ওরাল কলেরা টিকাদান ক্যাম্পেইন
একটি নদীঘেরা গ্রাম। সকাল হতেই মাইকে ভেসে আসছে পরিচিত এক কণ্ঠস্বর, ‘ভাই ও বোনেরা, কলেরা প্রতিরোধে ভ্যাকসিন নিন, নিজের ও পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করুন।’ গ্রামের বয়োবৃদ্ধ রহিম মিঞা চা-দোকানে বসে এক চুমুক দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। নিজের চোখে দেখেছেন কলেরা নামক বিভীষিকার তাণ্ডব।
মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অদৃশ্য শত্রুর নাম কলেরা। এটি মূলত ভিব্রিও কলেরি নামক একধরনের বাঁকানো রডের মতো দেখতে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে হয়। এই ক্ষুদ্র জীবাণুর ইতিহাস কিন্তু বেশ পুরোনো ও ভয়াবহ। শত শত বছর ধরে এটি পৃথিবীর বুকে তাণ্ডব চালিয়েছে। উনিশ শতকে এই নদীমাতৃক বাংলা এবং ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে কলেরার বৈশ্বিক মহামারির উৎপত্তি বলে মনে করা হয়, যা পরে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসে মোট সাতটি বড় ধরনের বিশ্বব্যাপী কলেরা প্রাদুর্ভাব বা আউটব্রেকের রেকর্ড রয়েছে। ১৮১৭ সালে প্রথম কলেরা মহামারি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে শুরু করে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এই রোগে। বাংলাদেশে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে এবং সম্প্রতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা কিংবা শরণার্থীশিবিরে কলেরা মারাত্মক আউটব্রেক হিসেবে দেখা দিয়েছে।
যেকোনো বয়সের মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হতে পারে, তবে কিছু গোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে:
কলেরা হঠাৎ করে আক্রমণ করে। প্রধান লক্ষণগুলো হলো—
কলেরা অত্যন্ত মারাত্মক হতে পারে, যদি সময়মতো চিকিৎসা না করা হয়। শরীর থেকে তরল ও খনিজ উপাদান পানি ও বমির সঙ্গে এত দ্রুত বের হয়ে যায় যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রোগী তীব্র পানিশূন্যতায় ভুগে শকে চলে যেতে পারে। সঠিক চিকিৎসা না পেলে কলেরায় আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুঝুঁকি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তবে আশার কথা, সঠিক চিকিৎসায় এই ঝুঁকি কমে ১ শতাংশের নিচে চলে আসে।
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষদের এই ভ্যাকসিন নেওয়া উচিত। এক বছর বা তার বেশি বয়সের সকল শিশু, নারী ও পুরুষ এটি খেতে পারবেন। গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েরাও এই ভ্যাকসিন নিরাপদে গ্রহণ করতে পারেন।
এক বছরের কম বয়সী শিশু এবং যাদের ভ্যাকসিনের উপাদানে তীব্র অ্যালার্জি রয়েছে, তাদের এই ভ্যাকসিন খাওয়ানো যাবে না। এ ছাড়া অত্যন্ত অসুস্থ বা তীব্র জ্বরে ভোগা ব্যক্তিদের সাময়িকভাবে সুস্থ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়।
এই ওরাল ভ্যাকসিন অত্যন্ত নিরাপদ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত। এর তেমন কোনো গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। খুব কম মানুষের ক্ষেত্রে সাময়িক হালকা পেট খারাপ, বমি ভাব বা সামান্য মাথাব্যথা হতে পারে, যা দ্রুত সময়ের মধ্যে ঠিক হয়ে যায়।
পরামর্শ দিয়েছেন: সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ ঢাকা মেডিকেল কলেজ