হোম > বিশ্ব > এশিয়া

সবাই মারা গেছে, আমি সব হারিয়েছি—নেপালে বেঁচে যাওয়া মানুষের আহাজারি

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড, ভেঙে পড়া সড়ক ও সেতুর কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। ছবি: এএফপি

নেপালে হিমবাহধসের পর সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৪৭ জনে দাঁড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় এক হাজার মানুষ। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো বহু মানুষ আটকে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড, ভেঙে পড়া সড়ক ও সেতুর কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

গত বুধবার সকালে নেপালের রাসুওয়া জেলায় বাড়ি ফেরার পথে ৫৬ বছর বয়সী ভূপেন থাপা প্রথমে বিকট গর্জনের শব্দ শুনতে পান। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি দেখেন, বাদামি রঙের পানি, বালু ও পাথরমিশ্রিত কাদার বিশাল ঢল সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তার চোখের সামনে বাড়ি, পরিবার ও প্রতিবেশীরা হারিয়ে যান।

তিব্বত সীমান্তের কাছে ধ্বংস হয়ে যাওয়া গ্রাম থেকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা ভূপেনকে উদ্ধার করে ধুনচের একটি সামরিক ঘাঁটিতে নিয়ে যায়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে থাপা জানান, তাঁর বাবা ও স্ত্রী তখন বাড়িতে ছিলেন। কাদার স্রোত ধেয়ে আসতে দেখে তিনি বিপরীত দিকে দৌড়ে প্রাণ বাঁচান।

ভূপেন বলেন, ‘সবাই মারা গেছে। এমন দুর্যোগ থেকে কেউ বাঁচতে পারে না। আমি সবকিছু হারিয়েছি। কাউকে বাঁচাতে না পারার অপরাধবোধ আমাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।’

আজ শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বেসামরিক উদ্ধারকর্মীরা ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে সীমান্তবর্তী বিধ্বস্ত এলাকাগুলোতে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ শুরু করেছে। তবে জীবিত কাউকে উদ্ধারের আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।

নুওয়াকোট জেলার ছোট শহর বিদুরেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শহরটির প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ মারা গেছে। কার্কি নামে এক বাসিন্দা বলেন, ‘মনে হচ্ছিল আমাদের দিকে সুনামি এগিয়ে আসছে। প্রথম তলা পর্যন্ত সবকিছু কাদায় ঢেকে গেছে। এই ক্ষতি থেকে আমরা কখনোই পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারব না।’

কাঠমান্ডুর হাসপাতালগুলোতে নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে ভিড় জমিয়েছেন উদ্বিগ্ন মানুষ। ১৯ বছর বয়সী ভাইয়ের সন্ধানে ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় টিচিং হাসপাতালে অপেক্ষা করছেন আয়ুশ তামাং। তাঁর ভাই তিব্বত সীমান্তের কাছে একটি প্রকল্পে কাজ করতেন। বুধবার সকাল থেকে তাঁর কোনো খোঁজ নেই।

এদিকে ভুটেকোশি নদীতে ধ্বংসাবশেষ জমে একটি হ্রদ তৈরি হয়েছে, যার পানি ক্রমেই বাড়ছে। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে, হ্রদটির বাঁধ ভেঙে গেলে নতুন করে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে। চীনা কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনে বিপুল পরিমাণ পানি ওই এলাকায় প্রবাহিত হতে পারে।

ত্রাণ সংস্থাগুলো বলছে, অনেক বসতি পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ও ১৯টি যান চলাচলযোগ্য সেতু ক্ষতিগ্রস্ত বা ভেসে গেছে। ফলে দুর্গতদের কাছে খাবার, বিশুদ্ধ পানি, আশ্রয় ও জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেছেন, সরকারের সব সংস্থা সর্বোচ্চ সক্ষমতা নিয়ে কাজ করছে। নিখোঁজদের উদ্ধার, আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়াই এখন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।