নেপালে ভয়াবহ বন্যায় নিখোঁজ হওয়ার পর মৃত ভেবে পরিবারের সদস্যরা যখন শোকের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছেন, তখনই ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে এক নারীকে। নিখোঁজ হওয়ার ১০ দিন পর তাঁকে উদ্ধার করা হয়।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) রয়টার্স জানায়, উদ্ধার হওয়া ওই নারীর নাম চণ্ডিকা কুমারী শ্রেষ্ঠা। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি বেত্রাবতী গ্রামের ধসে পড়া বাড়ির ভেতরে সংকীর্ণ একটি জায়গায় আটকে ছিলেন তিনি। পানি ও কাদার মধ্যে সামান্য বাতাসের জায়গায় কোনোভাবে বেঁচে ছিলেন শ্রেষ্ঠা।
গতকাল শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) প্রায় ৪৫ মিনিটের উদ্ধার অভিযানে তাঁকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে উদ্ধারকারী দল। পরে তাঁকে সেনাবাহিনীর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়।
পুলিশ কর্মকর্তা মহেন্দ্র দারনাল বলেন, বন্যার পানির তোড়ে শ্রেষ্ঠাদের চারতলা বাড়িটি ভেসে যায়। পরে বাড়িটির ধ্বংসাবশেষ দ্রুতগামী কাদামাটি ও বালুর মধ্যে আটকে ছিল। উদ্ধারকারীরা আশপাশে ঘোরাঘুরি করার সময় ভেতর থেকে ‘বাঁচাও’ শব্দ শুনতে পান। এরপর তাঁরা অনুসন্ধান চালিয়ে শ্রেষ্ঠাকে খুঁজে বের করেন।
দারনাল জানান, তিনি শ্রেষ্ঠার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। পরিবার এরই মধ্যে ১১ দিনের শোক পালনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছিল।
বেত্রাবতী বন্যায় সবচেয়ে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি। শহরটির বাজার ও অধিকাংশ আবাসিক ভবন প্রবল স্রোতে ভেসে আসা বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষের নিচে প্রায় পুরোপুরি চাপা পড়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপের স্তর কোথাও কোথাও শক্ত হয়ে প্রায় কংক্রিটের মতো হয়ে গেছে।
উদ্ধারকর্মীরা হেলমেট পরে শাবল দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কেউ ধসে পড়া ভবনের ফাঁকফোকর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে প্রবেশ করছেন। আটকে থাকা কেউ জীবিত আছেন কি না, তা বোঝার জন্য তাঁরা মাঝেমধ্যে বাঁশি বাজিয়েও সংকেত দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
পুলিশ কর্মকর্তা দারনাল জানান, শ্রেষ্ঠাকে উদ্ধারের পাঁচ দিন আগে বেত্রাবতীর বাজার এলাকায় একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে ২৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। ভবনটিতে একটি ছোট দোকান ছিল। মরদেহগুলো পচন ধরে বিকৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
হিমবাহ ধসে ভয়াবহ বন্যা শুরু হওয়ার ১১ দিন পরও প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। বন্যার স্রোতে ভেসে যাওয়া শত শত মরদেহ বিধ্বস্ত রাসুয়া জেলা থেকে অনেক দূরের নদীর তীরে গিয়ে পড়েছে।
দেশটির চিতওয়ান এলাকায় অজ্ঞাতনামা ও পচে যাওয়া মরদেহগুলোর কয়েক দফা গণদাফনও সম্পন্ন হয়েছে।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের জীবিত উদ্ধারের আশা ক্ষীণ হয়ে এলেও অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে নেপালের কর্তৃপক্ষ। ভবনের নিচে শক্ত হয়ে যাওয়া কাদার স্তর ও বিভিন্ন সুড়ঙ্গে কেউ আটকে আছেন কি না, তা খুঁজে দেখা হচ্ছে।
গত শুক্রবার থেকে এ পর্যন্ত সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে তিনজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজন চীনা নাগরিকও রয়েছেন। ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী ওই এলাকায় ৯০০ জনের বেশি মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শ্রেষ্ঠার মতো আরও কয়েকজন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও বেঁচে থাকার নজির তৈরি করেছে। তাদের মধ্যে আট বছর বয়সী এক শিশুও রয়েছে, যাকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নেপালের ভয়াবহ এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে নিখোঁজ রয়েছে আরও কয়েক হাজার মানুষ।