জ্বালানির দাম বাড়তে থাকায় হরমুজ প্রণালি আবার চালু করার উপায় খুঁজতে সহযোগী ও উপদেষ্টাদের ওপর চাপ দিচ্ছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। সামরিক বিকল্পের ক্ষেত্রে তাঁর সবচেয়ে কার্যকর ভরসা হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন কর্পস। পেন্টাগন এরই মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ২ হাজার ২০০ সদস্যের দ্রুত প্রতিক্রিয়াদানকারী বাহিনী ৩১ তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট মোতায়েন করেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, সাবেক ও বর্তমান মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে—ইরানের দক্ষিণ উপকূলের কাছে অবস্থিত এক বা একাধিক দ্বীপ দখল করে তা চাপ সৃষ্টি বা বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানি হামলা প্রতিহত করার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। ইউনিটটি অ্যাম্ফিবিয়াস অ্যাসল্ট বা উভচর আক্রমণ জাহাজ ইউএসএস ত্রিপোলিতে অবস্থান করছে এবং জাপান থেকে মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে তাদের এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময় লাগবে।
মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ বাহিনী। তারা জাহাজকে ভাসমান ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। এতে চারটি অংশ থাকে—সাঁজোয়া যান ও কামানসহ মেরিন পদাতিকের স্থলযুদ্ধ ইউনিট, এমভি-২২ ওস্প্রি টিল্ট-রোটর বিমান, হেলিকপ্টার এবং এফ-৩৫বি জেটসহ বিমান ইউনিট; সমন্বয়কারী কমান্ড টিম এবং সরঞ্জাম, রসদ ও রক্ষণাবেক্ষণ সরবরাহকারী লজিস্টিক ব্যাটালিয়ন। সমুদ্র ও আকাশপথে দ্রুত হামলা চালানোই এদের বিশেষ দক্ষতা।
বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে। সরু এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রসহ নানা দেশে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং এটি ট্রাম্পের জন্য সামরিক ও রাজনৈতিক সংকট তৈরি করেছে।
প্রণালি পুনরায় খুলতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সেই সক্ষমতাকে লক্ষ্যবস্তু করছে, যার মাধ্যমে তারা এই কৌশলগত পথকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও সমুদ্র মাইন তৈরির স্থাপনা, উৎক্ষেপণ কেন্দ্র ও গুদাম। গত মঙ্গলবার মার্কিন সেনাবাহিনী উপকূলজুড়ে অবস্থিত শক্তভাবে সুরক্ষিত ইরানি স্থাপনায় ৫ হাজার পাউন্ড ওজনের গভীর ভেদন ক্ষমতার বোমা নিক্ষেপ করেছে। এসব স্থাপনায় জাহাজবিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ করা হয় বলে জানিয়েছে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড।
প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা চললেও ইরান মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনী ও তাদের মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু করে যাচ্ছে। থিংক ট্যাংক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ননরেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো এবং এমআইটির অধ্যাপক ক্যাটলিন টালম্যাজ বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র হাজার হাজার এরিয়াল অ্যাটাক অভিযান চালিয়েছে, তবু আমরা এখনো নিশ্চিত নই যে এসব সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে কি না। এতে প্রশ্ন ওঠে, আদৌ কখনো পুরোপুরি ধ্বংস করা সম্ভব হবে কি না।’
সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের মতে, মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট যুক্ত হওয়ায় তেহরানের ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য ট্রাম্পের হাতে নতুন বিকল্প এসেছে। ইরানের দক্ষিণ উপকূলের কাছে কয়েকটি ছোট দ্বীপ রয়েছে, যেখানে তেল অবকাঠামো, ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি এবং গুহায় লুকিয়ে রাখা নৌযান রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপ, যা উপসাগরের উত্তর প্রান্তে এবং প্রণালি থেকে প্রায় ৩০০ মাইল দূরে অবস্থিত। এটি ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র। গত সপ্তাহে মার্কিন হামলায় সেখানে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ধ্বংস হওয়ার পর সোমবার ট্রাম্প দ্বীপটির তেল পাইপলাইন লক্ষ্য করে হামলার হুমকি দেন।
বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, তেল অবকাঠামো ধ্বংস না করে মেরিন বাহিনী দ্বীপটি দখল করে প্রণালি খুলতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সাবেক সেন্টকম প্রধান জেনারেল ফ্র্যাঙ্ক ম্যাকেনজি বলেন, ‘খার্গ দ্বীপ দিয়ে তাদের ৯০ শতাংশ তেল যায়। তাই মূলত দুটি পথ আছে। এক, অবকাঠামো ধ্বংস করা, যা ইরান ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অপরিবর্তনীয় ক্ষতি ডেকে আনবে। দুই, এটি দখল করে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা, যাতে বিশ্ব অর্থনীতি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।’
এ ধরনের অভিযান সমুদ্রপথে চালানো যেতে পারে, যেখানে ইউএসএস ত্রিপোলি থেকে জাহাজ থেকে সামরিক যান নামিয়ে মেরিন ও সরঞ্জাম সরাসরি উপকূলে নামানো হবে। অথবা আকাশপথেও করা যেতে পারে, এফ-৩৫বি ও হেলিকপ্টার ব্যবহার করে, যেগুলো রানওয়ে ছাড়াই অবতরণ করতে পারে। প্রয়োজনে উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলো আকাশপথ ও ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিলে সেখান থেকেও অভিযান চালানো সম্ভব।
প্রণালির ভেতরের অন্য দ্বীপগুলোও দখল করা হতে পারে। এতে মার্কিন বাহিনী কৌশলগত অবস্থানে থেকে ইরানি দ্রুতগামী নৌকা ঠেকাতে এবং জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্য করা ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করতে পারবে বলে সাবেক নৌবাহিনী কমান্ডার ভাইস অ্যাডমিরাল জন মিলার জানান।
সম্ভাব্য লক্ষ্যগুলোর একটি কেশম দ্বীপ। তীরের কাছাকাছি অবস্থিত তীর-আকৃতির এই বড় দ্বীপে ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে ইরানি নৌযান ও ক্ষেপণাস্ত্র রাখা আছে। এখানে একটি বড় লবণমুক্ত পানি উৎপাদন কেন্দ্রও রয়েছে, যেটিতে হামলার অভিযোগ করেছে ইরান। আকার ও অবস্থানের কারণে এই দ্বীপ থেকে তেহরান প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
মেরিন বাহিনী কিশ দ্বীপও দখল করতে পারে, যা কেশমের পশ্চিমে অবস্থিত একটি ছোট অর্থনৈতিক কেন্দ্র এবং যেখানে একটি বিমানবন্দর রয়েছে। অথবা কেশমের পূর্বে অবস্থিত পাথুরে হরমুজ দ্বীপ, যেখানে ইরান ছোট আক্রমণাত্মক নৌযান নোঙর করে।
ফ্রান্সের সায়েন্স পো-র আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্রের সহকারী অধ্যাপক নিকোল গ্রায়েভস্কি বলেন, এসব দ্বীপের কিছুতে শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি রয়েছে, আবার কিছু দ্বীপ অতীতে শাহ আমলে ব্যবহৃত হলেও এখন প্রায় পরিত্যক্ত। ইরানের মূল ভূখণ্ডে নয়, বরং উপকূলের দ্বীপগুলোতে মেরিন মোতায়েন করলে ট্রাম্প দাবি করতে পারবেন যে তিনি ইরানে মার্কিন স্থলবাহিনী না পাঠানোর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন।
মিলার বলেন, ‘আমি তাদের ইরানের ভেতরে দেখছি না। কোথাও মোতায়েন করলে তা সম্ভবত উপসাগরে ইরানসংলগ্ন দ্বীপগুলোতেই হবে, যা সাময়িকভাবে কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে।’