নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে সরাসরি উত্তরে প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ৭ হাজার ২৪৫ মিটার বা প্রায় ২৪ হাজার ফুট (২৩ হাজার ৭৭০ ফুট) উঁচু লাংটাং লিরুং পর্বতের রয়েছে এক ভয়াবহ ইতিহাস। এখানেই গতকাল বুধবার হিমবাহ ধসের ঘটনা ঘটে। আর এতে এখন পর্যন্ত ২৭০ জনের প্রাণ হারানোর খবর পাওয়া যাচ্ছে। এদিকে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন আজকালের মধ্যেই এমন ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার বা পানি ও কাদার স্রোতে ‘দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউ’ আসার আশঙ্কা আছে।
এর আগে, ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে নেপালে ৭ দশমিক ৮ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে লাংটাং লিরুংয়ের দক্ষিণ ঢালে একটি বিশাল তুষারধস বা অ্যাভালাঞ্চ সৃষ্টি হয়। সেই তুষারধস নিচের হিমবাহে গিয়ে পড়ে এবং লাংটাং গ্রামকে বরফ ও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা দেয়। ওই ঘটনায় অন্তত ৩০০ মানুষ নিহত হন।
এবার গতকার বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে চীনের সীমান্তের কাছে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়। ঠিক একই সময়ে লাংটাং লিরুংয়ের উত্তর ঢালে ঘটে যায় বিশাল একটি তুষারধস।
লাংটাং লিরুং পর্বতটি পুরোপুরি নেপালের ভূখণ্ডে অবস্থিত। তুষারধসের কারণে নেমে আসা বিপুল ধ্বংসস্তূপ চীনের সঙ্গে নেপালের সীমান্ত চিহ্নিতকারী এবং বর্ষার পানিতে ফুলে ওঠা লেন্দে খোলার গতিপথ আটকে দেয়। এর ফলে সেখানে একটি হ্রদের মতো জলাধার তৈরি হয়। কিছুক্ষণ পর সেই জমে থাকা পানি হঠাৎ বেরিয়ে গিয়ে কাদা ও বিশাল পাথরের দেয়ালের মতো স্রোত তৈরি করে। সেই স্রোত ত্রিশূলী নদী দিয়ে নেপালের ভেতরে দ্রুত নেমে যায়।
স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করা বিশেষজ্ঞদের অন্তত প্রাথমিক ধারণা এমনই। প্ল্যানেট ল্যাবসের তোলা স্যাটেলাইট ছবি দেখে তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।
তবে এই বিপর্যয়ের মূল কারণ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো মতভেদ রয়েছে। ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পটি উত্তর ঢালের ধস ঘটিয়েছে কি না, নাকি ধসটি এতটাই বিশাল ছিল যে, সেটিই ভূকম্পনের মতো একটি কম্পন সৃষ্টি করেছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
যদি ভূমিকম্পই তুষারধসের কারণ হয়ে থাকে, তাহলে এটি এমন একটি পর্বতকে নড়িয়ে দিয়েছে যার বরফ ও তুষার আগে থেকেই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছিল।
এর সঙ্গে আরও কয়েকটি বিষয় পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক করে তুলেছে। ঘটনাটি ঘটেছে বর্ষা মৌসুমের শেষ দিকে। ফলে পাহাড়ের ঢালে প্রচুর তুষার ও পানি ছিল। একই সঙ্গে হিমবাহ পিছিয়ে যাওয়ার ফলে পড়ে থাকা পাথর, মাটি ও অন্যান্য উপাদানে তৈরি মোরেইনগুলো আগে পারমাফ্রস্ট বা স্থায়ীভাবে জমে থাকা মাটির বরফের কারণে শক্তভাবে বাঁধা থাকত। কিন্তু এখন সেগুলো গলে যাওয়া বরফ ও পানিতে অনেক বেশি ভেজা ও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এই নির্দিষ্ট বিপর্যয় নেপালের ভেতরের একটি হিমবাহ থেকেই শুরু হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু এর প্রভাব আরও বড় একটি দীর্ঘমেয়াদি বিপদের দিকে ইঙ্গিত করছে। তিব্বত মালভূমি থেকে উৎপত্তি হওয়া হিমবাহের হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যা, পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়া এবং মোরেইন ধসে পড়ার মতো ঘটনা ভবিষ্যতে সীমান্ত পেরিয়ে বড় ধরনের দুর্যোগ সৃষ্টি করতে পারে।
ভূমিকম্পকে কারণ হিসেবে না ধরলেও হিমালয়ে সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের কয়েকটি ভয়াবহ ‘হিমালয়ান সুনামি’ দেখা গেছে। এসব ঘটনায় হিমবাহ, বরফ, পানি, ভূমিধস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব একসঙ্গে কাজ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২১ সালের চামোলি, ২০২১ সালের মেলামচি, ২০২৩ সালের সিকিম, ২০২৪ সালের থামে, ২০২৫ সালের ভোতে কোসি এবং এখন ২০২৬ সালের এই ঘটনা। এসব ঘটনার প্রায় সবকটিই বর্ষা মৌসুমে ঘটেছে।
গত বছর ৮ জুলাইয়ের বন্যাতেও ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। নিচের মানচিত্রে ওই বন্যার অবস্থান দেখানো হয়েছে। ওই ঘটনায় ১৮ জন নিহত হন। নেপাল-চীন সীমান্তে বাণিজ্য ও পর্যটনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত চেকপয়েন্টটি পানির তোড়ে ভেসে যায়। নেপালের বেশ কয়েকটি মহাসড়ক, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনও ধ্বংস হয়ে যায়। এসব অবকাঠামোর মেরামতের কাজ তখন মাত্র শুরু হয়েছিল।
এদিকে, নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক বসন্ত রাজ অধিকারী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে জানিয়েছেন, আজ বৃহহস্পতিবার অথবা আগামীকাল শুক্রবার ওই এলাকায় ‘দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউ’ আঘাত হানার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। চীনে থাকা সহকর্মীদের সঙ্গে তিনি নিয়মিত যোগাযোগ করছেন এবং তারাও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। অধিকারীর ভাষায়, সেখানে এখন খুব বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে না। তবে নতুন করে ভূমিধস হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আরও জানান, তারা হিমালয়ের বিভিন্ন ধরনের পাহাড়ি দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তন এখানে বাস্তবেই ঘটছে এবং তার প্রভাব সরাসরি দেখা যাচ্ছে।
তবে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করেও ঠিক কোন দিনে এমন একটি বিপর্যয় ঘটবে, তা আগে থেকে জানা সম্ভব হয়নি। অধিকারীর কথায়, ‘আমরা পর্যবেক্ষণ করছি, কিন্তু আমরা জানতাম না যে নির্দিষ্ট কোনো একটি দিনেই এমন ঘটনা ঘটবে।’
তথ্যসূত্র: নেপালি টাইমস ও বিবিসি