গাজা উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অন্তত ১১ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। গাজার চিকিৎসা সূত্র এই তথ্য জানিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, নতুন গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পরিষদ যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা পুনর্গঠনে ৫ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে।
স্থানীয় সময় গতকাল রোববারের এসব হত্যাকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া ‘যুদ্ধবিরতি’ লঙ্ঘনের সর্বশেষ ঘটনা। এই যুদ্ধবিরতি গত ১০ অক্টোবর কার্যকর হয়। হাসপাতাল সূত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছে, উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থীশিবিরে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের আশ্রয় নেওয়া তাঁবুগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। এতে অন্তত পাঁচজন নিহত হন।
তারা আরও জানায়, দক্ষিণের খান ইউনিসে ইসরায়েলি হামলায় আরও পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া গাজার সূত্রগুলো আল জাজিরাকে জানিয়েছে, রোববার গাজা সিটির পূর্বে তাল আল-হাওয়া এলাকায় এক হামলায় ফিলিস্তিন ইসলামিক জিহাদের (পিআইজে) কমান্ডার সামি আল-দাহদুহ নিহত হয়েছেন।
হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম সাম্প্রতিক এসব হামলাকে ‘নতুন হত্যাকাণ্ড’ ও ‘অপরাধমূলক উসকানি’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এসব হামলা ‘মাঠে রক্তাক্ত বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়ার স্পষ্ট চেষ্টা।’ একই সঙ্গে এটি এমন একটি বার্তা যে, গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যেসব উদ্যোগ ও সংস্থা কাজ করছে, সেগুলো অর্থহীন। কারণ সব পক্ষ যুদ্ধবিরতি মেনে চলার প্রয়োজনীয়তার কথা বললেও দখলদার শক্তি তার আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে।
গাজা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল অন্তত ৬০১ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং আরও ১ হাজার ৬০৭ জনকে আহত করেছে। গাজার সরকারি জনসংযোগ কার্যালয় জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইসরায়েল অন্তত ১ হাজার ৬২০ বার চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
অন্যদিকে ইসরায়েল হামাসকে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে। তাদের দাবি, চারজন সেনা নিহত হয়েছেন। সাম্প্রতিক হামলার মধ্যেই ট্রাম্প ঘোষণা দেন, তাঁর নতুন গঠিত বোর্ড অব পিসের প্রথম বৈঠক বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত হবে।
ট্রাম্প তাঁর ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে শেয়ার করা এক পোস্টে লিখেছেন, বোর্ডের সদস্যরা গাজা পুনর্গঠনে ৫ বিলিয়নের বেশি ডলার দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। পাশাপাশি ‘গাজাবাসীর নিরাপত্তা ও শান্তি বজায় রাখতে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী ও স্থানীয় পুলিশে হাজার হাজার সদস্য’ নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশকে বোর্ড অব পিসে যোগ দিতে ১ বিলিয়ন ডলার করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এতে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, অন্তত পাঁচটি দেশ ইতিমধ্যে এই অর্থ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক রোজিল্যান্ড জর্ডান জানিয়েছেন, ‘খবর আছে যে, সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রথম দেশ হিসেবে ১ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কুয়েতও যোগ দিতে পারে বলে খবর রয়েছে।’ বাকি তিনটি দেশের নাম এখনো প্রকাশ করা হয়নি। বোর্ডের ২০ জন সদস্যের মধ্যে কতজন বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন, তা ট্রাম্প উল্লেখ করেননি। শুরুর দিকে ইসরায়েলের গাজায় গণহত্যামূলক যুদ্ধ শেষ করার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে এই বোর্ডের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে পরে এটি বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংঘাত সমাধানের বৃহত্তর ম্যান্ডেট নিয়ে গড়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এতে জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব উদ্যোগে একটি কাঠামো তৈরির চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশ এই বোর্ডে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ট্রাম্প তাঁর পোস্টে আরও বলেন, ‘হামাসকে পূর্ণ ও তাৎক্ষণিক নিরস্ত্রীকরণের অঙ্গীকার রক্ষা করতে হবে।’
অন্যদিকে হামাসের হাজেম কাসেম বোর্ড অব পিসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, তারা যেন ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগ করে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন বন্ধ করায় এবং ‘কোনো বিলম্ব বা কৌশল ছাড়া’ চুক্তি বাস্তবায়নে বাধ্য করে।