ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন পারমাণবিক চুক্তি করতে চায়, যাতে দুই পক্ষই অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়। গতকাল রোববার এক ইরানি কূটনীতিক এমন কথা বলেছেন বলে খবরে প্রকাশ। কয়েক দিনের মধ্যেই তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে দ্বিতীয় দফা আলোচনা হওয়ার কথা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, এ মাসের শুরুতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিনের বিরোধ নিয়ে আবার আলোচনা শুরু করে। বিরোধটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঘিরে। লক্ষ্য হলো নতুন কোনো সামরিক সংঘাত এড়ানো। রয়টার্সকে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযানের সম্ভাবনার প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন। এ জন্য অঞ্চলটিতে দ্বিতীয় একটি বিমানবাহী রণতরি পাঠানো হয়েছে।
স্লোভাকিয়ার রাজধানী ব্রাটিস্লাভায় এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, তিনি কূটনৈতিক সমাধান ও আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতাকেই অগ্রাধিকার দেন। তবে তিনি এটাও পরিষ্কার করেছেন যে এমনটা না-ও হতে পারে। রুবিও বলেন, ‘কেউ কখনো ইরানের সঙ্গে সফল চুক্তি করতে পারেনি, কিন্তু আমরা চেষ্টা করব।’
যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানার হুমকি দিয়েছে ইরান। তবে রোববার তারা তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নেয়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক কূটনীতি-বিষয়ক উপপরিচালক হামিদ গানবারি আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্সকে বলেন, ‘চুক্তির স্থায়িত্বের স্বার্থে জরুরি হলো, যুক্তরাষ্ট্রও এমন খাতে লাভবান হবে, যেখানে দ্রুত ও উচ্চ অর্থনৈতিক রিটার্ন পাওয়া যায়।’
তিনি বলেন, ‘তেল ও গ্যাস ক্ষেত্রে যৌথ স্বার্থ, যৌথ ক্ষেত্র উন্নয়ন, খনি খাতে বিনিয়োগ, এমনকি বিমান কেনাবেচাও আলোচনার অন্তর্ভুক্ত।’ গানবারির মতে, ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করতে পারেনি।
২০১৮ সালে ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেন। ওই চুক্তির মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমা আরোপের বিনিময়ে তেহরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছিল। পরে ট্রাম্প আবার কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেন।
শুক্রবার একটি সূত্র রয়টার্সকে জানায়, স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারসহ একটি মার্কিন প্রতিনিধিদল মঙ্গলবার জেনেভায় ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবে। রোববার এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে এ বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ২০১৫ সালের চুক্তির আগে আলোচনা ছিল বহুপক্ষীয়। কিন্তু বর্তমান আলোচনা কেবল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ওমান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে।
রুবিও বলেন, ‘স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার সফরে যাচ্ছেন, আমার মনে হয় তারা এখনই রওনা হয়েছেন। গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হবে, দেখা যাক কী ফল হয়।’ তবে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনায় অংশ নিতে জেনেভার উদ্দেশে তেহরান ছেড়েছেন। সেখানে তিনি জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থা আইএইএর প্রধানসহ অন্যদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে তাঁর মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভানচি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিনিময়ে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আপসের ইঙ্গিত দিয়েছেন। রোববার বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘চুক্তি করতে চায় কি না, সেটি প্রমাণ করার দায়িত্ব এখন আমেরিকার।’ তিনি ইরানের পারমাণবিক সংস্থার প্রধানের সোমবারের বক্তব্যের উল্লেখ করেন। সেখানে বলা হয়েছিল, নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে দেশটি তাদের সবচেয়ে বেশি সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়াম পাতলা বা নিম্নমাত্রায় রূপান্তরে সম্মত হতে পারে। এটিকে তিনি ইরানের নমনীয়তার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।
তবে তিনি পুনরায় বলেন, তেহরান শূন্য মাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ মেনে নেবে না। অতীত আলোচনায় এটি ছিল বড় অচলাবস্থা। ওয়াশিংটনের মতে, ইরানের ভেতরে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাব্য পথ খুলে দেয়। ইরান অবশ্য এমন অস্ত্র তৈরির চেষ্টা অস্বীকার করে।
জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে যোগ দিয়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে একাধিক বিমান হামলায় অংশ নেয়। একই সঙ্গে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এই সপ্তাহের শুরুতে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র চীনে ইরানের তেল রপ্তানি কমাতে কাজ করবে বলে একমত হন। শনিবার অ্যাক্সিওস এ তথ্য জানায়।
ইরানের মোট তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি যায় চীনে। ফলে এ বাণিজ্যে কোনো কাটছাঁট হলে ইরানের তেল আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।