রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা বা আরপি হলো চোখের বংশগত ও ধীরে ধীরে অগ্রসরমাণ একটি রোগ। এতে চোখের পেছনে থাকা আলোক সংবেদনশীল পর্দা বা রেটিনা ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রেটিনা আলো গ্রহণ করে এবং তা স্নায়ুর মাধ্যমে মস্তিষ্কে পাঠায়। এর ফলে আমরা দেখতে পাই। এই রোগে রেটিনার আলো গ্রহণকারী বিশেষ কোষ—রড কোষ ও কোন কোষ ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায়।
রোগের কারণ
রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসার প্রধান কারণ হলো জিনগত ত্রুটি। বাবা-মায়ের কাছ থেকে ত্রুটিপূর্ণ জিন সন্তানের মধ্যে এলে এই রোগ হতে পারে। এটি বিভিন্নভাবে বংশগত হতে পারে—
- প্রভাবশালী বংশগত ধরন: বাবা বা মায়ের যে কেউ এতে আক্রান্ত হলে সন্তানের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
- প্রচ্ছন্ন বংশগত ধরন: বাবা ও মা উভয়েই ত্রুটিপূর্ণ জিন বহন করলে সন্তানের মধ্যে এই রোগ দেখা দিতে পারে।
- এক্স-ক্রোমোজোমনির্ভর ধরন: সাধারণত পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।
এ ছাড়া কিছু ক্ষেত্রে এই রোগ অন্যান্য বংশগত সমস্যার সঙ্গেও যুক্ত থাকতে পারে।
প্রধান লক্ষণ
রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসার লক্ষণ ধীরে ধীরে দেখা যায়।
- রাতকানা: এটি রোগের সবচেয়ে সাধারণ প্রাথমিক লক্ষণ। অন্ধকারে বা কম আলোতে চলাফেরা করতে রোগীর সমস্যা হয়।
- পাশের দৃষ্টি কমে যাওয়া: রেটিনার পার্শ্বীয় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে ধীরে ধীরে পাশের দিকের বস্তু দেখতে সমস্যা হয়। পরবর্তীকালে দৃষ্টিক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে সুড়ঙ্গের মতো দৃষ্টি তৈরি হতে পারে।
- উজ্জ্বল আলোতে অস্বস্তি: তীব্র আলোতে চোখে ঝলকানি বা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে।
- দৃষ্টিশক্তি হ্রাস: রোগের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে পড়া, লেখা, মুখ চেনা বা সূক্ষ্ম কাজ করার ক্ষমতা কমে যেতে পারে।
রোগ নির্ণয়
চক্ষুবিশেষজ্ঞ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এই রোগ শনাক্ত করেন।
- চোখের অভ্যন্তরীণ পর্দা পরীক্ষা: এতে রেটিনায় বিশেষ পরিবর্তন দেখা যায়। যেমন হাড়ের আকৃতির কালো রঞ্জক জমা, রক্তনালির সংকোচন এবং দৃষ্টি স্নায়ুর বিবর্ণতা।
- দৃষ্টিক্ষেত্র পরীক্ষা: রোগীর কতটুকু দৃষ্টি কমেছে, তা নির্ণয় করা হয়।
- রেটিনার বৈদ্যুতিক কার্যক্ষমতা পরীক্ষা: রেটিনার আলো গ্রহণ ক্ষমতা যাচাই করা হয়।
- রেটিনার স্তর পর্যবেক্ষণ পরীক্ষা: রেটিনার ক্ষতির পরিমাণ বোঝা যায়।
- জিন পরীক্ষা: কোন জিনের ত্রুটির কারণে রোগ হয়েছে, তা শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ
বর্তমানে রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসার সম্পূর্ণ নিরাময়ের নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে রোগীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করা যায়। এ ক্ষেত্রে যা করতে হবে—
- নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করা।
- অতিরিক্ত উজ্জ্বল আলো থেকে চোখ রক্ষা করা।
- প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ চশমা বা দৃষ্টিসহায়ক যন্ত্র ব্যবহার করা।
- কিছু নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ অথবা পুষ্টি উপাদান ব্যবহার করা যেতে পারে।
- নির্দিষ্ট জিনগত সমস্যায় আধুনিক জিন চিকিৎসা ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্ভাব্য জটিলতা
রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসার রোগীদের মধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্রে যা হয়—
- ছানি হয়
- রেটিনার কেন্দ্রীয় অংশে পানি জমে
- গুরুতর দৃষ্টিহীনতা দেখা দিতে পারে
প্রতিরোধ ও সচেতনতা
যেহেতু এটি বংশগত রোগ, তাই পরিবারে কারও এই রোগ থাকলে অন্য সদস্যদেরও চোখের পরীক্ষা করানো উচিত। রোগ দ্রুত শনাক্ত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ হয়।
ডা. মো. আরমান হোসেন রনি, কনসালট্যান্ট (চক্ষু), দীন মোহাম্মদ আই হসপিটাল, সোবহানবাগ, ঢাকা