্যাপ্তি কতটা, তা নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ, এ বিষয়ে সরকারি তথ্য-উপাত্ত খুবই কম।

তবে সমস্যাটি এতটাই গুরুতর যে দুই বছর আগে শিয়াওমেই যে কাশির ওষুধ ব্যবহার শুরু করেছিল, সেটির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে অভিযান শুরু করে সরকার। ওষুধটিকে সাইকোট্রপিক বা মনঃপ্রভাবক ওষুধ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয় এবং শুধু চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র থাকা রোগীদের জন্য তা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়। এতে তরুণদের জন্য অনলাইনে ওষুধটি কেনা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।

এরপর চলতি বছরের এপ্রিলে কর্তৃপক্ষ দেখতে পায়, তরুণেরা অন্য একটি ওষুধের দিকে ঝুঁকেছে। তখন ওষুধটি কীভাবে ব্যবস্থাপত্রে দেওয়া ও ফার্মেসিতে বিক্রি করা হবে, সে বিষয়ে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। তা সত্ত্বেও বিবিসি একটি অনলাইন চ্যাটরুমে প্রতি গ্রাম মাত্র ১০ চীনা ইউয়ান বা ১ দশমিক ৫ ডলার, ১ দশমিক ০৯ পাউন্ডে ওষুধটি কেনার প্রস্তাব পেয়েছে।

চীনের বিচার মন্ত্রণালয়ের অপরাধ প্রতিরোধ ইনস্টিটিউটের জন্য ২০২৫ সালে লেখা এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পদার্থ সহজেই পাওয়া যায়। আর কর্তৃপক্ষ একটি ওষুধ নিয়ন্ত্রণে আনলেও তরুণেরা দ্রুত এর বিকল্প খুঁজে নেয়।’

কিছু ক্ষেত্রে বিবিসি দেখতে পেয়েছে, অনলাইনে কিশোর-কিশোরীরা শনাক্তকরণ এড়াতে ওষুধের ভিন্ন নাম ব্যবহার করছে। ২০২৫ সালের ওই গবেষণাতেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্বজুড়েই চাপ ও উদ্বেগ মোকাবিলায় তরুণদের ব্যবস্থাপত্রভিত্তিক ওষুধের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রমাণ বাড়ছে।

বিশ্বের ওষুধ তৈরির কাঁচামালের বিপুল অংশ উৎপাদন করে চীন। তাই দেশটিতে সস্তা ব্যবস্থাপত্রভিত্তিক ওষুধ সহজে পাওয়া যায়—এটি হয়তো খুব একটা বিস্ময়কর নয়।

শিয়াওমেই বলেন, কাশির ওষুধটি কিনতে চাইলে কয়েকটি ক্লিক করলেই ওষুধের পুরো একটি বাক্স তার বাড়ির দরজায় পৌঁছে যেত। তিনি বলেন, ‘শপিং প্ল্যাটফর্মে শুধু পরিচয়পত্রের নম্বর দিলেই সরাসরি এটি কেনা যেত।’

জাতীয় পরিচয় নম্বরটিতে তার বয়সের তথ্যও ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনো প্রশ্ন না করেই তার কাছে ওষুধটি বিক্রি করা হতো বলে জানান তিনি। ওষুধটির দামও ছিল কম—প্রায়ই ৫০টি ট্যাবলেটের দাম ছিল ১ ডলারেরও কম।

কাগজে-কলমে অবৈধ মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে চীন সফল হচ্ছে। ২০২৫ সালের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৩৫ বছরের কম বয়সী নতুন শনাক্ত মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা নাটকীয়ভাবে ৪১ শতাংশ কমেছে।

তবে কর্তৃপক্ষকে স্বীকার করতে হয়েছে যে ব্যবস্থাপত্রভিত্তিক ওষুধের অপব্যবহার ব্যাপক সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। চীনের ন্যাশনাল নারকোটিকস কন্ট্রোল কমিশন সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলেছে, বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে এ প্রবণতা বাড়ছে।

