হোম > স্বাস্থ্য > স্বাস্থ্য-গবেষণা

কী খাচ্ছেন কেবল তা-ই নয়, কখন খাচ্ছেন—সেটিও নির্ধারণ করে দিতে পারে আপনার আয়ুষ্কাল

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

রঙিন ফ্রুট চাট। ছবি: আলভী রহমান শোভন

সকালের নাশতা-সংক্রান্ত বেশির ভাগ পরামর্শে সাধারণত প্লেটে কী খাবার থাকবে, সেটাই বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর করা একটি বড় গবেষণা বলছে, খাবার খাওয়ার সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। দিনের প্রথম ও শেষ ক্যালরি কখন গ্রহণ করা হচ্ছে, তার সঙ্গে একজন মানুষ কত দিন বাঁচবেন, তার একটি সম্পর্ক থাকতে পারে।

তবে গবেষণাটি শুধু একটি সম্পর্ক বা যোগসূত্র দেখিয়েছে। অর্থাৎ, খাবারের সময় পরিবর্তন করলেই আয়ু বদলে যাবে, এমন প্রমাণ এই গবেষণা দেয়নি। তারপরও গবেষণাটি এমন কিছু প্রমাণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, যা ইঙ্গিত করে যে সুস্থ থাকার ক্ষেত্রে শুধু কী খাচ্ছি তা নয়, কখন খাচ্ছি সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এর আগে করা গবেষণাগুলোতে দেখা গেছে, সকালের নাশতা বাদ দেওয়া এবং গভীর রাতে খাবার খাওয়ার সঙ্গে তুলনামূলক খারাপ স্বাস্থ্যের সম্পর্ক রয়েছে। তবে দিনের নির্দিষ্ট কোন সময়ে খাবার খেলে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা স্পষ্ট ছিল না।

এই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে গবেষকেরা ১৯৯৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড নিউট্রিশন এক্সামিনেশন সার্ভেতে (এনএইচএএনইএস) অংশ নেওয়া ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী ৩১ হাজার ৪৪ জন প্রাপ্তবয়স্কের তথ্য বিশ্লেষণ করেন। অংশগ্রহণকারীরা আগের ২৪ ঘণ্টায় কী কী খেয়েছেন বা পান করেছেন এবং প্রতিটি খাবার বা পানীয় কখন গ্রহণ করেছেন, তা জানিয়েছিলেন।

গবেষণাটি ইউরোপিয়ান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনে প্রকাশিত হয়েছে। এতে নির্ধারণ করা হয়, ভোর ৪টার পর খাওয়া যেকোনো ক্যালরিযুক্ত খাবার বা পানীয়কে দিনের ‘প্রথম খাবার’ হিসেবে ধরা হবে। অর্থাৎ, এটি যে প্রচলিত অর্থে বসে খাওয়া সকালের নাশতাই হতে হবে, এমন নয়। দিনে যে খাবার থেকে সর্বশেষ ক্যালরি গ্রহণ করা হয়েছে, সেটিকে ধরা হয়েছে শেষ খাবার হিসেবে। প্রথম ও শেষ খাবারের মাঝের সময়কে বলা হয়েছে খাওয়ার সময়সীমা।

এরপর গবেষকেরা এই তথ্যের সঙ্গে ২০১৯ সালের শেষ পর্যন্ত নথিভুক্ত মৃত্যুর তথ্য মিলিয়ে দেখেন।

গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ওপর গড়ে ৮ দশমিক ৬ বছর নজর রাখা হয়। এই সময়ে ৭ হাজার ১২৯ জন মারা যান। তাদের মধ্যে ২ হাজার ২৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল হৃদ্‌রোগের কারণে। গবেষকেরা বয়স, ধূমপান, শারীরিক পরিশ্রম, খাদ্যের মান, বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই), মোট ক্যালরি গ্রহণ, আয় এবং আগে থেকে থাকা বিভিন্ন রোগসহ একাধিক বিষয় হিসাবের মধ্যে নিয়েছেন।

