মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানিয়েছেন, চলতি বছরে ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়েছে। চলতি সপ্তাহে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে কুয়ালালামপুরে সাক্ষাতের সময় তিনি আরও রোহিঙ্গাকে স্বদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি উত্থাপন করবেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের খবরে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের সাবেক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং বর্তমানে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে অধিষ্ঠিত। আনোয়ার ইব্রাহিম মালয়েশিয়ার পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ায় থাকা রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে তিনি মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে আরও মানুষকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা করবেন।
আনোয়ার ইব্রাহিম জানান, মিন অং হ্লাইংয়ের মালয়েশিয়া সফরের অন্যতম মূল এজেন্ডা দেশটিতে থাকা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের বিষয়টি আলোচনা করা। তবে তিনি এর বিস্তারিত কিছু জানাননি। মালয়েশিয়ায় আনুমানিক ২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারের ৫ হাজারের বেশি মানুষকে ফেরত পাঠানোর এক পরিকল্পনার প্রথম ধাপে ১ হাজার ৪৭৬ জন মিয়ানমারের নাগরিককে ফেরত পাঠানো হয় গত সপ্তাহে। মিয়ানমারের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত এই কর্মসূচিকে মালয়েশিয়া সরকার ‘স্বেচ্ছায় এবং পর্যায়ক্রমিক প্রত্যাবাসন’ পরিকল্পনা হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের কারণে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার মতো গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এটি উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, ‘মিয়ানমারকে আমরা যে শর্তগুলো দিয়েছি তার মধ্যে প্রথমত, তাদের অবশ্যই নিজস্ব নাগরিকদের ফেরত নিতে হবে এবং নিজ দেশের মানুষের সাথে মানবিক আচরণের নিশ্চয়তা দিতে হবে।’ তিনি জানান, যেসব মানবাধিকার গোষ্ঠী এই পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তারা মালয়েশিয়ার শরণার্থী পরিস্থিতি সমাধানের কোনো বিকল্প প্রস্তাব দেয়নি। তিনি বলেন, জানুয়ারি থেকে ফেরত পাঠানো ১০ হাজারের বেশি মানুষ সকলেই নিজ নিজ সম্মতি প্রদান করেছিলেন।
আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে আনোয়ার বলেন, ‘মিয়ানমার সরকার ও তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আশ্বাস দিয়েছেন এবং প্রেসিডেন্টও (মিন অং হ্লাইং) আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন। তাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে আমরা সর্বোচ্চ এতটুকুই করতে পারি, তা না হলে এর কোনো সমাধান নেই।’
আং সান সু চির নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে ২০২১ সালে নিজের নেতৃত্বাধীন সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিন অং হ্লাইং মিয়ানমারের প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার এবং দেশটির বিচ্ছিন্নতা কমানোর চেষ্টা করে আসছেন। আনোয়ার জানান যে থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, লাওস এবং ভিয়েতনামও মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টকে তাদের দেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে। মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের নাগরিকদের, বিশেষ করে নির্যাতন থেকে পালিয়ে আসা জাতিগত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রোহিঙ্গাদের প্রতি সাধারণ মানুষের মনোভাব কঠোর হয়েছে, যেখানে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই গোষ্ঠী সম্পর্কে প্রতিকূল এবং কখনো কখনো ভুয়া দাবির জোয়ার ছড়িয়ে পড়েছে।
এ ছাড়া, মালয়েশিয়া তার অভ্যন্তরীণ আইনের অধীনে শরণার্থীদের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় না, যার ফলে তারা কাজের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় এবং গ্রেফতার ও অভিবাসন সংক্রান্ত আটকের ঝুঁকির মধ্যে থাকে। ইতিমধ্যে সরকার শরণার্থীদের ব্যবস্থাপনায় দেশে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার ভূমিকা পর্যালোচনা করছে। মঙ্গলবার আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, দেশটি যেন আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি মেনে চলে তা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের সাথে আলোচনা করবে মালয়েশিয়া।
পার্লামেন্টে আনোয়ার ইব্রাহিম বলেন, ‘আমাদের দেশের বিষয়াবলি আমাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠানের দ্বারাই পরিচালিত হওয়া উচিত। কারা যোগ্য এবং কারা যোগ্য নয়—তা কোনো বিদেশী কর্মকর্তা নির্ধারণ করে দেবেন না।’