নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৫৯ জনে পৌঁছেছে। এখনো ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ, যাঁদের মধ্যে শত শত বিদেশি পর্যটক ও তীর্থযাত্রী রয়েছেন। গতকাল বুধবার সকালে কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই বিপর্যয়ে ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী শহর, গ্রাম, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস হয়ে যায়।
আজ বৃহস্পতিবারও উদ্ধারকর্মীরা হেলিকপ্টারের সাহায্যে দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার ও ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ বলছে, ভূমিকম্প নয়; হিমবাহের বিশাল অংশ ভেঙে পড়ে বরফ, পাথর, পানি ও কাদার স্রোত তৈরি হওয়াই ছিল এই ভয়াবহ দুর্যোগের মূল কারণ।
স্থানীয় সময় গতকাল বুধবার সকাল ৯টার দিকে নেপাল-চীন সীমান্তের পার্বত্য এলাকায় বরফ ও পাথরের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ে। এতে লেন্দে খোলা নদীতে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি ও পাথর জমা হয়ে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে বাঁধ ভেঙে যায়। এরপর সেই স্রোত নেমে আসে ভোতে কোশি বা ত্রিশূলী নদীতে।
নেপালের তিনটি জেলায় এই বন্যা সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি করেছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, জেলার প্রধান বাজারসংলগ্ন এলাকায় আঘাত হানার পর পানির স্রোতে মানুষ, গবাদিপশু, বাড়িঘর ও সরকারি অবকাঠামো মুহূর্তেই ভেসে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটিকে নেপালের অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।
নেপাল পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে ও ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ২৮৮ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের অনেকে কৈলাস-মানস সরোবর তীর্থযাত্রায় অংশ নিতে তিব্বতের পথে ছিলেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আরও প্রায় ২০০ তীর্থযাত্রীকে জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।
দুর্যোগের পর ভারত নেপালের সহায়তায় দুটি সামরিক পরিবহন বিমান পাঠিয়েছে। বিমান দুটিতে ৪৮ টন ত্রাণসামগ্রী রয়েছে, যার মধ্যে সৌরবাতি, স্বাস্থ্যবিধি কিট, আট টনের বেশি ওষুধ ও খাদ্যসামগ্রী অন্তর্ভুক্ত।
কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (আইসিমোড) বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বন্যার সময় ত্রিশূলী নদীর পানির উচ্চতা মাত্র ৩০ মিনিটে প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়।
প্রতিষ্ঠানটির দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যাল বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভোতে কোশির উপনদী লেন্দে খোলা। গত ১৪ মাসে লেন্দে খোলায় এটি দ্বিতীয়বারের বন্যা। এবার লেন্দে খোলার নেপাল অংশের একটি হিমবাহ থেকে বরফ ও পাথরের ধস নদীর প্রবাহ আটকে দেয় এবং পরে তা ভেঙে হঠাৎ প্রবল স্রোত সৃষ্টি করে।
দুর্যোগের পর নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল সংসদে প্রাথমিকভাবে জানান, একটি ভূমিকম্পের ফলে ভূমিধস হয়ে থাকতে পারে।
তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) বিশ্লেষণ করে জানায়, ঘটনাটি আসলে ভূমিকম্প ছিল না।
ইউএসজিএসের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে যেটিকে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প মনে করা হয়েছিল, সেটি ছিল হিমবাহধস ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ। এই ধস সিসমিক যন্ত্রে ৫ দশমিক ২ মাত্রার কম্পন দেখায়। এর উৎস ছিল বরফ ও পাথরের বিশাল ভর।
অর্থাৎ, কম্পনটি ভূমিকম্পের কারণে নয়; হিমবাহ ভেঙে পড়ার অভিঘাতে সৃষ্টি হয়েছিল।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগেরির ভূ-আকৃতিবিদ অধ্যাপক ড্যানিয়েল শুগার স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে জানান, প্রায় শূন্য দশমিক ২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের একটি বরফের অংশ প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে উপত্যকায় ধসে পড়ে। তিনি বলেন, স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় থাকা হিমবাহের নিচের অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়েছে।
