নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের মধ্যে ৯৭ বছর বয়সী এক বৃদ্ধার অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়ার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। গুনমায়া বোহরা নামের ওই নারী প্রায় ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকার পর জীবিত উদ্ধার হন। তাঁকে উদ্ধারের পর যান্ত্রিক ডিগারের বিশাল বাকেটে করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
বন্যার চার দিন পর রোববার (৩০ আগস্ট) নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর বির হাসপাতালে গুনমায়া বোহরার সন্ধান পায় সংবাদমাধ্যম মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ন্যাশনাল’। সেখানে স্বজনদের ঘিরে হাসপাতালের বিছানায় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তিনি। গুরুতর কোনো আঘাত না পেলেও বয়সের কারণে এতটাই দুর্বল ছিলেন যে, তিনি কথা বলতে পারছিলেন না।
পরিবারের সদস্যরা জানান, উদ্ধারের পর প্রথম দুই-তিন দিন গুনমায়া কারও সঙ্গে কথা বলেননি। নাতি রসিক বোহরা বলেন, ‘তিনি কিছুটা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। দুই-তিন দিন আমাদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। এখন তিনি ভালো আছেন।’
নানিকে জীবিত পাওয়ার মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে রসিক আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না।’
তবে গুনমায়ার এই বেঁচে ফেরার গল্পের আড়ালে রয়েছে আরও বড় এক মানবিক বিপর্যয়। বন্যায় তাঁদের পরিবারের কয়েকজন সদস্য এবং পরিচিত মানুষ এখনো নিখোঁজ। তাদের মধ্যে রসিকের মামা, মায়ের পরিবারের আরও কয়েকজন আত্মীয় এবং তাঁর বাবার এক বন্ধুও রয়েছেন।
রসিকের ধারণা, বন্যাকবলিত কাবিলাশ এলাকায় ৫০ জনের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ থাকতে পারেন। তবে যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। তিনি বলেন, ‘সংখ্যাটা গুনে বলা সম্ভব নয়। কতজন নিখোঁজ, আমি জানি না।’
কাবিলাশ এলাকায় ভয়াবহ বন্যার খবর পেয়ে কাঠমান্ডু থেকে দেবীঘাটে ছুটে গিয়েছিলেন রসিক। সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, কাদা, পানি ও ধ্বংসস্তূপে পুরো এলাকা বিপর্যস্ত। বহু বাড়ি ধসে গেছে, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। উদ্ধারকাজ চালাতে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে পথ তৈরি করতে হচ্ছিল।
এর মধ্যেই পরিবারের সদস্যরা গুনমায়াকে খুঁজতে থাকেন। প্রায় ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা কাদার মধ্যে আটকে থাকার পর তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁর শরীরে সামান্য নড়াচড়া দেখতে পেয়েছিলেন স্বজনেরা। রসিক বলেন, ‘তিনি মাথা নাড়াচ্ছিলেন।’ সেটিই ছিল গুনমায়ার জীবিত থাকার প্রথম সংকেত।
এরপর উদ্ধারকারী ও স্বজনেরা কয়েক ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে ঘন কাদা ও ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে তাকে বের করে আনেন। কিন্তু সেখান থেকে তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে নেওয়ার মতো কোনো রাস্তা ছিল না। ফলে যে ডিগার দিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে পথ তৈরি করা হয়েছিল, সেটির বাকেটেই গুনমায়াকে বসিয়ে কাদাময় এলাকা পার করে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়।
পরে তাঁকে কাঠমান্ডুতে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এত দীর্ঘ সময় কাদার মধ্যে আটকে থাকার পরও তাঁর বড় কোনো আঘাত না পাওয়াকে বিস্ময়কর বলছেন স্বজনেরা। রসিক বলেন, ‘‘তার কিছু হয়নি। এখন তিনি পুরোপুরি ভালো আছেন। ৯৭ বছর বয়সেও তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী।’
সরকার গুনমায়ার চিকিৎসার খরচ বহন করছে এবং শিগগিরই তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। তবে গুনমায়ার উদ্ধারে পরিবারের স্বস্তি এলেও তাঁদের দুশ্চিন্তা শেষ হয়নি। এখনো নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। বিচ্ছিন্ন যোগাযোগব্যবস্থার কারণে দুর্গত এলাকার বহু পরিবারের কাছেই প্রিয়জনদের বিষয়ে কোনো তথ্য পৌঁছাচ্ছে না।