এক দশক পর দেশে আবার শনাক্ত হয়েছে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লু ভাইরাসের এইচ৫এন১ ধরনের মানব সংক্রমণ। চলতি বছরে এই ভাইরাসে আক্রান্ত এক শিশুর মৃত্যুও হয়েছে। পাখিসহ কয়েকটি প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত হতে সক্ষম এই উচ্চঝুঁকির ভাইরাসটি। এর মৃত্যুহারও উদ্বেগজনক। দীর্ঘ বিরতির পর দেশে আবারও বার্ড ফ্লুর মানব সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁরা এ বিষয়ে সতর্ক থাকার তাগিদ দিয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা (এইচ৫এন১) ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের একটি ধরন, যা মূলত পাখি ও কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণীকে আক্রান্ত করে। বিরল ক্ষেত্রে মানুষও এতে সংক্রমিত হয়। ভাইরাসটি প্রথম ১৯৯৬ সালে শনাক্ত হয়। ২০২০ সালের পর এইচ৫এন১ ভাইরাসের একটি নতুন ধরন (এইচ৫ ক্লেড ২.৩.৪.৪বি) আফ্রিকা, এশিয়া ও ইউরোপের বন ও খামার উভয় ধরনের পাখির মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ২০২১ সালে উত্তর আমেরিকা, ২০২২ সালে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং ২০২৬ সালে অস্ট্রেলিয়াতেও এর উপস্থিতি শনাক্ত হয়।
এইচ৫এন১ ভাইরাস ১৯৯৭ সালে হংকংয়ে প্রথম মানব সংক্রমণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী আলোচনায় আসে। এরপর ২০০১ সাল থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পোলট্রিতে ব্যাপক সংক্রমণ ঘটিয়েছে এ ভাইরাস। ২০০৮ সালের ২৮ মে পর্যন্ত ডব্লিউএইচওতে রিপোর্ট হওয়া ৩৮৩টি মানব এইচ৫এন১ সংক্রমণের মধ্যে ২৪১ জনের মৃত্যু হয়েছিল। শতকরা হারে তা প্রায় ৬৩ শতাংশ। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা ছিল, ভাইরাসটি যদি মানুষ থেকে মানুষে সহজে ছড়ানোর সক্ষমতা অর্জন করে, তাহলে এটি বড় ধরনের মহামারির কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশে মানব সংক্রমণ বিষয়ে ডব্লিউএইচওর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শুরুতে চট্টগ্রাম বিভাগের এক শিশুর শরীরে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা এ (এইচ৫) শনাক্ত হয়। ২১ জানুয়ারি উপসর্গ দেখা দেওয়ার পর ২৮ জানুয়ারি তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ইনফ্লুয়েঞ্জা নজরদারি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ২৯ জানুয়ারি রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) তার শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা অবস্থায় ১ ফেব্রুয়ারি শিশুটির মৃত্যু হয়। নমুনা পরীক্ষায় ইনফ্লুয়েঞ্জা এ (এইচ৫) শনাক্ত হয়। জিনগত বিশ্লেষণের পর আইসিডিডিআরবি নিশ্চিত করে, এটি উচ্চ রোগসৃষ্টিকারী বার্ড ফ্লু ভাইরাসেরই (এইচ৫এন১) ক্লেড ২.৩.২.১এ গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। এটি ২০১১ সাল থেকে দেশের পোলট্রিতে পাওয়া ভাইরাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রথম নিশ্চিতভাবে মানবদেহে এইচ৫এন১ শনাক্ত হয় ২০০৮ সালে। ঢাকার কমলাপুরের ১৫ মাস বয়সী এক শিশুর শরীরে ভাইরাসটি পাওয়া যায়। জ্বর ও শ্বাসকষ্ট হলেও শিশুটি সুস্থ হয়ে ওঠে। রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাসায় জবাই করা মুরগির সংস্পর্শ থেকেই সে সংক্রমিত হয়েছিল। মুরগি কাটার পর হাত পরিষ্কার না করার বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছিল। এর আগে ২০০৭ সালের মার্চে সরকার দেশের পোলট্রিতে এইচ৫এন১ ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করে। তখন ৬৪ জেলার মধ্যে ৪৭টি জেলার পোলট্রিশিল্পেই এর সংক্রমণ শনাক্ত হয়।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এরপর ২০১১ সালে দুজন, ২০১২ সালে তিনজন, ২০১৩ সালে একজন এবং ২০১৫ সালে একজনের শরীরে এইচ৫এন১ শনাক্ত হয়। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৫ সালে চারজন এবং ২০২৬ সালে একজন আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৩ সাল এবং চলতি বছরের শনাক্ত দুজনেরই মৃত্যু হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমিত রোগ (জুনোটিক রোগ) নিয়ে গবেষণা করা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আজকের পত্রিকাকে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত দুজনের মৃত্যু হয়েছে।
কর্মকর্তাটি বলেন, এখন পর্যন্ত বিরল হলেও এইচ৫এন১ প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে। বাংলাদেশে এ পর্যন্ত পাখি থেকে মানব সংক্রমণ কম। বাণিজ্যিক খাতে টিকা বাধ্যতামূলক হলেও সব পোলট্রি খামারে শতভাগ টিকাপ্রয়োগ নিশ্চিত করা কঠিন। তিনি শক্তিশালী নজরদারি এবং স্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ ও পরিবেশ খাতের সমন্বয়ের ওপর জোর দেন।