শিয়াওমেই বলেন, তাঁর অভিজাত রসায়ন শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী নিজেদের ‘পুরোপুরি ব্যর্থ’ মনে না করার জন্য ব্যবস্থাপত্রভিত্তিক ওষুধ অতিরিক্ত মাত্রায় খাওয়ার উপায় নিয়ে আলোচনা করত।

তিনি বলেন, ‘পরীক্ষায় পাস করা এবং অভিজাত শ্রেণিতে টিকে থাকা খুবই কঠিন। আমাদের স্কুলে এসব শ্রেণি বাদ পড়ার ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়। পরীক্ষার ফল খারাপ হলে তোমাকে শ্রেণি থেকে বের করে দেওয়া হয়। যখন তুমি ব্যর্থ হও, তখন নিজেকেও ব্যর্থ মনে হয় এবং বিশ্বাস করতে শুরু কর যে জীবনে তোমার আর কোনো সুযোগ নেই।’

চীনা সমাজবিজ্ঞানী ও ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর সোশ্যাল অ্যানথ্রোপলজির পরিচালক শিয়াং বিয়াও বলেন, চাপের একটি অংশ আসে অভিভাবকদের কাছ থেকেও। তাঁরাও তাঁদের সন্তানকে ভবিষ্যতের একমাত্র আশা হিসেবে দেখেন।

কয়েক দশক ধরে চালু থাকার পর ২০১৬ সালে চীনের ‘এক সন্তান নীতির অবসান হয়। বিয়াও বলেন, এ নীতির কারণে অনেক পরিবারের মাত্র একটি সন্তান রয়েছে এবং পরিবারের সব প্রত্যাশার ভার সেই সন্তানের ওপরই এসে পড়ে।

তিনি বলেন, ‘চীনা কিশোরদের যে বিষয়টি আলাদা করে, তা হলো তাদের বিচ্ছিন্ন পরিবেশ। তারা প্রতিদিন অন্তত ৯ বা ১০ ঘণ্টা স্কুলে কাটায়। সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ তাদের খুবই কম। বাস্তব জীবন আসলে কেমন, তা দেখার সুযোগও খুব কম।’

এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো, ব্যবস্থাপত্রভিত্তিক ওষুধের অপব্যবহার ও নিজের ক্ষতি করার প্রবণতা বৃদ্ধির মধ্যে একটি সম্পর্ক দেখছেন তিনি। উদাহরণ হিসেবে বিবিসি লক্ষ্য করেছে, অনেক চ্যাটরুমে তরুণেরা একে অপরকে ‘কিছু অনুভব করার জন্য’ নিজেদের শরীর কেটে ফেলতে উৎসাহিত করত।

অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক একটি উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে এলে উদ্বেগের অনুভূতি অবশ করে দেওয়ার উপায় খুঁজতে শিয়াওমেই অন্য একটি ওষুধ ব্যবহার শুরু করে।

তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমার স্মৃতিশক্তি দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে। আমি কিছুই স্পষ্টভাবে মনে রাখতে পারতাম না এবং সব সময় একধরনের ঘোরের মধ্যে থাকতাম।’

ওষুধটি সাধারণত মৃগীরোগের খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয় এবং স্নায়বিক ব্যথার চিকিৎসাতেও দেওয়া হয়। শিয়াওমেই তাঁর একটি চ্যাট গ্রুপে ওষুধটির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা বললে অন্যরা তাঁকে ব্যথা উপশমে ব্যবহৃত আরেকটি ওষুধের পরামর্শ দেয়। তিনি বলেন, ওষুধটি তাঁকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিল, কিন্তু শিগগিরই সেই অনুভূতি পেতে তাঁর আরও বেশি মাত্রার প্রয়োজন হতে থাকে।

গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় বসার কয়েক মাস আগে তিনি পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।

তিনি ৫০টি ট্যাবলেট খেয়েছিলেন এবং এরপর আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। শিয়াওমেই বলেন, ‘আমার ভয় হচ্ছিল, গুরুতর কিছু ঘটে যেতে পারে। কিন্তু আমি পাকস্থলী পরিষ্কার করাতে চাইনি, তাই মা-বাবাকে বলার আগে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে চেয়েছিলাম।’

