২৬ আগস্ট সকাল। প্রতিদিনের মতোই দিন শুরু করেছিলেন নেপালের রাসুয়ার স্যাফ্রুবেসির দক্ষিণের ছোট্ট গ্রাম হাকুবেসির বাসিন্দা নিমা দর্জে তামাং। তখনো জানতেন না নেমে আসছে কী বিপর্যয়! ৮টা ৩৭ মিনিটে হিমবাহ ধসে পড়ার পর কোনো প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই তামাং বিকট আওয়াজ শুনতে পান। তাকিয়ে দেখে বিশাল ঢেউ এগিয়ে আসছে তাঁর দিকে।
প্রাণ বাঁচাতে তামাং ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা পাহাড়ের ওপরের দিকে দৌড় দেন। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি। ঢেউয়ের ধাক্কায় পাথরের আঘাত লেগে তাঁর পা ভেঙে যায়। স্রোতে ভেসে যেতে যেতে একটি গাছ আঁকড়ে ধরতে সক্ষম হন তিনি। প্রায় দুই ঘণ্টা গাছটি ধরে ছিলেন। পরে তাঁর বাবা ও ভাই এসে উদ্ধার করেন। এরপরের ২৪ ঘণ্টা তিনি বারবার অচেতন হয়ে পড়ছিলেন তিনি। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারে করে তাঁকে কাঠমান্ডুতে নেওয়া হয়।
ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালের অর্থোপেডিক ইনপেশেন্ট ওয়ার্ডে ভর্তি তামাং বলেন, ‘বাতাস লাগলেও ব্যথা করে। আমার চাচা, চাচি, বোন ও ভগ্নিপতিকে হারিয়েছি। সবাই বলছে, আবারও ভয়াবহ বন্যা হবে।’
শুধু তামাং নয়, সেদিনের এই ভয়াবহ বন্যার জন্য স্থানীয় জনগোষ্ঠী বা কর্তৃপক্ষ কেউই প্রস্তুত ছিল না। আর এই প্রস্তুতি না থাকার ফলে প্রাণ গিয়েছে ১ হাজার ২০৪ জনের আর নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ২১৬ জন।
এদিকে কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, হিমবাহ ধসের প্রায় ৩৮ মিনিট পর স্থানীয়দের কাছে পৌঁছেছিল দুর্যোগের সতর্ক বার্তা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে লেন্দে উপত্যকায় ব্যাপক হিমবাহ ধসের সময় নেপালের খনি ও ভূতত্ত্ব বিভাগ ভূকম্পনজনিত তৎপরতা রেকর্ড করে। বিভাগের অধীন ন্যাশনাল আর্থকোয়েক মনিটরিং অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের প্রধান লোক বিজয় অধিকারী বলেন, ‘আমাদের রেকর্ডে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪। কিন্তু ভূকম্পনজনিত তৎপরতার কম্পাঙ্ক ভূমিকম্পের সঙ্গে মিলছিল না, আর ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণই বিভাগের দায়িত্বের আওতায় পড়ে। তাই আমরা সাধারণত যেমন জনগণকে সতর্ক করি, এ ক্ষেত্রে তা করিনি।’
এরপরের কয়েক মিনিটে রাসুয়ার ভোতে কোশি নদীতে পানির স্তর বাড়ার ঘটনা জনগণকে সতর্ক করার আরেকটি সুযোগ তৈরি করতে পারত। কিন্তু সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে আকস্মিক বন্যার স্রোত স্যাফ্রুবেসি হাইড্রোলজিক্যাল স্টেশনে থাকা রাসুয়ার ভোতে কোশি নদীর পানির স্তর পরিমাপক যন্ত্রটি ভাসিয়ে নিয়ে যায়। নদীর পানির স্তর ধীরে ধীরে বাড়ার ঘটনা শনাক্ত করার জন্য তৈরি এসব পরিমাপক যন্ত্র উচ্চগতির বন্যা শনাক্ত করার উপযোগী ছিল না।
এরও ২৩ মিনিট পর রাসুয়ার জেলা প্রশাসনিক কর্মকর্তা আকস্মিক বন্যার বিষয়ে জলবিদ্যা ও আবহাওয়া বিভাগকে (ডিএইচএম) জানান। জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআরএমএ) মুখপাত্র শান্তি মহাত বলেন, ‘আমরা সকাল ৯টায় ডিএইচএমকে জানিয়েছিলাম। বন্যায় যোগাযোগ টাওয়ারগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় রাসুয়ায় আমরা তেমন কিছু করতে পারিনি। তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে জানিয়েছিল এবং লোকজন বাড়ি বাড়ি গিয়ে একে অপরকে সতর্ক করেছিল।’
তিনি দাবি করেন, ‘ভাটির দিকের মানুষদের খুদে বার্তা, কলার টিউন, গণমাধ্যমে প্রচার এবং পুলিশের মাইকিংয়ের মাধ্যমে সতর্ক করার চেষ্টা করেছি।’
তথ্য পাওয়ার ১৫ মিনিটের মধ্যে, অর্থাৎ সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে রাসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও চিতওয়ানের মানুষ খুদে বার্তা পান। বার্তায় বলা হয়, রাসুয়ার ভোতে কোশি নদীর পানির স্তর বিপৎসীমা অতিক্রম করায় তাঁরা যেন অবিলম্বে নিরাপদ ও উঁচু স্থানে চলে যান। উদ্ধার সহায়তার জন্য কয়েকটি হটলাইন নম্বরও এতে দেওয়া হয়। ততক্ষণে হিমবাহ ধসের পেরিয়ে গেছে ৩৮ মিনিট।
তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ধরনের নির্দিষ্ট দুর্যোগের পূর্বাভাস দেওয়ার সম্ভাবনা ছিল খুবই কম। আর এর ফলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা খাড়া পাহাড়ি ভূখণ্ড দিয়ে এত দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে যে ভাটির দিকের জনগোষ্ঠীকে সতর্ক করার সময় খুব কম ছিল।
জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এনডিআরআরএমএ) সাবেক প্রধান নির্বাহী অনিল পোখরেল বলেন, ‘নেপালে প্রকৃত অর্থে কোনো আগাম সতর্কতাব্যবস্থা নেই। শুধু সেন্সর থাকলেই সেটিকে একটি ব্যবস্থা বলা যায় না; এটিকে আরও অনেক বেশি সমন্বিত হতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চীনের সেন্সরগুলো যদি উজানে কোনো কিছু শনাক্ত করে, তাহলে একসঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কয়েকটি সাইরেন বেজে ওঠা উচিত। মোবাইল ফোন সাইলেন্ট মোডে থাকলেও উচ্চ শব্দের বাজারসহ খুদে বার্তা আসা উচিত।’
গত বছর একই নদীতে ভয়াবহ বন্যার সময়ও ওই এলাকায় নেপালের পর্যবেক্ষণ সীমিত ছিল। নেপালের পর্বতশ্রেণির উত্তরাঞ্চলে এমন একটি ‘ব্লাইন্ড পয়েন্ট’ ছিল, যেখানে নেপাল, চীন কিংবা আন্তর্জাতিক ভূতত্ত্ববিদদের কারোরই পর্যবেক্ষণ ছিল না। এলাকাটি নেপালের কাছে কম অগ্রাধিকার পেয়েছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সরকারি কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দেন, ‘কাজটি বলা যত সহজ, করা ততটা সহজ নয়।’