ইরানে হামলা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ইসরায়েল লেবাননেও হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে স্থল অভিযান শুরু করেছে। গাজায় যুদ্ধবিরতি থাকলেও সেখানে ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত, আর অধিকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাও চলছে। ইসরায়েলকে ‘বর্ণবাদী’ রাষ্ট্র আখ্যা দিয়ে দেশটির সাংবাদিক ও লেখক গিদিওন লেভি বলেন, ‘ইসরায়েলের জন্য সামরিক বিকল্প শেষ উপায় নয়, বরং প্রথম উপায়।’
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গিদিওন লেভি বলেন, ইসরায়েলের সামরিকবাদ ‘অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক এবং এটি এই দেশের মানুষের মানসিকতাকেও গড়ে তোলে।’ তিনি আরও কথা বলেছেন ইসরায়েলের ‘ডিক্যাপিটেশন’ বা নেতৃত্ব ধ্বংসের কৌশল, ফিলিস্তিন প্রশ্নের বর্তমান অবস্থা এবং ইরানের সঙ্গে শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে জিতছে, নাকি তারা ইরানের প্রতিক্রিয়া পুরোপুরি ভুলভাবে হিসাব করেছে—এমন প্রশ্নের জবাবে লেভি বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, এই যুদ্ধে কোনো স্পষ্ট বিজয়ী থাকবে না। এর জন্য ইতিমধ্যেই চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উভয়েই এই যুদ্ধ শুরু করেছে কোনো পরিষ্কার ধারণা ছাড়াই। ইরানে শাসন পরিবর্তনের লক্ষ্য হয়তো বৈধ এবং অঞ্চলটির নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজনীয়ও হতে পারে, কিন্তু আমি নিশ্চিত নই যে তা কেবল শক্তি প্রয়োগ করে সম্ভব।’
লেভি বলেন, ‘ধরুন, অলৌকিকভাবে যদি ইরানের বর্তমান শাসন পতনও ঘটে, তারপর কী হবে? এই শাসনের জায়গায় কে আসবে, সে বিষয়ে কি কারও কোনো ধারণা আছে? গাজায় হামাস নিয়ে আমরা একই সমস্যার মুখোমুখি। ইসরায়েল হামাসকে চায় না। হামাস সত্যিই একটি খারাপ সংগঠন, কিন্তু এর জায়গায় কে আসতে পারে, তা নিয়ে কারও কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই।’
তাঁর ভাষায়, ‘যদি শেষ লক্ষ্য বা এন্ডগেম পরিষ্কার না থাকে, তাহলে যুদ্ধ শুরু করা উচিত নয়। এখন আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি, যেখানে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে, রক্তপাত বাড়ছে, ধ্বংস বাড়ছে, এবং আরও দেশ এতে জড়িয়ে পড়ছে। বলতে গেলে, পুরো অঞ্চলের প্রায় অর্ধেকই ইতিমধ্যে যুদ্ধে জড়িয়ে গেছে। এতে লাভবান হবে কে, অস্ত্র ব্যবসায়ী ও অস্ত্রশিল্প ছাড়া?’
ইসরায়েল সবসময় লক্ষ্য পূরণে নেতৃত্বশূন্যকরণ বা ডিক্যাপিটেশন কৌশল ব্যবহার করেছে। ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হয়েছেন। সম্প্রতি আলি লারিজানিও নিহত হয়েছেন। আপনি কি মনে করেন এসব হত্যাকাণ্ড ইসরায়েলকে নিরাপদ করেছে—এমন এক প্রশ্নের জবাবে গিদিওন লেভি বলেন, ‘একেবারেই না, জোর দিয়ে বলছি। প্রথমত, এমন পদক্ষেপের বৈধতা নিয়েই আমার সন্দেহ আছে। রাষ্ট্রপ্রধানদের হত্যা করা যায় না, যদি না আপনি হিটলারের মতো কারও মুখোমুখি হন, যা এখানে প্রযোজ্য নয়। নৈতিক ও আইনি প্রশ্ন বাদ দিলেও, বছরের পর বছর ধরে এসব হত্যাকাণ্ড থেকে ইসরায়েল কী অর্জন করেছে? প্রায় সব সময়ই নিহত নেতার স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তি আগের চেয়ে বেশি কঠোর বা উগ্র হন। আপনি কি মনে করেন খামেনির ছেলে তার বাবার চেয়ে বেশি উদার হবেন, নাকি উল্টোটা? আমি মনে করি না এটি বৈধ, আইনসম্মত বা কার্যকর। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থাকে, এসব নেতার জায়গায় কে আসবে।’
ইসরায়েলে ইরানের আঘাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাইরে থেকে সবসময়ই বিষয়গুলো আরও ভয়াবহ মনে হয়। অন্য সংঘাত কভার করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি, সেখানে যাওয়ার আগে আমি বেশি ভয় পেতাম, পৌঁছে গেলে কম। কারণ মানুষ খুব দ্রুত নতুন বাস্তবতায় অভ্যস্ত হয়ে যায়। আমাদের অত্যন্ত উন্নত প্রতিরক্ষা ও সতর্কবার্তা ব্যবস্থা আছে। ইরান থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়া মাত্রই আমরা সতর্কবার্তা পাই এবং আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাই।’
তিনি বলেন, ‘তবে এটি স্বাভাবিক জীবন নয়। আমি এখনই একটি আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে এসেছি। দিন-রাত কয়েকবার সেখানে যেতে হয়। অর্থনীতি প্রায় স্থবির, শিক্ষা ব্যবস্থা বন্ধ, বিদেশে যাওয়ার ফ্লাইট খুব কম। এই অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে পারে না। মানুষ সহ্য করে নিচ্ছে ঠিকই। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ৯৩-৯৪ শতাংশ ইহুদি ইসরায়েলি এই যুদ্ধকে সমর্থন করছেন, যা প্রায় উত্তর কোরিয়ার মতো পরিসংখ্যান। পরিস্থিতি আরও জটিল হলে হয়তো তারা পুনর্বিবেচনা করবেন। বহু বছর ধরে ইসরায়েলি গণমাধ্যমে ইরানকে ‘মহা শত্রু’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাই মানুষ সেই শত্রুর বিরুদ্ধে যেকোনো লড়াইকে সমর্থন করে। তবে সময়ের সঙ্গে এটি বদলাতেও পারে।’
ইসরায়েল কতদিন এভাবে চলতে পারবে—প্রসঙ্গে এই অভিজ্ঞ সাংবাদিক বলেন, ‘ইসরায়েল অনেক দিন ধরেই এভাবে চলছে। প্রশ্ন হলো, কতদিন চলতে পারবে তা নয়, বরং আমরা কী ধরনের রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছি। এসব সংঘাতের মধ্য দিয়ে ইসরায়েল নিজেও বদলে যাচ্ছে, এবং ভালো দিকে নয়। ১০ বা ২০ বছর আগের ইসরায়েল আর নেই। এটি ক্রমেই আরও সহিংস, আরও জাতীয়তাবাদী, আরও বর্ণবাদী এবং আরও সামরিকতান্ত্রিক হয়ে উঠছে। আমরা এখনই তা দেখতে পাচ্ছি। আর প্রশ্ন হলো, বিশ্ব কতদিন এটি চলতে দেবে?’
ইসরায়েলের রাষ্ট্র হিসেবে বর্ণবাদী হয়ে উঠার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যে বিশ্ব দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম বর্ণবাদী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পেরেছিল, সেই বিশ্বই দ্বিতীয় বর্ণবাদী রাষ্ট্রের বিষয়ে প্রায় নিষ্ক্রিয়, বরং অনেকে এখনও ইসরায়েলকে সমর্থন করছে।’
ইসরায়েল বর্ণবাদী রাষ্ট্র কি না—এই প্রশ্নের জবাবে লেভি বলেন, ‘আর কীভাবে একে ব্যাখ্যা করবেন, যখন সেখানে দুটি জনগোষ্ঠী আছে, এক পক্ষের সব অধিকার আছে, আর অন্য পক্ষের কোনো অধিকারই নেই? এটিকে আর কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়? আমার জানা মতে এর অন্য কোনো সংজ্ঞা নেই।’