কিন্তু তিনি এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়েন যে শেষ পর্যন্ত তাঁকে সবকিছু স্বীকার করতে হয়।

মা-বাবা তাঁদের মেয়ের এই আচরণকে সাহায্যের জন্য তাঁর আর্তি হিসেবে দেখেন এবং তাঁর কথা শোনার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর মা-বাবা বলেন, ‘আমাদের এমন অবস্থায় দেখে তাঁদের খুব কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা আমাকে বকাঝকা বা সমালোচনা করেননি। তাঁদের আচরণ ছিল খুবই কোমল।’

শিয়াওমেইর জন্য এই আচরণই সবকিছু বদলে দিয়েছে।

শিয়াং বিয়াও বলেন, ‘অনেক শিশু অনেক মনোযোগ পায়। কিন্তু তারা যে ধরনের মনোযোগ চায়, তা হলো কেউ তাদের জিজ্ঞাসা করুক, তারা কেমন অনুভব করছে। তারা কি একাকিত্ব বা মানসিক চাপ অনুভব করছে? চীনে প্রায়ই মা-বাবারা এসব বিষয় এড়িয়ে যান এবং বলেন, তোমাকে শুধু আরও শক্ত হতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘চীনা সমাজজুড়ে এখন খুব জোরালো সতর্কসংকেত বেজে উঠছে। একজন কিশোরের প্রতি কীভাবে দায়িত্বশীল হতে হয়, তা প্রাপ্তবয়স্কদের ভেবে দেখতে হবে। পরিবারে খোলামেলা আলোচনা—এটাই সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে তৃপ্তিদায়ক বিষয়।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত লড়াইটা এখানেই। ব্যবস্থাপত্রভিত্তিক ওষুধের অনলাইন বিক্রি বন্ধ করতে বারবার একেকটি উৎসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে সরকারের এমন একটি সমস্যার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত, যা হয়তো মানসিক স্বাস্থ্যের সংকটে রূপ নিয়েছে।

২০২৩ সালে চীনের মেন্টাল হেলথ ব্লু বুক-এর জন্য করা এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশটিতে প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ মানুষ বিষণ্নতায় ভুগছেন। তাঁদের ৩০ শতাংশের বেশি বয়স ১৮ বছরের নিচে।

চীনা সরকার কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে। সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে প্রতিটি স্কুলে কাউন্সেলিং কক্ষ স্থাপন, প্রতিটি কাউন্টির অন্তত একটি হাসপাতালে মনোরোগ চিকিৎসাসেবা চালু এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সংখ্যা বাড়ানো। ২০৩০ সালের মধ্যে সারা দেশে মানসিক সহায়তা ও সংকট মোকাবিলার একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলাই লক্ষ্য।

এ পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে তারা বেশ সফল হয়েছে। চীনের স্টেট কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৯২ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৯৫ শতাংশ জুনিয়র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একজন করে কাউন্সেলর রয়েছেন। বেইজিংসহ অনেক বড় শহর মানসিক স্বাস্থ্যকে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করেছে।

তবে শিশু ও কিশোরদের চিকিৎসায় বিশেষজ্ঞ মনোরোগ চিকিৎসকের এখনো বড় ধরনের সংকট রয়েছে।

ব্রিটিশ চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেটে ২০২০ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, দেশটিতে যোগ্য শিশুমনোরোগ চিকিৎসকের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫০০। তাঁদের অনেকেই বেইজিং ও সাংহাইয়ের মতো বড় শহরে কর্মরত।

অভূতপূর্ব সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তিন দশক পার করা একটি দেশের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ।

শিয়াওমেইর মা-বাবা যে চীনে বড় হয়েছেন, সেটি তাঁর সামনে থাকা ভবিষ্যতের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁর মা-বাবা চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নির্ধারিত একটি ধারণা অনুসরণ করে বড় হয়েছেন—কঠোর পরিশ্রম করলে তার প্রতিদান মিলবে। কিন্তু এখন তরুণেরা ভালো ফল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন করলেও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত নয়।