প্রথম খাবার যত দেরিতে, মৃত্যুঝুঁকিও তত বেশি

গবেষণায় একটি নির্দিষ্ট প্রবণতা দেখা গেছে। দিনের প্রথম খাবার যত দেরিতে খাওয়া হয়েছে, মৃত্যুর ঝুঁকিও তত বেশি ছিল। যারা সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে প্রথম খাবার খেতেন, তাদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে অন্য সময়ের খাবার গ্রহণকারীদের। সকাল ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে প্রথম খাবার খাওয়ার সঙ্গে যেকোনো কারণে মৃত্যুর ১০ শতাংশ বেশি ঝুঁকি পাওয়া গেছে। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে প্রথম খাবার খেলে এই ঝুঁকি বেড়ে হয়েছে ১৯ শতাংশ। আর দুপুর ১২টার পর প্রথম খাবার খেলে যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি ২৯ শতাংশ বেশি ছিল।

হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে।

যাঁরা দুপুর ১২টার পর প্রথমবার খাবার খেতেন, তাঁদের হৃদ্‌রোগে মৃত্যুর ঝুঁকি সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে প্রথম খাবার খাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় ৪৬ শতাংশ বেশি ছিল। এ ছাড়া ৫০ বছর বয়সে হিসাব করলে দেখা গেছে, যারা দেরিতে প্রথম খাবার খেতেন, তাদের গড় আয়ু আনুমানিক ২ দশমিক ৪৬ বছর কম হতে পারে।

শেষ খাবারের সময়ের ফল ছিল আরও চমকপ্রদ

দিনের শেষ খাবারের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও আকর্ষণীয়। এখানে রাত যত বাড়বে, ঝুঁকিও তত বাড়বে, এমন সরল সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। বরং সম্পর্কটি ছিল ইউ (U) আকৃতির। যেমন—যারা সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে দিনের শেষ খাবার খেতেন, তাদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে অন্য সময়ের খাবার গ্রহণকারীদের। সন্ধ্যা ৭টার আগেই শেষ খাবার খেলে যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি ছিল ১৩ শতাংশ বেশি। আর মধ্যরাতের পর শেষ খাবার খেলে সেই ঝুঁকি ছিল ২৭ শতাংশ বেশি। গবেষণার মডেল অনুযায়ী, সবচেয়ে কম ঝুঁকি দেখা গেছে আনুমানিক রাত ৮টার দিকে শেষ খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সন্ধ্যা ৭টা থেকে ৮টার সময় সবার জন্য আদর্শ রাতের খাবারের সময়। গবেষণাপত্রের প্রধান লেখক, চীনের হুয়াঝং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির শান বিজ্ঞানবিষয়ক সংবাদমাধ্যম সায়েন্স অ্যালার্টকে এ কথা জানিয়েছেন।

শানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, খুব রাতে খাবার খেলে শরীরের সার্কাডিয়ান রিদম বা অভ্যন্তরীণ জৈবঘড়ি এবং বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে। তবে খুব তাড়াতাড়ি দিনের শেষ খাবার খাওয়ার পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে। যেমন কারও দৈনন্দিন সময়সূচি, অসুস্থতা বা কম ক্যালরি গ্রহণ।

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা দিনের শেষ খাবার খুব তাড়াতাড়ি খেতেন, তারা সাধারণত বয়স্ক, তুলনামূলকভাবে কমবার খাবার খেতেন এবং তাদের মধ্যে আগে থেকেই থাকা বিভিন্ন রোগের হারও বেশি ছিল। তাই খাবারের সময়টি তাদের অসুস্থতার কারণ না হয়ে বরং তাদের শারীরিক অবস্থার একটি সংকেতও হতে পারে।

শুধু কত ঘণ্টা না খেয়ে থাকছেন, সেটাই সব নয়

খাবার গ্রহণের সময়সীমা বা ইটিং উইন্ডোও (eating window) এই গবেষণায় বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রথম খাবার কখন খাওয়া হয়েছে, সেটি বিবেচনায় নেওয়ার পর দেখা যায়, পুরো গবেষণাগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে ইটিং উইন্ডোর দৈর্ঘ্যের সঙ্গে মৃত্যুর ঝুঁকির কোনো ধারাবাহিক সম্পর্ক ছিল না। বরং এই সম্পর্কটি নির্ভর করছিল কখন খাওয়া শুরু হচ্ছে তার ওপর।

অর্থাৎ, খুব অল্প সময়ের মধ্যে দিনের সব খাবার খেয়ে ফেলা বা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার বিষয়ে যে উদ্বেগ রয়েছে, এই ফলাফল সেখানে নতুন একটি মাত্রা যোগ করে। শুধু কত ঘণ্টা উপবাসে থাকছেন, সেটি গুনলেই পুরো বিষয়টি বোঝা সম্ভব নাও হতে পারে।