এইচ৫এন১ ভাইরাস বর্তমানে বন্য ও গৃহপালিত পাখি এবং কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে শনাক্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পাখিসহ প্রাণীরা এতে আক্রান্ত হচ্ছে। ভাইরাস ও রোগতত্ত্ববিদেরা বলছেন, এখন পর্যন্ত মানুষ থেকে মানুষে সহজে বার্ড ফ্লু সংক্রমণের প্রমাণ নেই। তবে ভাইরাসের পরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্যের কারণে সম্ভাব্য বিপদের জন্য নজরদারি প্রয়োজন। বার্ড ফ্লু পোলট্রিতে দ্রুত হাঁস-মুরগির ব্যাপক মৃত্যু ঘটাতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাইরের মুরগির মধ্যে বিস্তার ছড়াতে আক্রান্ত খামারের সব পাখি মেরে ফেলার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন আইইডিসিআর দেশে সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব পর্যবেক্ষণ, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা ও ল্যাবরেটরিভিত্তিক নজরদারি পরিচালনা করে।
আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভাইরোলজি) অধ্যাপক ডা. আহমেদ নওশের আলম বলেন, ২০১৫ সালের পর দীর্ঘ সময় মানবদেহে এ ভাইরাস পাওয়া যায়নি। তবে গত দুই বছরে আবার কয়েকটি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এর প্রধান উৎস পোলট্রি। তবে পরিযায়ী পাখির মাধ্যমেও হাঁস বা পোলট্রিতে ছড়াতে পারে। মানুষের মধ্যে সংক্রমণ কম এবং পোলট্রি থেকে এলেও সব সময় সংক্রমিত করে না।
ডা. আহমেদ নওশের জানান, আইইডিসিআর ইনফ্লুয়েঞ্জা নজরদারির মাধ্যমে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ করছে। চলতি বছরের শুরুতে আক্রান্ত শিশুটির পরিবারের অন্য কেউসহ আর কারও মধ্যে এ পর্যন্ত সংক্রমণ পাওয়া যায়নি।
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩-২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বে বার্ড ফ্লুর প্রায় এক হাজার মানব সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভাইরাসটি শুধু পাখির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যেও এর সংক্রমণ পাওয়া গেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগনিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ বলেন, এইচ৫এন১ ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের একটি ধরন। পাখির মধ্যে সংক্রমণ ঘটালে এটি বার্ড ফ্লু নামে পরিচিত হয়। তবে মানুষের মধ্যেও সংক্রমিত হতে পারে। বাংলাদেশে প্রথম শনাক্তের সময় বিজ্ঞানীরা এটিকে সম্ভাব্য মহামারি সৃষ্টিকারী ভাইরাস হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। কারণ, এটি পাখি থেকে মানুষের মধ্যে আসতে পারে এবং এর মৃত্যুহার বেশি।
বে-নজির আহমেদ আরও বলেন, ২০০৯ সালে ‘ইনফ্লুয়েঞ্জা এ’ ভাইরাসের আরেকটি ধরন এইচ১এন১ মানুষের মধ্যে মহামারি তৈরি করলেও এইচ৫এন১ এখনো সে পর্যায়ে যায়নি। বিচ্ছিন্ন সংক্রমণ হলে আতঙ্কের কিছু নেই। তবে মানুষের মধ্যে সংক্রমণ বাড়লে উদ্বেগের বিষয় হবে। বন্য পাখি, প্রাণিসম্পদ ও মানব স্বাস্থ্যে সমন্বিত নজরদারি পদ্ধতিতে কাজ করা প্রয়োজন।
বিদেশে খামারের শূকরছানার মধ্যে এইচ১এন১-এর কয়েকটি ধরন পাওয়া গিয়েছিল বলে একে সোয়াইন ফ্লু ভাইরাসও বলে। এটি মানুষ থেকে মানুষে তুলনামূলকভাবে সহজে ছড়ায়। তবে এর চিকিৎসা মৌসুমি ফ্লুর মতোই সাধারণ থাকে। অন্যদিকে এইচ৫এন১ ভাইরাস পাখি থেকে মানুষে কিংবা এক মানুষ থেকে অন্যজনের মধ্যে ছড়ায় খুব কম।
আইইডিসিআরের সদ্য সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিন বলেন, গত বছর থেকে আবারও দেশে এইচ৫এন১ শনাক্ত হচ্ছে। মানবদেহের পাশাপাশি পোলট্রি ও পরিবেশগত বিষয়ও তদন্ত করে দেখা হয়েছে। আক্রান্ত এলাকায় হাঁস-মুরগি, পরিবেশ ও সংশ্লিষ্ট স্থান থেকে নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সেখানেও ভাইরাস পাওয়া গেছে। কোনো কেস শনাক্ত হলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সঙ্গে যৌথভাবে তদন্ত, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও করণীয় নির্ধারণ করা হয়।
ডা. তাহমিনা আরও বলেন, এইচ৫এন১ প্রতিরোধে মানুষের ক্ষেত্রে সতর্কতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অসুস্থ বা মৃত হাঁস-মুরগির নিরাপদ ব্যবস্থাপনা ও অপসারণ বিষয়ে সচেতনতা প্রয়োজন। ভুলভাবে মৃত পাখি ব্যবস্থাপনা করলে ঝুঁকি বাড়ে।
এইচ৫এন১ প্রতিরোধে পোলট্রির হাঁস-মুরগির জন্য টিকা রয়েছে। অন্যদিকে আক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা হয় রোগের (জ্বরকাশি, গা ব্যথা, নিউমোনিয়া) উপসর্গ অনুযায়ী। ডা. তাহমিনা শিরিন জানালেন, এ ভাইরাস ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত নতুন গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে, যা অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। ভাইরাস মোকাবিলায় স্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ ও সংশ্লিষ্ট সব খাতের সমন্বয় প্রয়োজন বলেই মত তাঁর।