ভারতে তিন বোনের আত্মহত্যায় পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসছে। জানা গেছে, কোরিয়ান সংস্কৃতির প্রতি আসক্তি এবং বাবা চেতন কুমারের দুই কোটি রুপি ঋণের কথা।
চেতন কুমার পেশায় একজন স্টক ট্রেডার। পুলিশ জানিয়েছে, চেতন কুমারের দুই স্ত্রী, যারা সম্পর্কে একে অপরের বোন। প্রথম স্ত্রীর এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর তিন মেয়ে, যারা বুধবার রাতে মারা যায়। প্রথম বিয়ের ১৭ বছর পর তিনি শ্যালিকাকে বিয়ে করেন।
পুলিশ জানায়, পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে ভুগছিল। প্রথম পক্ষের ছেলে সন্তান বুদ্ধি-প্রতিবন্ধকতাসম্পন্ন হওয়ায় এ নিয়েও হতাশায় ছিলেন চেতন। গত দুই বছর ধরে মেয়েদের স্কুলে যাওয়াও বন্ধ ছিল। বিশাল অঙ্কের ঋণের চাপের কারণেই আর মেয়েদের স্কুলে পাঠাননি তাদের বাবা।
গতকাল বুধবার সকালে উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে নয় তলা থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে তিন বোন। পুলিশ জানিয়েছে, কোরিয়ান ড্রামা দেখতে না পারায় তারা গভীর মানসিক চাপে ভুগছিল।
পুলিশের তদন্তে আরও উঠে এসেছে, তিন বোনই কোরিয়ান সংস্কৃতি (কে-ড্রামা ও কে-পপ) এবং অনলাইন জগতের প্রতি তীব্রভাবে আসক্ত ছিল। বাবা মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ডিলিট করে দেওয়ার পর থেকেই তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল।
নিহত তিন বোন নিশিকা (১৬), প্রাচী (১৪) ও পাখি (১২) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মারিয়া, আলিজা ও সিন্ডি নাম ব্যবহার করে কোরিয়ান সেজে একটি অ্যাকাউন্ট খুলেছিল। সে অ্যাকাউন্টে তাদের বিপুল সংখ্যক অনুসারীও ছিল।
পুলিশ জানায়, প্রায় ১০ দিন আগে তাদের বাবা চেতন কুমার ওই অ্যাকাউন্টের কথা জানতে পেরে সেটি মুছে দেন এবং মেয়েদের মোবাইল ফোন নিয়ে নেন। চেতন কুমার বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের জন্য ওই মোবাইল ফোনগুলো বিক্রি করে দেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
শুধু তাই নয়, তিনি মেয়েদের দ্রুত বিয়ে দিয়ে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন। জবাবে মেয়েরা না কি বলেছিল, ‘তারা বিয়ে করতে পারবে না, কারণ তারা “ভারতীয় নয়, কোরিয়ান”। তাই তারা এখানে বিয়ে করতে পারবে না।’
তিন বোনের বাবা দাবি করেন, ওই তিন বোন একটি টাস্কভিত্তিক কোরিয়ান গেম খেলত যা শেষ টাস্কটি ছিল আত্মহনন। তবে বুধবার সন্ধ্যার দিকে পুলিশ জানায়, গেমের বিষয়টি সত্যি নয়। তাদের মৃত্যুতে কোরিয়ান সংস্কৃতির প্রভাব ছিল ঠিকই, কিন্তু সেটিই তাদের মৃত্যুর একমাত্র কারণ নয়।
ঘটনাস্থলে একটি সুইসাইড নোট ও ডায়েরি পেয়েছে পুলিশ। সুইসাইড নোটে লেখা ছিল, ‘এই ডায়েরিতে যা কিছু লেখা আছে, সব পড়ে নিও, কারণ এর সবই সত্যি। এখনই পড়ো। আমি সত্যিই দুঃখিত। সরি, পাপা।’
নোটটির শেষে হাতে আঁকা একটি কান্নার ইমোজিও ছিল।
ডায়েরিটির আট পাতাজুড়ে তাদের গেম খেলা, কে-ড্রামা ও কে-পপ পছন্দের কথা, মোবাইল ব্যবহারের কথা লিখে গেছে তিন বোন।
কোরিয়ান ড্রামা দেখতে বাধা দেওয়ায় তারা বাবার ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ছিল বলে ওই ডায়েরি থেকে জানা যায়। ডায়েরিতে লেখা ছিল, ‘কোরিয়াই আমাদের জীবন। তবুও তুমি কীভাবে বললে আমাদের জীবন ছেড়ে দিতে? তোমরা জানতে না আমরা তাদের কতটা ভালোবাসতাম। এখন তার প্রমাণ দেখে নাও। আমরা নিশ্চিত, কোরিয়ান এবং কে-পপই আমাদের জীবন ছিল। আমরা তোমাকে বা পরিবারকে ততটা ভালোবাসিনি, যতটা ওই কোরিয়ান অভিনেতা এবং কে-পপ গ্রুপকে ভালোবাসতাম।’
তারা আরও অভিযোগ করেছে, বাবা তাদের ভারতীয় ছেলের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন, অথচ তারা কোরিয়ানদের ভালোবাসত। নোটে লেখা হয়, ‘আমরা কখনোই এমন কিছু আশা করিনি। তাই আমরা এই পথ বেছে নিচ্ছি। সরি, পাপা।’