ইন্দোনেশিয়ায় অন্তত ৩৪টি শিশুকে পাচার ও বিক্রির একটি হাই-প্রোফাইল মামলায় গত মঙ্গলবার দেশটির একটি আদালত ১৯ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দিয়েছে। তবে আদালতের এই রায়ের মাধ্যমে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলেও একটি বড় প্রশ্ন অমীমাংসিতই থেকে গেছে—সিঙ্গাপুরে দত্তক নেওয়া ওই শিশুদের ভবিষ্যৎ এখন কী হবে?
পাচার হওয়া ৩৪টি শিশুর মধ্যে অন্তত ১২টি শিশুকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়েছিল, যাদের বেশির ভাগই এখন সেখানে বিভিন্ন পরিবারের কাছে দত্তক হিসেবে বেড়ে উঠছে। আদালতের রায়ের পর এখন দুই দেশেই মূল আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে—শিশুদের কি তাদের জন্মভূমি ইন্দোনেশিয়ায় ফিরিয়ে আনা উচিত, নাকি তারা সিঙ্গাপুরেই থাকবে?
সিঙ্গাপুরের যেসব পরিবার এসব শিশুকে দত্তক নিয়েছে, তারা গত কয়েক মাস ধরে তীব্র উদ্বেগ ও মানসিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
মামলার রায়ের পর বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডেভিড (ছদ্মনাম) নামে সিঙ্গাপুরের এক পালক পিতা বলেন, ‘মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। এখন আমাদের ছেলের কী হবে? প্রায় এক বছর ধরে আমরা ভয় ও দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দুই দেশের সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি যেন শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনা করে দ্রুত একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই পরিস্থিতিতে আমাদের সন্তান এবং আমাদের পরিবারও যে পরোক্ষভাবে পরিস্থিতির শিকার, তা বিবেচনায় রাখার অনুরোধ করছি।’
ডেভিড ও তাঁর স্ত্রী আগে জানিয়েছিলেন, শিশুটিকে দত্তক নেওয়ার সময় তাঁরা জানতেন না যে এটি কোনো পাচারকারী চক্রের কাজ। সিঙ্গাপুর সরকারের নিয়ম অনুযায়ী একাধিক যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই তাঁরা শিশুটিকে ঘরে এনেছিলেন।
আদালতের বিচার চলাকালীন উঠে আসে, পাচারকারী চক্রটি শিশু জন্ম সনদ ও পারিবারিক পরিচয়পত্রে ভুয়া তথ্য ব্যবহার করেছিল। এমনকি চক্রের নারী সদস্যদের শিশুদের গর্ভধারিণী মা হিসেবে কাগজপত্রে দেখিয়েছিল তারা। স্থানীয় কর্মকর্তাদের মাধ্যমে এসব জাল কাগজপত্র তৈরি করা হয়।
ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীন শিশু সুরক্ষা কমিশনের কমিশনার আই মারিয়ান্তি বিবিসিকে বলেন, ‘পাচারের শিকার হওয়া শিশুদের আইনি নীতি অনুযায়ী অবশ্যই ফিরিয়ে আনা উচিত। এমনকি তাদের সিঙ্গাপুরে দত্তক দেওয়া হলেও, সেটির আইনি ভিত্তি কী? নথিপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে যে দত্তক প্রক্রিয়া হয়েছে, সেটিকে চূড়ান্ত বলে মেনে নেওয়া যায় না।’
তবে ইন্দোনেশিয়ার কর্তৃপক্ষ এখনো পর্যন্ত অনেক শিশুরই প্রকৃত জন্মদাতা বাবা-মায়ের পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সিঙ্গাপুরে ইতিমধ্যে অনুমোদিত একটি আন্তর্জাতিক দত্তক প্রক্রিয়া বাতিল করে শিশুদের ফিরিয়ে নেওয়া অত্যন্ত জটিল এবং অভূতপূর্ব একটি বিষয়।
সিঙ্গাপুরের আইনজীবী ডেরেক চু বলেন, ‘সিঙ্গাপুরে শিশু দত্তক নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি নিয়মকানুন অত্যন্ত কড়া। ফলে একবার আদালত দত্তক নেওয়ার আদেশ দিলে তা সাধারণত চূড়ান্ত বলেই বিবেচিত হয়।’
অন্যদিকে শিশু মনস্তত্ত্ববিদ ও আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, দীর্ঘদিন পালক পিতা-মাতার কাছে থাকা শিশুদের হঠাৎ তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলে তা শিশুর মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ইন্দোনেশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞানী নি মাদে মার্তিনি পুতেরি মনে করেন, ‘যেসব শিশুর প্রকৃত জন্মদাতা বাবা-মাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না এবং যারা শিশু বয়স থেকেই সিঙ্গাপুরে বড় হচ্ছে, তাদের দত্তক নেওয়া বাবা-মায়ের সঙ্গেই থাকতে দেওয়া যুক্তিসংগত। তবে ভবিষ্যতে জন্মদাতা পরিচয় পাওয়া গেলে নিজের শিকড় জানার অধিকার শিশুর পাওয়া উচিত।’
ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, শিশুদের আইনি মর্যাদা, জন্মদাতা বাবা-মায়ের পরিচয় এবং সিঙ্গাপুরের চলমান প্রক্রিয়াসহ একাধিক বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সরকার শিশুদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
অন্যদিকে, উদ্ধার হওয়া শিশুদের মধ্যে আটটি শিশুকে বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার বান্দুং শহরের একটি এতিমখানায় রাষ্ট্রীয় নজরদারিতে রাখা হয়েছে। সিঙ্গাপুর সরকারের কাছে সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিক্রিয়া চাওয়া হলেও এখনো কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।