পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়ার রাজধানী বানজুল থেকে মাত্র ১১ কিলোমিটার দূরে কানিফিং। বিকেলের পড়ন্ত রোদে বাড়ির উঠানে হুইলচেয়ারে বসে আছেন ৪২ বছর বয়সী ইউসুফা এমবাই। তাঁর বৃদ্ধা মা অতি সন্তর্পণে ছেলের পায়ের ওপর চাদরটি টেনে দিচ্ছেন। এমবাইয়ের এই পঙ্গুত্ব কোনো জন্মগত ত্রুটি নয়; এটি গাম্বিয়ার ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ের স্মারক। ২০০০ সালের এপ্রিলে পুলিশি বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে আধা-সামরিক বাহিনীর গুলিতে মেরুদণ্ড হারান তখনকার ১৭ বছরের কিশোর এমবাই। ২৬ বছর পর আজও তাঁর মা চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, ‘আমি আজও ওর দেখাশোনা করছি, কিন্তু আমার ভয় হয়—আমি মারা যাওয়ার আগে কি আমার ছেলে বিচার দেখে যেতে পারবে?’
১৯৯৪ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন ইয়াহইয়া জাম্মেহ। টানা ২২ বছরের শাসনামলে তাঁর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন, যৌন সহিংসতা এবং গুমের মতো অসংখ্য অভিযোগ ওঠে। ২০১৭ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে তিনি নিরক্ষীয় গিনিতে নির্বাসনে যাওয়ার পর দেশটিতে ‘ট্রুথ, রিকনসিলিয়েশন অ্যান্ড রিপারেশনস কমিশন’ (টিআরআরসি) গঠিত হয়। এই কমিশন ১ হাজার ৯ জন ভুক্তভোগীকে চিহ্নিত করে এবং হাজার হাজার মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নথিবদ্ধ করে।
গাম্বিয়া সরকার সম্প্রতি ভুক্তভোগীদের জন্য ৪০ মিলিয়ন ডালাসি (প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার ডলার) বরাদ্দ করে একটি ক্ষতিপূরণ কর্মসূচি শুরু করেছে। তবে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের কাছে টাকাটাই সব নয়।
২০২০ সালে ইউসুফা এমবাইকে ১৯ হাজার ডালাসি (২৫৯ ডলার) ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর সাফ কথা, ‘আমার টাকার চেয়েও উন্নত চিকিৎসা বেশি প্রয়োজন ছিল। এই সামান্য টাকা আমার জীবনের কী বদল আনবে?’ মেরুদণ্ড ও হাড়ের জটিল অস্ত্রোপচারের জন্য তাঁকে তুরস্কে পাঠানো হলেও করোনার কারণে সেই চিকিৎসা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমান সরকার চিকিৎসার খরচ বহনের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।
১৯৯৪ সালে অভ্যুত্থান চেষ্টার অভিযোগে বিনা বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল ক্যাডেট আমাদু সিল্লাহকে। তাঁর ভাই মামুদু সিল্লাহ জানান, আমাদু ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারটি সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে পড়ে এবং গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়। সিল্লাহ পরিবার ৬ লাখ ডালাসি ক্ষতিপূরণ পেলেও তাঁদের ক্ষোভ মেটেনি। তাঁদের দাবি, ‘টাকা তো পাবই, কিন্তু আমার ভাইকে যারা খুন করল, তাদের সাজা হবে কবে?’
গাম্বিয়া সেন্টার ফর ভিকটিমস অব হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনের তথ্য অনুযায়ী, এক ডজনেরও বেশি ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পাওয়ার আগেই মারা গেছেন।
২০১৬ সালে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নিয়ে নির্যাতিত হওয়া নগোই এনজি ২০২৩ সালে মারা যান। তাঁর মেয়ে ইসাতু সিসে বলেন, ‘বিচার পেতে বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
রাজনৈতিক কর্মী ফেমি পিটার্স ২০১৮ সালে মারা যান, অথচ তিনি বছরের পর বছর বিচারের জন্য লড়াই করেছিলেন। স্বজনদের মতে, অপরাধীদের বিদেশের মাটিতে বিলাসবহুল জীবনযাপন ভুক্তভোগীদের জন্য সবচেয়ে বড় অপমান।
জাম্মেহ নিজে নির্বাসনে থাকলেও তাঁর বাহিনীর অনেক সদস্য বিদেশের মাটিতে বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন। এর মধ্যে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উসমান সোনকোকে সুইজারল্যান্ডে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জাম্মেহর ঘাতক বাহিনী ‘জাঙ্গলার্স’-এর সদস্য বাই লো-কে জার্মানি ও আমেরিকায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিম আফ্রিকান দেশগুলোর জোট (ইকোয়াস)-এর সহায়তায় একটি ‘হাইব্রিড ট্রাইব্যুনাল’ গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, যাতে ভবিষ্যতে জাম্মেহকেও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়।
১৯৯৪ সালে নিহত সৈনিকদের দেহাবশেষ আজও প্রমাণের অপেক্ষায় বানজুল মর্গে পড়ে আছে। মামুদু সিল্লাহর আক্ষেপ, ‘আমরা অন্তত ভাইকে সম্মানের সঙ্গে কবর দিতে চাই।’ কমিশনের তথ্যমতে, চিহ্নিত ভুক্তভোগীদের মধ্যে মাত্র ২৪৮ জন পূর্ণ ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন, বাকি ৭০৭ জন আংশিক অর্থ পেয়েছেন।
মানবাধিকার আইনজীবী ইমরান দারবো সতর্ক করে বলেন, ‘ক্ষতিপূরণ দেওয়াটা ভালো উদ্যোগ, কিন্তু একে যেন ব্যবসায়িক লেনদেন হিসেবে না দেখা হয়। স্বচ্ছতা ও সম্মান ছাড়া ক্ষতিপূরণ কখনো আরোগ্য দিতে পারে না।’
দিনের শেষে যখন অন্ধকার নামে, ইউসুফা এমবাই মৃদু স্বরে প্রশ্ন তোলেন, ‘সবাই বলে বিচার হবে, কিন্তু সত্যি কি তা কখনো হবে?’
গাম্বিয়ার এই উত্তরণকালীন ন্যায়বিচার কি সময়ের সঙ্গে লড়াই করে সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারবে, নাকি সময়ের আবর্তে চাপা পড়ে যাবে হাজারো আর্তনাদ?
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা