নেপালের দক্ষিণাঞ্চলীয় তরাই অঞ্চলের মধেশ প্রদেশে সাম্প্রদায়িক বিরোধকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সহিংসতা একাধিক জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। এতে সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণে নিহতের সংখ্যা বেড়ে তিনজনে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইতিমধ্যে চারটি জেলায় কারফিউ জারি করা হয়েছে।
সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে প্রশাসন সুনসারি, সপ্তরী, সিরাহা এবং ধনুষা জেলায় সান্ধ্য আইন (কারফিউ) জারি করেছে। পাশাপাশি পারসা জেলায় সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি সামাল দিতে নেপাল পুলিশ, আর্মড পুলিশ ফোর্স এবং নেপাল সেনাবাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারতীয় সীমান্তের কাছে সুনসারি জেলার একটি গ্রামে হিন্দুদের একটি শোভাযাত্রা চলাকালে উচ্চস্বরের গান ও ধর্মীয় পতাকা নিয়ে কিছু হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়। এর জের ধরে গত রোববার এই সহিংসতার সূত্রপাত হয়।
পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলের মতে, ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ গুলি চালালে দুজন পুরুষ নিহত হন। কারফিউ জারি থাকা সত্ত্বেও, গতকাল বৃহস্পতিবার নিকটবর্তী সিরাহা জেলায় একটি বিক্ষোভ চলাকালে তৃতীয় একজন ব্যক্তি মারা যান।
গত রোববার (২৬ জুলাই) রাতে সুনসারি জেলার দেওয়াংগঞ্জ গ্রামীণ পৌরসভায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে ২৪ বছর বয়সী ওম প্রকাশ মেহতা গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার পর থেকেই তরাই অঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
গতকাল দুপুরে সিরাহা জেলার গোলবাজারে নতুন করে সংঘর্ষের সময় ১৭ বছর বয়সী গণেশ যাদব গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁর ঘাড়ে গুলি লেগেছিল।
এর আগে ওই দিনই সকালে বিরাটনগরের নিউরো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ২০ বছর বয়সী জয় প্রকাশ মেহতা। তিনি গত রোববারের সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়েছিলেন।
সংঘর্ষে আহত ১৯ বছর বয়সী সুভাষ ঠাকুর নামে অপর এক তরুণের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা। তবে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নাকি অন্য কোনো পক্ষ থেকে চালানো গুলিতে এই হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, তা নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
গতকাল সকালে মধেশ প্রদেশের প্রাদেশিক রাজধানী জনকপুরে সহিংসতা মারাত্মক রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা বাজার বন্ধ করে পুলিশ ও প্রতিপক্ষ দলের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেলা সাড়ে ৩টা থেকে জনকপুরধাম উপমহানগর এলাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করা হয়।
ধনুষা জেলা প্রশাসন কারফিউ চলাকালীন আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের জন্য সেনাবাহিনীকে ক্ষমতা দিয়েছে। জনকপুরে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান, হেলিকপ্টার এবং পদাতিক টহল জোরদার করা হয়েছে।
সিরাহা জেলার গোলবাজারে বিক্ষোভকারীরা কারফিউ উপেক্ষা করে পূর্ব-পশ্চিম মহাসড়ক অবরোধ করার চেষ্টা করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে। এর আগেই বিক্ষোভকারীরা একাধিক দোকান ও শপিং মলে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।
সিরাহার মুখ্য জেলা কর্মকর্তা সুরেন্দ্র পৌডেল জানান, পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং সহিংসতা থামাতে রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চালানো হচ্ছে।
সহিংস পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেপাল পুলিশ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া অন্য সব ধরনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীর ছুটি বাতিল করে অতিরিক্ত বাহিনী পাঠিয়েছে।
নেপাল পুলিশের মুখপাত্র উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) অবি নারায়ণ কাফলে জানান, নিরাপত্তাকর্মীদের আনুপাতিক বলপ্রয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রক্তপাত এড়াতে কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিপেটার মতো ব্যবস্থা গ্রহণ এবং স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে সংলাপ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তবে স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অভিযোগ করেছেন, বেশ কয়েক দিন ধরে উত্তেজনা চললেও নিরাপত্তা বাহিনী সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গতকাল সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। তিনি এই সহিংসতার একটি নিরপেক্ষ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং দেশে শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে বলে আশ্বস্ত করেছেন।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা ও কাঠমান্ডু পোস্ট