হোম > স্বাস্থ্য > স্বাস্থ্য-গবেষণা

পেটের চর্বি নিয়ে গর্বিত! যৌনক্ষমতা কমাচ্ছেন না তো?

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

পেটে বাড়তি চর্বি হতে পারে পুরুষের যৌনক্ষমতা কমার অন্যতম কারণ। ছবি: সংগৃহীত

আমাদের সমাজে ভুড়ি বেড়ে যাওয়া বা পেটে চর্বি জমাকে প্রায়ই তথাকথিত আভিজাত্যের প্রতীক বলে আলোচনা করা হয় মজার ছলে। কিন্তু এটাই হতে পারে পুরুষের অন্যতম বিপদের কারণ। বয়স বাড়ার সঙ্গে পুরুষদের টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ার যে ধারণা প্রচলিত, তা পুরোপুরি সঠিক নয় বলে জানিয়েছে নতুন এক গবেষণা। জার্নাল অব দ্য এন্ডোক্রাইন সোসাইটিতে প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বয়সের চেয়ে শরীরে চর্বি জমার স্থানই টেসটোস্টেরন হ্রাসের ক্ষেত্রে বেশি প্রভাব ফেলে।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরুষের টেস্টোস্টেরন মাত্রা যতটা কমে বলে ধারণা করা হয়, বাস্তবে এর প্রভাব হয়তো ততটা বেশি নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৩৫ বছর বয়স থেকে পুরুষদের রক্তে থাকা এই যৌন হরমোনের মাত্রা সাধারণত কমতে শুরু করে। তবে এই পতন খুবই ধীরে ধীরে ঘটে।

এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হয়তো এত দিন উপেক্ষিত ছিল। সেটি হলো, শরীরে চর্বি কোথায় জমা হচ্ছে। জার্নাল অব দ্য এন্ডোক্রাইন সোসাইটিতে প্রকাশিত নতুন এক বিশ্লেষণ বলছে, ভিসেরাল ফ্যাট বা পেটের ভেতরে গভীরে জমে থাকা চর্বি টেস্টোস্টেরন কমার আরও নির্ভুল বিপাকীয় (মেটাবলিক) নির্দেশক হতে পারে।

এই ধরনের চর্বি লিভার, পাকস্থলী ও অন্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের চারপাশে জমে থাকতে পারে। ভিসেরাল ফ্যাটে টেস্টোস্টেরনের অনেক রিসেপ্টরও থাকে। ফলে রক্তে থাকা এই হরমোনের প্রতি এই চর্বি বিশেষভাবে সংবেদনশীল।

যুক্তরাষ্ট্রের ২০ থেকে ৫৯ বছর বয়সী প্রায় ৫ হাজার পুরুষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য পর্যালোচনা করে গবেষকেরা দেখেছেন, ভিসেরাল ফ্যাটের উপস্থিতির সঙ্গে টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। এ বয়সসীমার মধ্যে টেস্টোস্টেরনের মাত্রার ওপর বয়স বাড়ার চেয়ে ভিসেরাল ফ্যাটের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি বলে মনে হয়েছে।

চর্বি শরীরের কোথায় জমেছে, সেই বিষয়টি হিসাব করার পর দেখা গেছে, গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত বয়সসীমার মধ্যে বয়সের সঙ্গে টেস্টোস্টেরনের সম্পর্ক ছিল তুলনামূলকভাবে সামান্য। যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব এনভায়রনমেন্টাল মেডিসিনের গবেষণা ফিজিওলজিস্ট কার্ল ফ্রিডল ও অ্যাডাম পটার এই পর্যালোচনার দুই লেখক। তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পুরুষদের টেস্টোস্টেরন কম থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত চর্বির প্রধান সূচক হিসেবে পেটের গভীরে জমে থাকা চর্বিকেই বিবেচনা করা উচিত।

আগের গবেষণাগুলোতেও একই ধরনের ফল পাওয়া গেছে। বিশেষ করে মধ্যবয়সী পুরুষদের ক্ষেত্রে বয়সের তুলনায় চর্বি-সম্পর্কিত বিষয়গুলো টেস্টোস্টেরনের মাত্রায় বেশি প্রভাব ফেলে বলে দেখা গেছে। উদাহরণ হিসেবে, ২০০৭ সালে ১ হাজার ৬৬৭ জন পুরুষের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা যায়, বডি মাস ইনডেক্স বা বিএমআই ৪ থেকে ৫ পয়েন্ট বাড়ার সঙ্গে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। এই মাত্রার পরিবর্তনকে প্রায় ১০ বছর বয়স বাড়ার সমপরিমাণ প্রভাবের সঙ্গে তুলনা করা যায়।

