হোম > বিশ্ব > এশিয়া

নেপাল-তিব্বতে বন্যায় মৃত্যু বেড়ে ১২৮০, নিখোঁজ ৫ হাজারের বেশি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

আকস্মিক বণ্যার পর নেপালের একটি বিধ্বস্ত এলাকার ছবি। ছবি: এএফপি

নেপাল-তিব্বতে বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ২৮০ জনে দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজের সংখ্যা ছাড়িয়েছে পাঁচ হাজারেরও বেশি। এ দিকে নয় দিন পেরিয়ে যাওয়ার পরও স্বজনদের কোনো খোঁজ না পাওয়ায় পরিবারের সদস্যরা তাঁদের জন্য প্রতীকী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শুরু করেছেন।

গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে বরফ ও পাথরের ধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা উত্তর ও মধ্য নেপালের শহর ও গ্রামগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআরএমএ) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ভোতে কোশি নদীর বন্যায় নেপালে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১ হাজার ২৫৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৫ হাজার ৮৩ জন।

কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে নিখোঁজ স্বজনদের জীবিত উদ্ধারের আশা ক্ষীণ হয়ে আসায় পরিবারের সদস্যরা কুশ ঘাস দিয়ে প্রতিকৃতি তৈরি করে তাঁদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে শুরু করেছেন। রাসুয়া জেলার পাহারেবেসি গ্রামে এ চিত্র দেখা যায়।

এনডিআরআরএমএর তথ্য অনুযায়ী, চিতওয়ান জেলা থেকে ৩৫৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নওয়ালপরাসি পূর্ব থেকে ২১৮টি এবং নওয়ালপরাসি পশ্চিম থেকে ২১২টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ভারত থেকে উদ্ধার করে নওয়ালপরাসি পশ্চিমে হস্তান্তর করা হয়েছে ১৮টি মরদেহ। এ ছাড়া নুয়াকোট থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১৭৭টি মরদেহ। একইভাবে রাসুয়া জেলা থেকে ১২৭টি, গোর্খা থেকে ৭২টি, ধাদিং থেকে ৬০টি এবং তাহানু থেকে ৩৮টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদনে জানা যায়, চীনের অংশে নেপাল সীমান্তের কাছে তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে বুধবার পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২১ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো সেখানে ৫৪১ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

নেপাল সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন যৌথ উদ্ধারকারী দল বৃহস্পতিবার নবম দিনের মতো অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছে।

দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, বন্যায় রাসুয়া ও নুয়াকোটের উপত্যকাগুলোর ভূপ্রকৃতি বদলে গেছে। নদীর তীর ও পরিচিত বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হয়ে যাওয়ায় দুর্গম এলাকায় চলাচলের সময় হেলিকপ্টারচালকদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

ভারত থেকে যাওয়া টানেল উদ্ধারকারী দল চিলিমে পাওয়ার হাউসে উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় নেপালের সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাজ করছে।

বৃহস্পতিবার ভারতের রাষ্ট্রদূত ভারতীয় টানেল উদ্ধারকারী দলের ঘাঁটি পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি কঠিন হলেও ভারত ও নেপালের দল দুটি ‘বাধাহীনভাবে’ তাদের কাজ চালিয়ে যাবে। বিশেষ সরঞ্জাম ব্যবহার করে ভারত ও নেপালের দল দুটি ইতিমধ্যে টানেলের ভেতরে ১০০ মিটার পর্যন্ত অনুসন্ধান চালিয়েছে। টানেলের আরও ভেতরে অগ্রসর হতে তারা ভারী সরঞ্জাম আনার পরিকল্পনা করছে।

এ দিকে ভোতে কোশি নদীর উজানের এলাকায় টানা বৃষ্টি হওয়ায় ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর পাশাপাশি রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ছোট নদী ও খালের পানি বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগের বন্যা পূর্বাভাস বিভাগের প্রযুক্তিবিদ সরস্বতী বিষ্টা।

নদীসংলগ্ন ও ভাটির এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, মূলত পাহাড়ি অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় অবস্থিত নদীগুলোতে মাঝারি মাত্রার আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে।

এ দিকে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল দেশটিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো ভয়াবহ এই বন্যাকে ‘হিমালয়ান সুনামি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ কঠিন সময়ে সহায়তা ও সংহতি প্রকাশের জন্য প্রতিবেশী দেশগুলো এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি।

এর কয়েক দিন আগে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে খানাল চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তিন গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, নেপালের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ‘ঐতিহাসিক দায়িত্ব’ রয়েছে।

প্রতিবেশী দেশ, বন্ধুরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা এবং সংহতির জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বৃহস্পতিবার খানাল বলেন, ‘এ বিষয়ে নেপাল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা ও সমন্বয় অব্যাহত রাখবে।’

আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সহায়তা যখন অব্যাহতভাবে আসছে, তখন নেপালের স্কুলশিক্ষার্থীরাও প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে নিজেদের পকেটমানির একটি অংশ দান করে সহায়তায় এগিয়ে এসেছে।

এ দিকে গত ২৬ আগস্ট রাসুয়ায় আকস্মিক বন্যার পর তিব্বতে আটকে পড়া ১১৪ জন নেপালি নাগরিককে উদ্ধার করেছে চীন। তাঁদের তাতোপানি সীমান্ত দিয়ে নিরাপদে নেপালে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। নেপালের কর্তৃপক্ষ তাঁদের কাঠমান্ডুতে নিয়ে যাবে এবং পরে নিজ নিজ গন্তব্যে পাঠাবে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত থেকে ইতিমধ্যে ২ হাজার ৫০০ নেপালি দেশে ফিরেছেন। আরও ১ হাজার ৪০০ জন দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট আরেক ঘটনায় চীনের জলবায়ুবিষয়ক একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, তিব্বত মালভূমির হিমবাহগুলো ভবিষ্যতে আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে গত সপ্তাহে তিব্বত-নেপাল সীমান্তে প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যার মতো আরও ধস ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত দুর্যোগ ঘটতে পারে।

চীনা সরকারের সরকারি সংস্থা ন্যাশনাল ক্লাইমেট সেন্টারের উপপরিচালক গাও রং বলেন, ‘গত ৬০ বছরে তিব্বত মালভূমিতে হিমবাহের আয়তন প্রায় ২৪ শতাংশ কমেছে। এ সময় প্রায় ৭ হাজার ছোট হিমবাহ পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে।’