কঠোর মহামারি-সংক্রান্ত বিধিনিষেধের পর চীনের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে হিমশিম খাচ্ছে। ধারণা করা হয়, প্রতি পাঁচজন তরুণের একজন চাকরি খুঁজে পেতে সমস্যায় পড়ছেন এবং পরিবারগুলোও আগের তুলনায় কম খরচ করছে।

বিয়াও বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে মানুষ আরও হতাশাবাদী হয়ে পড়েছে।’ তাঁর মতে, এই উদ্বেগ শুধু তরুণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, মা-বাবারা বিভ্রান্ত ও উদ্বিগ্ন বোধ করেন। কারণ, তাঁরা তাঁদের সন্তানদের মধ্যে একটি সমস্যা দেখতে পান, কিন্তু কোনো বিকল্প পথ খুঁজে পান না। আমার সন্তানের কোনো সমস্যা হলে মনে হয়, পৃথিবী শেষ হয়ে গেল। আমার সন্তান স্কুলে ভালো করতে না পারলে মনে হয়, পৃথিবী শেষ হয়ে গেল। আমার সন্তান আমার সঙ্গে কথা না বললে মনে হয়, পৃথিবী শেষ হয়ে গেল। আমার মনে হয়, শিশুদের পাশাপাশি মা-বাবাদের প্রতিও আমাদের আরও মনোযোগ দেওয়া উচিত।’

সৌভাগ্যক্রমে শিয়াওমেই ও তাঁর মা-বাবা এই সংকট কাটিয়ে ওঠার একটি পথ খুঁজে পেয়েছেন।

শিয়াওমেই বলেন, ‘আগে আমার মা-বাবা আমাকে ঠিকভাবে বুঝতেন না এবং অনেক সময় খুব কঠোর কথা বলতেন। আমার মনে হতো, আমার পাশে কেউ নেই এবং আমি সত্যিই একা।’

তবে ওষুধ অতিরিক্ত মাত্রায় নেওয়ার পর তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে পরিস্থিতি বদলে যায়। এরপর তাঁর মা-বাবা তাঁর কথা শুনতে এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করেন। শিয়াওমেই বলেন, ‘আমার পাশে কেউ আছে, এটা জানতে পারাটা আমাকে সত্যিই ভালো অনুভব করিয়েছে।’ দীর্ঘদিন ধরে যে ভর্তি পরীক্ষাটি তাঁকে আতঙ্কিত করে রেখেছিল, তাতেও ভালো ফল করতে তাঁর এই পরিবর্তন সহায়তা করেছিল।

তিনি আরও বলেন, ‘আমি ভাগ্যবান যে তাঁদের সমর্থন পেয়েছি।’

তবে সবাই এমন সমর্থন পান না। আর সেখানেই সাহায্য করতে চান লু জিংচান।

২২ বছর বয়সী লু বহু বছর বিষণ্নতার সঙ্গে লড়াই করেছেন। ব্যবস্থাপত্রভিত্তিক ওষুধ সেবনের পর যে উচ্ছ্বাস অনুভব করতেন, তা থেকে বেরিয়ে আসা তাঁর জন্য কঠিন ছিল। চার বছরে তিনি চারবারের বেশি ওষুধ অতিরিক্ত মাত্রায় নিয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘ওষুধগুলো আমাকে প্রায় উন্মাদনার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল। এতে আপনি আসক্তির অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন এবং নিজের স্বাস্থ্য নষ্ট করে ফেলতে পারেন।’

এখন তিনি সব ধরনের ব্যবস্থাপত্রভিত্তিক ওষুধ সেবন বন্ধ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটিয়ে তিনি অন্যদের এ পথে না যাওয়ার আহ্বান জানান। একসময় তিনি যে ধরনের চাপের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন, একই ধরনের চাপের মুখে থাকা তরুণদের জন্য তাঁর পরামর্শ হলো, ‘ওষুধের সাহায্যে নিজেকে অসাড় না করে জীবনকে সোজাসুজি মোকাবিলা করো। যদি তোমরা ওভারডোজের ফাঁদে পড়ে গিয়ে থাকো, তবে তা থামানোর সাহস জোগাও। বিশ্বাস করো, একদিন নিশ্চয়ই জীবন সুন্দর হবে।’