শান বলেন, খাবারের সময় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের সার্কাডিয়ান রিদম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে কাজ করে। তাঁর মতে, দিনের প্রথম খাবার দেরিতে খাওয়া অথবা গভীর রাতে খাবার গ্রহণের ফলে শরীরের জৈবঘড়ির সঙ্গে স্বাভাবিক ছন্দের অসামঞ্জস্য তৈরি হতে পারে। এর ফলে বিপাকীয় সমস্যাও দেখা দিতে পারে, যার মধ্যে চর্বি ও গ্লুকোজ বিপাকে ব্যাঘাত অন্তর্ভুক্ত।

এর পেছনে কী কারণ থাকতে পারে?

মানুষের বাইরে অন্যান্য প্রাণীর ওপর করা গবেষণাগুলো সম্ভাব্য কয়েকটি কারণের দিকে ইঙ্গিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—ওজন বেড়ে যাওয়া, যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমা, মস্তিষ্কের বাইরের বিভিন্ন অঙ্গে থাকা জৈবঘড়ির স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত এবং শরীরের চর্বি শোষণের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন। তবে মানুষের ক্ষেত্রে এসব প্রক্রিয়াই যে মৃত্যুর ঝুঁকির সঙ্গে পাওয়া সম্পর্কের ব্যাখ্যা দেয়, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

উল্টো কারণও হতে পারে

গবেষকেরা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার কথা বলেছেন। বিষয়টি হতে পারে রিভার্স কজেশন (reverse causation), অর্থাৎ আমরা যেটিকে কারণ ভাবছি, বাস্তবে সেটি হয়তো ফল বা অন্য কোনো সমস্যার চিহ্ন।

উদাহরণ হিসেবে, দেরিতে খাবার খাওয়া হতে পারে—খারাপ স্বাস্থ্যের ফল, ঘুমের সমস্যার ফল, শিফটভিত্তিক কাজের কারণে অথবা আর্থসামাজিক পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত। বয়স্ক মানুষদের ওপর করা আগের একটি গবেষণাতেও দেখা গেছে, স্বাস্থ্যগত সমস্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের সকালের নাশতার সময় আরও পিছিয়ে যায়।

শানের ভাষায়, তাই দেরিতে খাবার খাওয়াকে আপাতত সম্ভাব্য ঝুঁকির সংকেত এবং একই সঙ্গে সম্ভবত পরিবর্তন করা যায় এমন একটি আচরণ হিসেবে দেখা উচিত। এটিকে সরাসরি মৃত্যুর কারণ হিসেবে চূড়ান্তভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না।

গবেষণার সীমাবদ্ধতা

গবেষণাটির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা। অর্থাৎ, গবেষকেরা মানুষের আচরণ ও স্বাস্থ্যগত ফলাফলের মধ্যে সম্পর্ক দেখেছেন, কিন্তু কোনো একটি আচরণ সরাসরি মৃত্যুর কারণ প্রমাণ করতে পারেননি। এ ছাড়া খাবারের সময়ের তথ্য মূলত গবেষণার শুরুতে নেওয়া একবারের ২৪ ঘণ্টার খাদ্যতালিকা থেকে পাওয়া। ফলে সেটি একজন মানুষের বহু বছরের নিয়মিত খাবার খাওয়ার অভ্যাসকে পুরোপুরি তুলে ধরেছে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

আরও কিছু বিষয় ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন—একজন ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে সকালপন্থী নাকি রাতজাগা ধরনের মানুষ, অর্থাৎ তাঁর ক্রনোটাইপ, ঘুমের বিস্তারিত সময়সূচি, দিনের কোন সময়ে শারীরিক কর্মকাণ্ড করেন এবং গবেষণায় পরিমাপ করা হয়নি এমন অন্যান্য বিষয়।

গবেষকেরা এসব সম্ভাব্য প্রভাব কমানোর জন্য অনেক বিষয় হিসাবের মধ্যে নিয়েছেন এবং বিভিন্ন সেনসিটিভিটি অ্যানালাইসিস (sensitivity analysis) করেছেন। তারপরও সব অজানা প্রভাব পুরোপুরি বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। শেষ পর্যন্ত শান সতর্ক করে বলেছেন, শুধু এই গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে মানুষের খাবারের সময়সূচিতে বড় বা চরম পরিবর্তন আনা উচিত নয়।