ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংলাপের আরেকটি পর্ব আয়োজনের জন্য পাকিস্তান, আঞ্চলিক দেশ ও পরাশক্তিগুলো সক্রিয়ভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কূটনীতিকরা গতকাল সোমবার জানিয়েছেন, ভঙ্গুর এই প্রক্রিয়াটি যাতে পুনরায় সংঘাতের দিকে মোড় না নেয়, সে জন্য তারা তৎপরতা বাড়িয়েছেন। আপাতত, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৪৫ বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন মধ্যস্থতাকারীরা।
এসব নেপথ্য যোগাযোগের বিষয়ে অবগত কর্মকর্তারা পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম দ্য ডনকে জানিয়েছেন, মধ্যস্থতাকারীরা তেহরান ও ওয়াশিংটনকে আবারও আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে কাজ করছেন। এই প্রচেষ্টার কেন্দ্রে রয়েছে পাকিস্তান এবং তাদের পেছনে সমর্থন দিচ্ছে তুরস্ক ও মিসর। কর্মকর্তারা জানান, এখনকার তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হলো যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে বলেছেন যে, চরম উত্তেজনার মধ্যেও যুদ্ধবিরতি এখনো টিকে আছে।
তিনি বলেন, ‘ইসলামাবাদে একটানা ২১ ঘণ্টা সরাসরি আলোচনা হয়েছে। আমি নিজে এর সাক্ষী। আমরা দিনরাত কাজ করেছি। যুদ্ধবিরতি এখনো কার্যকর। কিছু বাধা আছে এবং সেগুলো নিরসনের চেষ্টা চলছে।’ তিনি আরও যোগ করেন যে, এই আলোচনা সম্ভব করতে পাকিস্তানের নেতৃত্ব অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে আলাপকালেও তিনি একই বার্তা দিয়েছেন। তিনি তাকে জানিয়েছেন যে, যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে পাকিস্তান প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। জাপানি নেতা ইসলামাবাদের ভূমিকার প্রশংসা করেন এবং শান্তি প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থন জানান।
কয়েক সপ্তাহের সংঘাতের পর গত ৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, তার মেয়াদ আগামী ২২ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা। কারিগরিভাবে এটি এখনো টিকে থাকলেও দিন দিন পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধ আরোপের দিকে এগোচ্ছে, যার প্রেক্ষিতে ইরান সতর্ক করে বলেছে যে, এমন পদক্ষেপ হবে যুদ্ধবিরতির চরম লঙ্ঘন।
ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত এই আলোচনা ছিল ১৯৭৯ সালের পর দুই পক্ষের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ। বৈঠকটি কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়েছে, তবে আলোচনা একেবারে ভেঙেও পড়েনি। উভয় প্রতিনিধিদল সরাসরি বৈঠক এবং বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আলোচনাসহ বিভিন্ন ফরম্যাটে ব্যস্ত ছিল। তবে কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে না পারায় কূটনীতিকরা একে একটি সংকীর্ণ কিন্তু বাস্তব কূটনৈতিক সুযোগ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অচলাবস্থার মূলে ছিল কাঠামোগত মতপার্থক্য। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি—ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সীমাবদ্ধতা এবং অস্ত্র তৈরির বিরুদ্ধে সুরক্ষাকবচসহ দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি এবং হরমুজ প্রণালিতে অবাধ নৌ-চলাচলের নিশ্চয়তা চেয়েছে।
অন্যদিকে, ইরান আন্তর্জাতিক কাঠামোর আওতায়, বিশেষ করে এনপিটির অধীনে তার সার্বভৌম অধিকারের স্বীকৃতি, ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং কোনো অপরিবর্তনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আগে বিশ্বাসযোগ্য গ্যারান্টি দাবি করেছে। আলোচনার ক্ষেত্রে পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা বা সিকুয়েন্সিং একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওয়াশিংটন মনে করে, যেকোনো বৃহত্তর সমাধানের আগে ইরানের পক্ষ থেকে ছাড় দেওয়া পূর্বশর্ত। অপরদিকে তেহরানের দাবি, আগে আস্থা তৈরির পদক্ষেপ ও গ্যারান্টি দিতে হবে। কূটনীতিকদের মতে, এই বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে দুই পক্ষই একটি বৃত্তাকার অচলাবস্থায় আটকে আছে।
হরমুজ প্রণালি একটি বিশেষ বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন প্রতিনিধিদল অবাধ ও নিরাপদ সামুদ্রিক চলাচলের ওপর জোর দিয়েছে, অন্যদিকে ইরান এই জলপথের নিয়ন্ত্রণকে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের একটি প্রধান কৌশলগত সুবিধা হিসেবে দেখছে। ইসলামাবাদের আলোচনার পর নৌ-বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি কূটনৈতিক তৎপরতায় নতুন করে জরুরি অবস্থার সৃষ্টি করেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, সমুদ্রে যেকোনো ভুল হিসাবনিকাশ দ্রুত যুদ্ধবিরতি নস্যাৎ করে দিতে পারে।
ইসলামাবাদের আলোচনা শেষ হওয়ার পর পাকিস্তান আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার, চীনের ওয়াং ই, তুরস্কের হাকান ফিদান, সৌদি আরবের প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান এবং মিসরের বদর আবদেলআতির সঙ্গে ধারাবাহিক ফোনালাপ করেছেন। এই আলোচনাগুলোতে পাকিস্তান একটি ধারাবাহিক বার্তা দিয়েছে—সব পক্ষকে অবশ্যই যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে হবে এবং সংলাপই হলো সামনে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র পথ। আন্তর্জাতিক অংশীদাররা এতে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন।
ওয়াং ই পররাষ্ট্রমন্ত্রী দারের সঙ্গে আলাপে জোর দিয়ে বলেন, এখনকার অগ্রাধিকার হলো সংঘাত যাতে পুনরায় শুরু না হয় এবং যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে তৈরি হওয়া গতিশীলতা বজায় রাখা। তিনি একে ‘ভঙ্গুর’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সংলাপের সমর্থন করতে এবং উত্তেজনা বাড়াতে পারে এমন কাজের বিরোধিতা করতে আহ্বান জানান।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই তৎপরতাগুলো একটি অনানুষ্ঠানিক জোট গঠনে সহায়তা করেছে, যার লক্ষ্য হলো প্রক্রিয়াটি টিকিয়ে রাখা এবং ২২ এপ্রিলের সময়সীমার আগে কিছুটা সময় পাওয়া। মূল লক্ষ্য হলো হয় যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো, অথবা কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা শুরু করা যা দ্বিতীয় দফার রাজনৈতিক আলোচনার পথ প্রশস্ত করবে। ইসলামাবাদের বৈঠকের পর থেকে মধ্যস্থতাকারীরা অমীমাংসিত ইস্যুগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বার্তা বিনিময়ে সহায়তা করছেন। তারা আশা করছেন, উভয় পক্ষকে অন্তত ৪৫ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি বাড়াতে রাজি করানো যাবে।
উভয় পক্ষই আলোচনা চালিয়ে যেতে একমত হয়েছে, তবে পরবর্তী দফার আলোচ্যসূচি, লক্ষ্য, ফরম্যাট এবং ভেন্যু নিয়ে মতভেদ রয়ে গেছে। একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, ইরান ইসলামাবাদের ভৌগোলিক নৈকট্য, পরিচিত পরিবেশ এবং মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকার ওপর আস্থার কারণে এখানেই পরবর্তী বৈঠক করতে আগ্রহী। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিকল্প জায়গা বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এটি মূলত আলোচনার পরিবেশের মূল্যায়ন, লজিস্টিক পছন্দ এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিবেচনার প্রতিফলন। তবে ধারণা করা হচ্ছে, যদি মূল বিষয়গুলোতে কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়, তবে ভেন্যু নিয়ে ভিন্নমত খুব বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
পুরো এই প্রক্রিয়ার ওপর বৃহত্তর আঞ্চলিক পরিস্থিতির ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী বর্তমান যুদ্ধবিরতি সব অঞ্চলকে পুরোপুরি কাভার করেনি, বিশেষ করে লেবানন। যদিও সেখানে সংঘাতের মাত্রা কিছুটা কমেছে, তবুও লেবানন সীমান্ত এখনো ইরানের কৌশলগত হিসাবনিকাশে বড় প্রভাব ফেলছে।