কেনিয়ার স্থানীয় অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত অবদান রাখতে না পারা এবং দশকের পর দশক ধরে চুক্তির সুফল ভোগ করেও অবকাঠামো না গড়ার অভিযোগে ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী টাটা কেমিক্যালসকে সমস্ত কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুটো।
গতকাল বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) কেনিয়ার দক্ষিণভাগের কাজিয়াদো কাউন্টির মাগাদি শহর পরিদর্শনকালে প্রেসিডেন্ট রুটো এই কঠোর বার্তা দেন। রুটো স্পষ্ট করে বলেন, সরকারের মূল লক্ষ্য কেবল কাঁচামাল আহরণ নয়, বরং কেনিয়ার মাটিতে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও নতুন শিল্প কারখানা স্থাপন।
টাটা কেমিক্যালসের পরিবর্তে দুটি নতুন প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে প্রেসিডেন্ট রুটো বলেন, ‘টাটা কোম্পানি প্রায় ১০০ বছর ধরে এখানে চুক্তির অধীনে কাজ করছে। কিন্তু কাজিয়াদোতে তারা কোনো নতুন কারখানা গড়ে তোলেনি। আমরা কি অন্য কারও দাস?’
প্রেসিডেন্ট রুটো আরও জানান, নতুন আসা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি কাজিয়াদোতে বড় আকারের কাচ কারখানা নির্মাণ করবে এবং অন্যটি রাসায়নিক পণ্য প্রস্তুত করবে।
প্রেসিডেন্টের নির্দেশের পর এক বিবৃতিতে টাটা কেমিক্যালস জানিয়েছে, তারা কেনিয়া সরকারের কর্তৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ‘গঠনমূলক সংলাপে’ বসতে আগ্রহী।
প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, কেনিয়ার খনি, ব্লু ইকোনমি ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের চাওয়া সমস্ত তথ্য, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং কর ও রয়্যালটি সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথি ইতিমধ্যে জমা দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমাদের অগ্রাধিকার হলো কর্মীদের কল্যাণ, মাগাদি অঞ্চলের সম্প্রদায় এবং কেনিয়ার সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন অব্যাহত রাখা।’
টাটা কেমিক্যালস ও কেনিয়া সরকারের মধ্যকার এই বিরোধ নতুন নয়। চলতি বছরের ২৮ জুলাই কেনিয়ার খনি বিষয়ক ক্যাবিনেট সচিব হাসান জোহো ‘টাটা কেমিক্যালস মাগাদি লিমিটেড’ (টিসিএমএল)-এর সোডা অ্যাশ উত্তোলনের কাজ স্থগিত করার আদেশ দেন। সে সময় কেনিয়া সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কিছু অভিযোগ তোলা হয়:
সরকারের এই স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে টাটা কেমিক্যালস হাইকোর্টে আবেদন করলেও আদালত সরকারের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।
মাগাদি অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে টাটা কেমিক্যালসের বড় ভূমিকা রয়েছে। কাজিয়াদোর মাগাদি হ্রদ থেকে প্রাকৃতিক সোডা অ্যাশ (সোডিয়াম কার্বোনেট) তৈরি করা হয়, যা কাচ, ডিটারজেন্ট ও বিভিন্ন রাসায়নিক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
১৯১১ সাল থেকে ‘মাগাদি সোডা কোম্পানি’ নামে শুরু হওয়া এই ব্যবসাটি ২০০৫ সালে অধিগ্রহণ করে ভারতীয় জায়ান্ট টাটা কেমিক্যালস। এই কারখানা থেকে প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টন সোডা অ্যাশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় রপ্তানি করা হয়।
টাটার দাবি অনুযায়ী, প্রায় ৫০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্থানীয় ঠিকাদারদের পাশাপাশি মাগাদি সম্প্রদায়ের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ এই কারখানার সুবাদে চিকিৎসা, পানীয় জল ও শিক্ষার মতো মৌলিক সুবিধা পেয়ে আসছেন।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন কাজ করলেও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কোম্পানিটি প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখেনি।
প্রেসিডেন্ট রুটোর নির্দেশের পর টাটা কেমিক্যালস কেনিয়া ছাড়বে নাকি আইনি লড়াই বা আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় আসবে—তা এখন দেখার বিষয়।