মাত্র কয়েক দিন আগেও তাদের হইহুল্লোড়, চিৎকার, চেঁচামেচি আর উচ্ছলতায় প্রাণ পেত যে পরিবেশ, সে পরিবেশ পাথরের মতো ভারী হয়ে উঠল তাদেরই নীরবতায়। নিষ্পাপ, মায়াবী মুখগুলোকে শেষ বিদায় দিতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠেছেন হাজারো মানুষ। গতকাল মঙ্গলবার ইরানের হরমোজগান প্রদেশের মিনাম শহরে ১৬৫ স্কুল শিশুর জানাজায় দেখা গেল এ দৃশ্য।
ইরানে গত শনিবার হামলা শুরু করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। সেদিন মিনাবের ওই স্কুলে শিশুদের ক্লাস ছিল। সকালে স্কুলে এসেছিল তারা। সেই স্কুলে চালানো হয় হামলা। এতে এখন পর্যন্ত ১৬৫ শিশু মারা গেছে। গতকাল গণজানাজার মাধ্যমে বিদায় জানানো হলো সেই শিশুদের।
গতকালও ইরানজুড়ে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই হামলার মধ্যেই মিনাব স্কয়ারে জানাজায় হাজারো মানুষের ঢল নামে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে এসব তথ্য জানায় আল জাজিরা ও সিএনএন।
জানাজার ভিডিও এবং ছবিতে দেখা যায়, ইরানের পতাকায় মোড়ানো ছোট ছোট কফিন ঘিরে অশ্রুসিক্ত শোকার্ত মানুষের ভিড়। তাঁদেরকে সমস্বরে দোয়া পড়তে দেখা যায়। শোকের এই মিছিলে অনেকের হাতে ছিল নিহত শিশুদের ছবি, যাদের কয়েকজনের বয়স কেবল সাত বছর। এ সময় দেখা যায়, দুই হাতে পরম মমতায় ছোট্ট, মিষ্টি আতেনার ছবি উঁচু করে ধরে রেখেছিলেন তাঁর মা। চিৎকার করে বারবার তিনি বলছিলেন, ‘এ হলো মার্কিন বর্বরতা আর অপরাধের এক প্রামাণ্য দলিল।’ মিছিলের মধ্যে থেকে বারবার ধ্বনিত হচ্ছিল,
‘আমেরিকা নিপাত যাক। ইসরায়েলের ধ্বংস চাই।’
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটারে) গত সোমবার নিহত শিশুদের জন্য সদ্য খোঁড়া সারি সারি কবরের ছবি পোস্ট করে এই হত্যাকাণ্ডের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সরাসরি দায়ী করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী লেখেন, ‘এই কবরগুলো সেই ১৬০ জনের বেশি নিষ্পাপ ছোট মেয়ের জন্য খোঁড়া হচ্ছে, যারা একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন-ইসরায়েলি বোমা হামলায় প্রাণ হারিয়েছে। তাদের দেহগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।’
মিনাবের এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে ইউনেসকো এবং নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মানবাধিকারকর্মী মালালা ইউসুফজাইসহ অনেকে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, স্বেচ্ছায় কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল বা বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো রীতিমতো যুদ্ধাপরাধ। সেই মানবাধিকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের যে দম্ভ, তারই অসারতা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে মেয়েদের সারি সারি ছোট কবরগুলো। পৃথিবীজুড়ে হানাহানি, ধ্বংস আর স্বার্থপরতার সঙ্গে যাদের কখনো কোনো যোগসাজশ ছিল না।