আফগানিস্তানের নারীদের ওপর তালিবান শাসক গোষ্ঠীর কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও দমন-পীড়নের মধ্যেই এক অভূতপূর্ব ও অনুপ্রেরণামূলক ইতিহাস গড়েছেন ৩১ বছর বয়সী আফগান পর্বতারোহী জাকিয়া আহমেদ। ‘রিভার’ নামে পরিচিত এই অভিযাত্রী প্রথম আফগান নারী হিসেবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট (৮,৮৪৯ মিটার) সফলভাবে জয় করেন।
গত ২১ মে নেপালের সময় সকাল ৭টা ২০ মিনিটে এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখেন জাকিয়া। তাঁর এই জয় ছিল যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি, চরম ট্র্যাজেডি এবং মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফেরার এক অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের গল্প।
মঙ্গলবার (২ জুন) সিএনএন জানায়, জাকিয়া আহমেদের শৈশব কেটেছে আফগানিস্তানের গজনি প্রদেশে। কৈশোর ও তরুণ বয়সে তাঁকে চরম প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। সিএনএন-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক অভিজ্ঞতার কথাও জানান। জাকিয়া জানান, যখন তিনি কিশোরী ছিলেন, তখন কাবুলে যাওয়ার পথে তাঁদের বাসে নৃশংস হামলা চালিয়েছিল তালিবান সদস্যরা। সেই হত্যাযজ্ঞ থেকে বাঁচতে তিনি একটি অবিশ্বাস্য বুদ্ধি খাটান। সেই মুহূর্তটিতে তিনি নিজের শরীরের মাসিকের রক্ত মুখে ও কাপড়ে মেখে মৃত মানুষের মতো অভিনয় করে বাসের মেঝেতে পড়ে ছিলেন, যাতে তালিবানরা তাঁকে মৃত ভাবে। শেষ পর্যন্ত এভাবেই তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
এই ভয়ানক ট্র্যাজেডি এবং পরবর্তীতে পরিবারের এক প্রিয় ভাইকে হারানোর শোক জাকিয়ার জীবনকে ওলটপালট করে দেয়। জীবন বাঁচাতে তিনি আফগানিস্তান ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেন। বর্তমানে তিনি মেলবোর্নের ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটির একজন শিক্ষার্থী। মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে এবং নিজের ভেতরের শক্তিকে পুনরুদ্ধার করতে তিনি পর্বতারোহণ শুরু করেন। এর আগে তিনি ফ্রান্সের মন্ট ব্লাঙ্ক, ভারতের নন্দা দেবী এবং আফগানিস্তানের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ নওশাক (৭,৪০২ মিটার) আরোহণ করেন।
বর্তমানে আফগানিস্তানে তালিবান শাসনে নারীদের শিক্ষা, চাকরি, খেলাধুলা এবং ঘরের বাইরে চলাচলের ওপর চরম নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। জাকিয়া জানান, এভারেস্টের পাহাড়ি পথে যখনই তিনি ক্লান্ত হয়ে যেতেন বা নিশ্বাস নিতে কষ্ট হতো, তখনই তিনি আফগানিস্তানের অবরুদ্ধ কোটি কোটি মেয়ের কথা এবং তাদের অন্ধকার জীবনের কথা ভাবতেন। তাদের স্বপ্ন ও অধিকারের কথা মনে করেই তিনি নতুন উদ্যমে এগিয়ে যেতেন। শৃঙ্গ জয়ের মুহূর্তটি স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘আমি ভাবছিলাম, একদিন এই অন্ধকার আমরা পাড়ি দিয়ে আফগানিস্তানে নিজের বাড়িতে ফিরব।’
এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছানোর পর যখন স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমে বেসক্যাম্প থেকে জাকিয়াকে অভিনন্দন জানানো হয়। সে সময় তিনি অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘দয়া করে আমার মাকে ফোন করো! মাকে জানাও আমি পেরেছি।’
জাকিয়া আহমেদের বোন মুঝগান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমার বোন প্রথম আফগান নারী হিসেবে এভারেস্ট জয় করে ইতিহাস গড়েছে। তার এই যাত্রা শুধু একটি চূড়ায় পৌঁছানো ছিল না; এটি হলো সেই লাখো আফগান নারী ও মেয়েদের জন্য সাহস, স্থিতিস্থাপকতা এবং আশার প্রতীক, যারা সমস্ত সীমাবদ্ধতার বাইরে গিয়ে স্বপ্ন দেখার সাহস রাখে।’
জাকিয়া আহমেদের এই বিশ্বজয় প্রমাণ করে যে, চরম অত্যাচার ও নিপীড়নের মুখেও মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে কখনো চেপে রাখা যায় না।