হোম > স্বাস্থ্য > চিকিৎসকের পরামর্শ

ওরাল কলেরা টিকাদান ক্যাম্পেইন

কতটা জরুরি এই টিকা

ডা. কাকলী হালদার

একটি নদীঘেরা গ্রাম। সকাল হতেই মাইকে ভেসে আসছে পরিচিত এক কণ্ঠস্বর, ‘ভাই ও বোনেরা, কলেরা প্রতিরোধে ভ্যাকসিন নিন, নিজের ও পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করুন।’ গ্রামের বয়োবৃদ্ধ রহিম মিঞা চা-দোকানে বসে এক চুমুক দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। নিজের চোখে দেখেছেন কলেরা নামক বিভীষিকার তাণ্ডব।

অদৃশ্য শত্রু ও ইতিহাসের পাতা

মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এক অদৃশ্য শত্রুর নাম কলেরা। এটি মূলত ভিব্রিও কলেরি নামক একধরনের বাঁকানো রডের মতো দেখতে ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে হয়। এই ক্ষুদ্র জীবাণুর ইতিহাস কিন্তু বেশ পুরোনো ও ভয়াবহ। শত শত বছর ধরে এটি পৃথিবীর বুকে তাণ্ডব চালিয়েছে। উনিশ শতকে এই নদীমাতৃক বাংলা এবং ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে কলেরার বৈশ্বিক মহামারির উৎপত্তি বলে মনে করা হয়, যা পরে পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসে মোট সাতটি বড় ধরনের বিশ্বব্যাপী কলেরা প্রাদুর্ভাব বা আউটব্রেকের রেকর্ড রয়েছে। ১৮১৭ সালে প্রথম কলেরা মহামারি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে শুরু করে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এই রোগে। বাংলাদেশে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে এবং সম্প্রতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা কিংবা শরণার্থীশিবিরে কলেরা মারাত্মক আউটব্রেক হিসেবে দেখা দিয়েছে।

কেন এবং কীভাবে হয়

  • কলেরা হলো মূলত একটি দূষিত পানি ও খাদ্যবাহিত রোগ। জীবাণুমুক্ত বা বিশুদ্ধ পানির অভাব এর মূল কারণ।
  • সংক্রমিত মানুষের মলমূত্রের মাধ্যমে যখন বিশুদ্ধ পানি ও খাবার দূষিত হয়, তখন সেই পানি বা খাবার অন্য কেউ খেলে তার শরীরে জীবাণু প্রবেশ করে।
  • অস্বাস্থ্যকর ল্যাট্রিন ব্যবহার, খাবারের আগে হাত না ধোয়া এবং মাছি পড়া বা বাসি-পচা খাবার খাওয়ার মাধ্যমে এটি দ্রুত ছড়ায়।

কারা বেশি ঝুঁকিতে

যেকোনো বয়সের মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হতে পারে, তবে কিছু গোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে:

  • যাদের নিরাপদ খাওয়ার পানির সুব্যবস্থা নেই।
  • বস্তি বা অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার ও শরণার্থীশিবিরের মানুষ।
  • শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তি, যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তুলনামূলক কম।

লক্ষণসমূহ

কলেরা হঠাৎ করে আক্রমণ করে। প্রধান লক্ষণগুলো হলো—

  • হঠাৎ পেটব্যথা ছাড়াই চাল ধোয়া পানির মতো পাতলা ও অবিরত পায়খানা।
  • ঘন ঘন বমি।
  • তীব্র তৃষ্ণা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া, দুর্বলতা এবং পেশিতে টান ধরা।
  • পানিশূন্যতার উপসর্গ
  • চোখ কোটরে ঢুকে যাওয়া।
  • ত্বক কুঁচকে যাওয়া এবং চামড়া টেনে ছাড়লে সহজে আগের অবস্থায় না ফেরা।
  • প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া।
  • অতিরিক্ত ক্লান্তি, দুর্বলতা বা খিটখিটে মেজাজ।
  • রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং বুক ধড়ফড় করা।

