মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্দেশিত অবরোধ তুলে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফেরার জন্য চাপ দিচ্ছে সৌদি আরব। আরব কর্মকর্তাদের মতে, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার এই মার্কিন পদক্ষেপ ইরানকে আরও ক্ষুব্ধ করে তুলতে পারে, যার ফলে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতেও বিশৃঙ্খলা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের খবরে বলা হয়েছে, ইরানের পঙ্গু হয়ে যাওয়া অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াতেই মূলত এই অবরোধ। তবে সৌদি কর্মকর্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এর জবাবে ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব এল-মান্দেব প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে। লোহিত সাগরের এই প্রবেশপথটি বর্তমানে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির অবশিষ্ট ভরসা।
যুদ্ধের শুরুতে হরমুজ প্রণালীতে হামলা চালিয়ে ইরান এই পথটি বন্ধ করে দেয়, যার ফলে বিশ্ববাজারে দৈনিক প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি আটকে গেছে এবং তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে উঠে গেছে। এই পথটি পুনরায় উন্মুক্ত করার যে মার্কিন প্রচেষ্টা, সৌদি আরবের বর্তমান অবস্থান মূলত তার সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকিরই বহিঃপ্রকাশ।
গত সপ্তাহান্তে ট্রাম্পের বোমাবর্ষণ আর আলোচনার হুমকি যখন ইরানকে দমাতে ব্যর্থ হলো, তখন সোমবার থেকে ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ কার্যকর হয়। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্টভাবে চেয়েছেন জ্বালানির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালী যেন সম্পূর্ণ উন্মুক্ত থাকে। প্রশাসন নিয়মিতভাবে উপসাগরীয় মিত্রদের সাথে যোগাযোগ রাখছে, যাতে ইরান যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশকে জিম্মি করতে না পারে।’
সৌদি আরব সম্প্রতি মরুভূমির বুক চিরে পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগর দিয়ে দৈনিক প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে, যা যুদ্ধের আগের পর্যায়ের সমান। কিন্তু লোহিত সাগরের বহির্গমন পথটি যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে এই সরবরাহ ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়বে।
ইয়ামেনের একটি বড় উপকূলীয় এলাকা ইরানের মিত্র হুতি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে। তারা গাজা যুদ্ধের সময় এই নৌপথে ব্যাপক বিঘ্ন ঘটিয়েছিল। আরব কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ইরান এখন হুতিদের ওপর চাপ দিচ্ছে যেন তারা আবারও এই চোকপয়েন্টটি বন্ধ করে দেয়। নিউ আমেরিকা পলিসি ইনস্টিটিউটের ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম ব্যারন মনে করেন, ইরান যদি বাব এল-মান্দেব বন্ধ করতে চায়, তবে হুতিরাই তাদের জন্য উপযুক্ত অংশীদার, কারণ গাজা সংকটের সময় তারা তাদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে।
হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণকারী ইরানি আধা-সামরিক বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ডের ঘনিষ্ঠ তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, অবরোধের কারণে ইরান লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বারটিও বন্ধ করে দিতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলো চায় না এই যুদ্ধের শেষেও হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে থাক। কিন্তু সৌদি আরবসহ অনেক দেশই এখন আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের পক্ষে জোর দিচ্ছে এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে উভয় পক্ষই নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাব এল-মান্দেব হচ্ছে ইয়েমেন ও হর্ন অব আফ্রিকার মাঝখানের একটি সরু পথ, যা লোহিত সাগরকে ভারত মহাসাগরের সাথে যুক্ত করেছে। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে চলাচলের জন্য এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। গাজা যুদ্ধের সময় হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় এখানকার চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল।
গত বছর ৫৩ দিনের মার্কিন অভিযানের পর হুতিরা বর্তমান দ্বন্দ্বে অনেকটা দূরে থাকলেও তারা ইরানের একটি শক্তিশালী রিজার্ভ বাহিনী হিসেবে রয়ে গেছে। হুতিরা নিজেও জানিয়েছে, বাব এল-মান্দেব বন্ধ করে দেওয়া তাদের অন্যতম বিকল্প। ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, তার কয়েক দিন পরই সৌদি আরব পারস্য উপসাগরের রাস তানুরা থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল সরবরাহ সরিয়ে নেয়। এখন বাব আল-মানদাবে কোনো হামলা হলে তা সৌদি আরবের জন্য বিশেষ উদ্বেগের কারণ হবে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পররাষ্ট্র নীতি উপদেষ্টা আলী আকবর বেলায়েতি গত ৫ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেন, ইরান বাব এল-মান্দেবকে হরমুজ প্রণালীর মতোই দেখে। হোয়াইট হাউস যদি তাদের ভুলের পুনরাবৃত্তি করে, তবে তারা দেখবে এক সংকেতেই বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি প্রবাহ থমকে যেতে পারে।
সৌদি কর্মকর্তারা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে জানিয়েছেন, তারা হুতিদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি পেয়েছিলেন যে তারা সৌদি জাহাজে হামলা করবে না। তবে পরিস্থিতি এখন অস্থিতিশীল। সুইডিশ ব্যাংক এসইবির কৌশলবিদ এরিক মেয়ারসন মনে করেন, ইরান যদি তার তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হতে দেখে, তবে তারা হুতিদের মাধ্যমে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইয়ানবু টার্মিনালের রপ্তানি বন্ধ করে দিতে পারে।
উল্লেখ্য, গত বছর এই হুতি বিদ্রোহীরাই ট্রাম্পের পাঠানো উন্নত যুদ্ধজাহাজ ও বিমানের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজেদের শক্তির প্রমাণ দিয়েছিল। সে সময় তারা বেশ কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করে এবং তাদের হামলায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস হ্যারি এস ট্রুম্যান থেকে একটি যুদ্ধবিমান সমুদ্রে পড়ে গিয়েছিল।
এ ছাড়া, গতকাল সোমবার ইরান পার্শ্ববর্তী দেশগুলৈর বন্দরগুলোর প্রতিও হুমকি ছুড়ে দিয়েছে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যদি পারস্য উপসাগরে ইরানের কোনো বন্দরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, তবে এই অঞ্চলের অন্য কোনো বন্দরও নিরাপদ থাকবে না।