শুগারের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, দুর্যোগের আগের ২৪ ঘণ্টায় বিপুল পরিমাণ তুষার গলে যায়। আগের দিনের ছবিতে যেসব হিমবাহ বরফে ঢাকা ছিল, পরদিন সেখানে বেশির ভাগ জায়গায় খালি বরফ দেখা যায়। তাঁর মতে, এটি ইঙ্গিত দেয় যে, ওই সময় এলাকায় অস্বাভাবিক উষ্ণতা বিরাজ করছিল। তিনি আরও বলেন, পার্বত্য অঞ্চলে চলমান নির্মাণকাজও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে থাকতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার মনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক অ্যান্ড্রু ম্যাকিন্টশ বলেন, এখনো নিশ্চিত নয় যে শুধু হিমবাহ ভেঙেছে, নাকি পুরো পাহাড়ের ঢাল ধসে পড়ে তার সঙ্গে হিমবাহের অংশও নিচে নেমেছে। তাঁর মতে, একটি বড় হিমবাহ ধসে পড়লে প্রথমে বিপুল পরিমাণ বরফ গলে পানি তৈরি হয়। এরপর সেই পানির সঙ্গে পাথর, মাটি ও ধ্বংসাবশেষ মিশে প্রবল গতির কাদামাটির স্রোতে পরিণত হয়। এই ধারাবাহিক ঘটনাই নিচের দিকে নেমে এসে বিধ্বংসী আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি করে।
আন্তর্জাতিক হিমবাহ গবেষকদের একটি দলও বলেছে, হিমবাহধস অবশ্যই এই বিপর্যয়ের অংশ ছিল; তবে এটিই একমাত্র কারণ নয়। পাহাড়ি ঢালের অস্থিতিশীলতা ও বিপুল ধ্বংসাবশেষও বন্যার তীব্রতা বাড়িয়েছে বলে তাঁদের ধারণা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন বড় হিমবাহধস তুলনামূলকভাবে বিরল ঘটনা। তাই নির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন যে—প্রতিটি ঘটনার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি দায়ী।
তবে অধ্যাপক ম্যাকিন্টশ বলেন, বিজ্ঞানীরা একটি বিষয়ে নিশ্চিত যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমবাহ দ্রুত সরে যাচ্ছে এবং গলছে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, পাহাড়ের চিরহিমায়িত মাটি বা পারমাফ্রস্ট একধরনের প্রাকৃতিক আঠার মতো কাজ করে, যা খাঁড়া ঢালে পাথর ও বরফকে ধরে রাখে। তাপমাত্রা বাড়লে এই পারমাফ্রস্ট দুর্বল হয়ে যায়, ফলে পাহাড় ও হিমবাহ অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
হিমালয় অঞ্চল (যার মধ্যে নেপাল, ভারত, চীন, ভুটান ও পাকিস্তান রয়েছে) বিশ্বের গড় তাপমাত্রার তুলনায় দ্বিগুণ হারে উষ্ণ হচ্ছে। ফলে তুষারধস, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও দ্রুত বাড়ছে।
জাতিসংঘ ২০২৩ সালে জানায়, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে গত ৩০ বছরে নেপালের পাহাড়গুলোর মোট বরফের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ গলেছে।
একই বছরে প্রকাশিত আরও একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহ ২০১১-২০২০ সময়ে আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত হারে গলে গেছে।
এর আগেও ২০২১ সালে ভারতের উত্তরাখন্ডে একটি হিমবাহ ভেঙে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হয়েছিল। সেই ঘটনায় ২০০ জন নিহত হন। পরে এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ২৭ মিলিয়ন ঘনমিটার পাথর ও হিমবাহের বরফ ধসে বিশাল ধ্বংসাবশেষের স্রোতে পরিণত হয়েছিল।
সাধারণত হিমবাহ গললে প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে বিশাল হ্রদ তৈরি হয়। কোনো কারণে সেই বাঁধ ভেঙে গেলে মুহূর্তের মধ্যে কোটি কোটি লিটার পানি নিচের দিকে নেমে আসে এবং ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করে। মূলত এটিকেই বলা হয়, গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (জিএলওএফ)।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব দ্য সানশাইন কোস্টের হিমবাহ প্রকৌশলী অ্যাড্রিয়ান ম্যাককলাম বলেন, উষ্ণ জলবায়ুতে হিমবাহ গলে বরফ পানিতে পরিণত হয় আর সেই পানি প্রাকৃতিক বাঁধে আটকে বড় হ্রদ তৈরি করে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, নেপালে দুই হাজারের বেশি গ্লেসিয়াল হ্রদ রয়েছে, যার মধ্যে ২১টি সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত।