যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট ও আন্তর্জাতিক ফোন সংযোগের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের পরও নানা উপায়ে বিদেশে থাকা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছেন ইরানের সাধারণ মানুষ। সীমান্ত এলাকার অস্থায়ী সেবা, ভিপিএন ব্যবহার এবং প্রযুক্তিগত নানা কৌশলের মাধ্যমে তাঁরা যোগাযোগ বজায় রাখছেন, যদিও এতে খরচ এবং ঝুঁকি দুটোই বেশি।
রোববার (১৫ মার্চ) রাতে এক প্রতিবেদনে বিবিসি জানিয়েছে, ইরান–তুরস্ক সীমান্তে এক ব্যক্তি বিশেষ ধরনের একটি সেবা দিচ্ছেন। তাঁর কাছে রয়েছে দুটি মোবাইল ফোন—একটি ইরানের মোবাইল নেটওয়ার্কে সংযুক্ত, অন্যটি তুরস্কের নেটওয়ার্কে। আন্তর্জাতিক কল বন্ধ থাকায় এই পদ্ধতিই অনেকের জন্য একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে। বিদেশে থাকা মানুষেরা হোয়াটসঅ্যাপে তাঁর তুর্কি ফোনে কল করেন। এরপর তিনি ইরানি ফোন দিয়ে তাদের পরিবারের সদস্যদের নম্বরে ডায়াল করেন এবং দুটি ফোন একসঙ্গে ধরে রেখে কথা বলার সুযোগ করে দেন।
সীমান্ত এলাকায় অবস্থানের কারণে তিনি একই সময়ে তুরস্ক ও ইরানের মোবাইল নেটওয়ার্কে সংযুক্ত থাকতে পারেন। তবে এই সেবা খুবই ব্যয়বহুল। অর্থ পাঠানোর ফিসহ চার থেকে পাঁচ মিনিটের একটি কল করতে প্রায় প্রায় ৩৮ ডলার খরচ হয়। তবুও অনেকের কাছে পরিবারের কণ্ঠ শোনার সুযোগ এতটাই মূল্যবান যে তাঁরা এই ব্যয় মেনে নিচ্ছেন।
তেহরানের বাসিন্দা আভা (ছদ্মনাম) জানান, এই সপ্তাহে তাঁর বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। তাঁর বাগ্দত্তা কানাডা থেকে তেহরানে আসার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধের কারণে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।
আভা বলেন, ‘এই মুহূর্তে তার সঙ্গে কথা বলার জন্য ইন্টারনেটে যুক্ত হতে আমাকে অনেক টাকা খরচ করতে হচ্ছে।’
আরেক বাসিন্দা হামিদও বিদেশে থাকা স্ত্রী ও স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে নানা উপায়ে চেষ্টা করছেন। তিনি ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক (ভিপিএন) ব্যবহার করছেন, যা ইন্টারনেটের সরকারি নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটাতে সাহায্য করে। তবে তাঁর মতে, ভিপিএন ব্যবহারের খরচও হঠাৎ বেড়ে গেছে। এখন প্রায় ১ গিগাবাইট ডেটার জন্য প্রায় ২০ ডলার দিতে হচ্ছে। অথচ ইরানে মাসিক ন্যূনতম মজুরি মাত্র ১০০ ডলারের মতো।
হামিদ বলেন, ‘যখনই সামান্য সময়ের জন্য ইন্টারনেট সংযোগ পাই, তখন সবাইকে বার্তা পাঠাই—তাদের পরিবারের ফোন নম্বর দিতে বলি, যাতে খোঁজ নিতে পারি এবং খবর পৌঁছে দিতে পারি।’
বিদেশে থাকা ইরানিরাও গভীর উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন। কানাডার টরন্টোতে থাকা নেগার বলেন, তাঁর পরিবার মাঝে মাঝে অল্প সময়ের জন্য ফোন করতে পারছে, শুধু এটা জানাতে যে, তাঁরা ভালো আছে। কিন্তু এতে উদ্বেগ পুরোপুরি কমছে না।
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে থাকা শাদি জানান, তেহরানে তাঁর বাবা-মায়ের বাসার কাছেই একটি তেল ডিপোতে হামলা হয়েছিল। বিস্ফোরণের পর কালো বৃষ্টি পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় তাঁর বাবা এখন আর হাঁটতে বের হন না।
ইউরোপে থাকা জাহরা বলেন, তাঁর ভাই ভিপিএন ব্যবহার করে টেলিগ্রামে যোগাযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘সে যদি আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টার বেশি অফলাইনে থাকে, তখন ভয়ংকর সব চিন্তা মাথায় আসে।’
প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাবেও অনেক পরিবারের সদস্য যোগাযোগ রাখতে পারছেন না। লন্ডনে থাকা পুনেহ বলেন, তিনি কেবল তাঁর বোনের সঙ্গেই যোগাযোগ করতে পারেন। কারণ বোনটি প্রযুক্তি ব্যবহারে কিছুটা দক্ষ।
তিনি বলেন, ‘আমাদের মনে হয় যেন গল্পের অর্ধেক অংশ আমাদের কাছে নেই। আমরা একে অন্যের মাধ্যমে সেই গল্প জোড়া লাগানোর চেষ্টা করছি।’