মৃত্যুঝুঁকি ও তাৎক্ষণিক চিকিৎসা

কলেরা অত্যন্ত মারাত্মক হতে পারে, যদি সময়মতো চিকিৎসা না করা হয়। শরীর থেকে তরল ও খনিজ উপাদান পানি ও বমির সঙ্গে এত দ্রুত বের হয়ে যায় যে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রোগী তীব্র পানিশূন্যতায় ভুগে শকে চলে যেতে পারে। সঠিক চিকিৎসা না পেলে কলেরায় আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুঝুঁকি ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তবে আশার কথা, সঠিক চিকিৎসায় এই ঝুঁকি কমে ১ শতাংশের নিচে চলে আসে।

প্রাথমিক চিকিৎসা

  • লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে। এটি শরীরের ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখে।
  • পানিশূন্যতা বেশি হলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে শিরায় স্যালাইন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হবে।
  • চলমান কলেরা ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইন ও সুরক্ষা
  • শুধু স্যালাইন দিয়ে চিকিৎসা করা যথেষ্ট নয়; কলেরার ক্ষেত্রে প্রতিরোধই আসল। সে জন্য দেশজুড়ে এখন চলছে ব্যাপক কলেরা ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইন।

ভ্যাকসিনটি কীভাবে তৈরি

  • এটি মুখে খাওয়ার ওরাল কলেরা ভ্যাকসিন। এটি নিষ্ক্রিয় বা মৃত ভিব্রিও কলেরি জীবাণু দিয়ে অত্যন্ত নিরাপদে তৈরি করা হয়। যেহেতু এতে কোনো জীবিত জীবাণু থাকে না, তাই এই ভ্যাকসিন খেলে কারও কলেরা হওয়ার সুযোগ নেই; বরং এটি পাকস্থলী ও অন্ত্রে শক্তিশালী প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করে।
  • পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষার জন্য দুটি ডোজ খেতে হয়। প্রথম ডোজ খাওয়ার অন্তত ১৪ দিন পর দ্বিতীয় ডোজ নিতে হয়।
  • দুই ডোজ ভ্যাকসিন গ্রহণ করলে এটি দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত কলেরার বিরুদ্ধে চমৎকার সুরক্ষা দেয়।

কারা নেবেন

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষদের এই ভ্যাকসিন নেওয়া উচিত। এক বছর বা তার বেশি বয়সের সকল শিশু, নারী ও পুরুষ এটি খেতে পারবেন। গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েরাও এই ভ্যাকসিন নিরাপদে গ্রহণ করতে পারেন।

কারা নিতে পারবেন না

এক বছরের কম বয়সী শিশু এবং যাদের ভ্যাকসিনের উপাদানে তীব্র অ্যালার্জি রয়েছে, তাদের এই ভ্যাকসিন খাওয়ানো যাবে না। এ ছাড়া অত্যন্ত অসুস্থ বা তীব্র জ্বরে ভোগা ব্যক্তিদের সাময়িকভাবে সুস্থ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী

এই ওরাল ভ্যাকসিন অত্যন্ত নিরাপদ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত। এর তেমন কোনো গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। খুব কম মানুষের ক্ষেত্রে সাময়িক হালকা পেট খারাপ, বমি ভাব বা সামান্য মাথাব্যথা হতে পারে, যা দ্রুত সময়ের মধ্যে ঠিক হয়ে যায়।

কলেরা প্রতিরোধে যা করবেন

  • ফোটানো বা ফিল্টার করা নিরাপদ পানি পান করুন।
  • খাওয়ার আগে এবং শৌচাগার ব্যবহারের পর সাবান-পানি দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে নিন।
  • বাসি বা খোলা খাবার পরিহার করুন।

পরামর্শ দিয়েছেন: সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ ঢাকা মেডিকেল কলেজ