২০১৩ সালের একটি গবেষণার ফলও মোটামুটি একই ধারণাকে সমর্থন করে। ওই গবেষণায় ১ হাজার ৩৮২ জন পুরুষকে পাঁচ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণাটির লেখকেরা তখন সিদ্ধান্তে আসেন, বয়সের সঙ্গে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়া ‘অনিবার্য নয়।’ বরং ধূমপানের অভ্যাস ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি, বিশেষ করে স্থূলতা ও বিষণ্নতা, এ ক্ষেত্রে বেশি ভূমিকা রাখে।

তবে স্থূলতা পরিমাপের জন্য বিএমআই ব্যবহার করারও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বর্তমানে শরীরে অতিরিক্ত ওজন আছে কি না, তা বোঝার জন্য বিএমআই এবং কোমরের পরিধি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত দুটি মাপ। কিন্তু হৃদ্রোগ ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এগুলো সবসময় সবচেয়ে ভালো নির্দেশক নাও হতে পারে।

স্থূলতার সঙ্গে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কম থাকার সম্পর্ক মোটামুটি সুস্পষ্ট হলেও, একই বিএমআই এবং একই কোমরের পরিধি থাকা দুই পুরুষের টেস্টোস্টেরনের মাত্রায় বড় ধরনের পার্থক্য থাকতে পারে। উদাহরণ হিসেবে, কোনো তরুণের বিএমআই স্বাস্থ্যকর ওজনের সীমার মধ্যে থাকলেও তার শরীরে লুকানো ভিসেরাল ফ্যাটের পরিমাণ বেশি হতে পারে। আর সেটিই তার টেস্টোস্টেরনের মাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে, বেশি বয়সী কোনো পেশিবহুল পুরুষের শরীরে ভিসেরাল ফ্যাট কম থাকতে পারে। কিন্তু শুধু বয়স ও বিএমআই-এর হিসাবের কারণে তাকে টেস্টোস্টেরন-সংক্রান্ত সমস্যার বেশি ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে ভিসেরাল ফ্যাটের মাত্রা হয়তো আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কেন টেস্টোস্টেরন উৎপাদনের সঙ্গে ভিসেরাল ফ্যাটের এত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে এর কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ নিয়ে গবেষকদের ধারণা রয়েছে। পেটের গভীরে থাকা চর্বি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা ইনসুলিন প্রতিরোধের প্রবণতা বাড়াতে পারে। এর ফলে পরবর্তী ধাপে অণ্ডকোষের কিছু কোষ কীভাবে কোলেস্টেরলকে টেস্টোস্টেরনে রূপান্তর করে, তার ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

ভিসেরাল ফ্যাট শরীরে প্রদাহজনিত বিভিন্ন প্রক্রিয়াও সক্রিয় করতে পারে। এর ফলে শরীরের হরমোন সংকেত আদান-প্রদানের প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে এবং টেস্টোস্টেরন থেকে ইস্ট্রাডিওল (estradiol) তৈরির পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। ফ্রিডল ও পটার বলেন, টেস্টোস্টেরন কম থাকার ঝুঁকির কারণ হিসেবে বর্তমান চিকিৎসা নির্দেশিকাগুলো যথাযথভাবেই স্থূলতাকে স্বীকৃতি দেয়। তবে তাঁদের গবেষণার ফল বলছে, শরীরে চর্বি কীভাবে ও কোথায় ছড়িয়ে আছে, বিশেষ করে ভিসেরাল ফ্যাটের পরিমাণ, মোট শরীরের ওজনের বাইরেও অতিরিক্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে।

এর অর্থ হলো, ভিসেরাল ফ্যাট কমানোর মাধ্যমে নেওয়া পদক্ষেপগুলো, যার মধ্যে ওজেম্পিক বা ওয়েগোভির মতো ওষুধও রয়েছে, শুধু টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপির তুলনায় টেস্টোস্টেরন কমে যাওয়ার সমস্যার মূল কারণকে আরও সরাসরি মোকাবিলা করতে পারে। গবেষণার লেখকেরা বলেন, টেস্টোস্টেরন থেরাপি শুরু করার আগে শরীরে কী ধরনের চর্বি জমেছে তা নির্ণয় করা এবং পরিবর্তনযোগ্য বিপাকীয় কারণগুলো বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।