ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরজ শেঠকে নেপাল সেনাবাহিনীর সম্মানসূচক ‘জেনারেল’ পদমর্যাদা প্রদান করেছেন নেপালের প্রেসিডেন্ট রামচন্দ্র পৌডেল। রাজধানী কাঠমান্ডুর প্রেসিডেন্ট ভবনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাঁকে এই সম্মাননা দেওয়া হয়। ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআই–এর প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
ভারতীয় ও নেপালি সেনাবাহিনীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল শেঠকে এই সম্মানসূচক পদমর্যাদা প্রদান করা হয়। এর আগে গতকাল সোমবার, নেপালে তিন দিনের সরকারি সফরের অংশ হিসেবে নেপালি সেনা সদর দপ্তরে জেনারেল শেঠ আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার গ্রহণ ও পরিদর্শন করেন। ১৭ থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত তাঁর এই সফরের মূল লক্ষ্য দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক আরও জোরদার করা। সফরের সূচি অনুযায়ী তিনি কাঠমান্ডুর টুন্ডিখেলে অবস্থিত আর্মি প্যাভিলিয়নে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
সফর সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জেনারেল শেঠ নেপালের সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করবেন। পাশাপাশি নেপালি সেনাবাহিনীর সামরিক পরিচালনা পরিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছ থেকে পারস্পরিক কৌশলগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত ব্রিফিং গ্রহণ করবেন।
আজ মঙ্গলবার জেনারেল শেঠ শিবপুরীতে অবস্থিত আর্মি কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কোর্সের প্রশিক্ষণরত অফিসারদের উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন। এ সময় তিনি প্রশিক্ষক এবং বিদেশি প্রশিক্ষণার্থী অফিসারদের সঙ্গেও মতবিনিময় করবেন। একই দিনে নেপালের জ্যেষ্ঠ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়েও তিনি আলোচনা করবেন।
সফরের শেষ দিন, ১৯ আগস্ট, সেনাপ্রধান জেনারেল শেঠ পোখারায় যাবেন এবং সেখানে আয়োজিত এক্স-সার্ভিসম্যান র্যালিতে অংশ নেবেন। অনুষ্ঠানে তিনি ‘বীর নারীদের’ এবং বীরত্বের পদকপ্রাপ্তদের সম্মাননা দেবেন। পাশাপাশি ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করে পরে ভারতে ফিরে যাবেন।
সফরের গুরুত্ব তুলে ধরে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, ভারত ও নেপালের মধ্যে অতুলনীয় ঐতিহাসিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ রয়েছে। দুই দেশের এই সম্পর্ককে স্নেহভরে ‘রুটি-বেটি কা রিশতা’ বা রুটি-কন্যার সম্পর্ক হিসেবে বর্ণনা করা হয়। জনকপুর-অযোধ্যা এবং লুম্বিনী-বোধগয়ার মতো সভ্যতাগত সংযোগ দুই দেশকে স্বাভাবিক অংশীদারে পরিণত করেছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রতি অভিন্ন অঙ্গীকারও দুই দেশকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জেনারেল শেঠের এই সফর ভারত ও নেপালের গভীর সামরিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার পাশাপাশি দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচনের সুযোগ তৈরি করছে।
জেনারেল ধীরজ শেঠ পরম বিশিষ্ট সেবা পদক, উত্তম যুদ্ধ সেবা পদক এবং অতি বিশিষ্ট সেবা পদকে ভূষিত। তিনি খড়গওয়াসলায় অবস্থিত ভারতের মর্যাদাপূর্ণ ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমিতে যোগ দেন এবং ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বরে আর্মার্ড কোরে কমিশন লাভ করেন।
সেবা, সততা, নিষ্ঠা ও সামরিক পেশার প্রতি গভীর অঙ্গীকার তাঁকে সামরিক দক্ষতা ও পেশাদারিত্বে উৎকর্ষ অর্জনে সহায়তা করেছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের ৩০ জুন তিনি ভারতের সম্মানিত সেনাবাহিনীর চিফ অব দ্য আর্মি স্টাফ বা সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রায় চার দশকের গৌরবময় সামরিক জীবনে জেনারেল শেঠ বিভিন্ন কমান্ড ও স্টাফ পদে একজন দক্ষ কর্মকর্তা ও জেনারেল হিসেবে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীর যুদ্ধ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।
তিনি মরুভূমি অঞ্চলে একটি আর্মার্ড রেজিমেন্ট, পশ্চিমাঞ্চলীয় থিয়েটারে একটি আর্মার্ড ব্রিগেড এবং জম্মু ও কাশ্মীরে একটি কাউন্টার-ইনসার্জেন্সি ফোর্সের সফল নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি দিল্লি এরিয়ার জেনারেল অফিসার কমান্ডিং হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি ভারতীয় সেনাবাহিনীর অন্যতম প্রধান স্ট্রাইক ফরমেশন সুদর্শন চক্র কোরের নেতৃত্ব দিয়েছেন।
এ ছাড়া তিনি সাউথ ওয়েস্টার্ন কমান্ড এবং সাদার্ন কমান্ড, উভয়েরই নেতৃত্ব দিয়েছেন। জেনারেল শেঠ হায়ার কমান্ড কোর্স এবং ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের স্নাতক। তিনি ফ্রান্সের প্যারিসে মর্যাদাপূর্ণ কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কোর্সও সম্পন্ন করেছেন। তাঁর বর্ণাঢ্য সামরিক জীবনের পাশাপাশি ভারতীয় সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের গতিপথ নির্ধারণ, সক্ষমতার রোডম্যাপ তৈরি এবং দীর্ঘমেয়াদি বাহিনী কাঠামো ও বিন্যাস-সংক্রান্ত উদ্যোগ প্রণয়নেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দায়িত্ব পালন করেছেন।
ভারতীয় ও নেপালি সেনাবাহিনীর মধ্যে চলে আসা এই অনন্য ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠান শুধু দুই দেশের সেনাবাহিনীর পারস্পরিক সম্পর্ককেই আরও শক্তিশালী করছে না, বরং ভারত ও নেপালের মধ্যে ঐতিহাসিক ও চিরন্তন বন্ধুত্ব এবং সহযোগিতার বন্ধনকেও আরও দৃঢ় করছে। এই সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে জেনারেল ধীরজ শেঠের অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।