হোম > স্বাস্থ্য

বিশ্ব হার্ট দিবস আজ: হৃদ্‌রোগের পর ওষুধ নেননি ঝুঁকিতে থাকাদের ৭৭ শতাংশ

মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ, ঢাকা

প্রতীকী ছবি

হার্ট অ্যাটাকের পর স্টেন্ট (রিং নামে বহুল পরিচিত) বসানো কিংবা বাইপাস সার্জারি করে বাড়ি ফিরলেই হৃদ্‌যন্ত্রের চিকিৎসার শেষ হয় না। এসব চিকিৎসাপদ্ধতির পরও আবার হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোকসহ গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি থাকে। এই ঝুঁকি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ ওষুধগুলোর একটি হলো স্ট্যাটিন ধরনের ওষুধ। স্ট্যাটিন রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমানোর পাশাপাশি আবার হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমায়। কিন্তু বাংলাদেশে হৃদ্‌রোগের ইতিহাস থাকা মানুষের ৭৭ শতাংশই ওষুধটি ব্যবহার করছেন না বলে এক গবেষণায় জানা গেছে। আজ ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবসের প্রাক্কালে বিষয়টির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা।

বৈশ্বিক বৈজ্ঞানিক সাময়িকী গ্লোবাল হার্ট-এ গত বছরের মার্চে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশে স্ট্যাটিন ব্যবহারের এই চিত্র উঠে এসেছে। ‘বার্ডেন অ্যান্ড প্রিডিক্টরস অব স্ট্যাটিন ইউজ ফর প্রাইমারি অ্যান্ড সেকেন্ডারি প্রিভেনশন অব কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ ইন বাংলাদেশ: এভিডেন্স ফ্রম আ ন্যাশনালি রিপ্রেজেন্টেটিভ সার্ভে’ শিরোনামের গবেষণাটি করেছেন বাংলাদেশের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা।

গবেষণায় ৪০ থেকে ৬৯ বছর বয়সী মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আগে কার্ডিওভাসকুলার রোগ ছিল এমন মানুষের মাত্র ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ স্ট্যাটিন ব্যবহার করছিলেন। অর্থাৎ অতীতে হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যায় ভোগা প্রায় ৭৭ শতাংশ ব্যক্তি এই ওষুধ ব্যবহার করছিলেন না।

গবেষণায় ২০১৮ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) স্টেপস বাংলাদেশ জরিপের ৩ হাজার ১৪০ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। তাঁদের মধ্যে ৪৪৩ জনের আগে কার্ডিওভাসকুলার রোগে ভুগেছেন। এই ৪৪৩ জনের মধ্যে মাত্র ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ স্ট্যাটিন ব্যবহার করছিলেন।

ডব্লিউএইচও-স্টেপস বাংলাদেশ হলো অসংক্রামক রোগ ও এসব রোগের ঝুঁকির কারণ নিরূপণে পরিচালিত জাতীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্য জরিপ। এতে তামাক ব্যবহার, খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিমাপ, রক্তচাপ এবং রক্তে কোলেস্টেরল ও শর্করাসহ বিভিন্ন বিষয় পরিমাপ করা হয়। বাংলাদেশে হৃদ্‌রোগ ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক রোগে মৃত্যুর হার ক্রমেই বাড়ছে। ডব্লিউএইচওর সর্বশেষ দেশভিত্তিক তথ্যে ২০২১ সালে দেশে ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজে মৃত্যুর হার ছিল প্রতি লাখে ৫৮ দশমিক ৫ জন। একই বছরে স্ট্রোকে মৃত্যুর হার ছিল প্রতি লাখে ৮০ দশমিক ২ জন।

স্ট্যাটিন কী

স্ট্যাটিনের মধ্যে পড়ে রক্তের কোলেস্টেরল কমানোর বিভিন্ন ওষুধ। রক্তে এলডিএল বা ‘খারাপ কোলেস্টেরল’ বেশি থাকলে রক্তবাহী ধমনির দেয়ালে চর্বি ও অন্যান্য পদার্থ জমে প্লাক (আবরণ) তৈরি হতে পারে। এতে রক্তনালি সরু হয়ে যায় বা জমা হওয়া প্লাক ফেটে রক্ত জমাট বেঁধে রক্ত চলাচল বন্ধ হতে পারে। ফলে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। স্ট্যাটিন ওষুধগুলো খারাপ কোলেস্টেরল কমানোর পাশাপাশি আগে হৃদ্‌রোগে ভোগা ব্যক্তিদের ভবিষ্যতে আবার এ ধরনের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমাতে ব্যবহৃত হয়। তাই ধমনিতে রিং বসানোর পরও অনেক রোগীর স্ট্যাটিন গ্রহণ করা চালিয়ে যেতে হয়। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে স্ট্যাটিন আজীবন গ্রহণের মতো দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ।

বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞদের এই গবেষণায় হৃদ্‌রোগ হওয়ার আগেও স্ট্যাটিন ব্যবহারে ঘাটতি দেখা গেছে। ডব্লিউএইচওর ২০১৯ সালের নির্দেশিকা অনুযায়ী, হৃদ্‌রোগ না থাকা অংশগ্রহণকারীদের জন্যও ১১ দশমিক ২ শতাংশ প্রাথমিক প্রতিরোধের জন্য স্ট্যাটিন ব্যবহার করা উচিত ছিল। কিন্তু তাঁদের মধ্যে মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশ স্ট্যাটিন ব্যবহার করছিলেন।

হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্ট্যাটিন ব্যবহারে স্বাস্থ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর সুপারিশ থাকলেও বাংলাদেশে তা ব্যাপকভাবে অনুসরণ করা হয় না। স্ট্যাটিনের দাম এ ক্ষেত্রে একটি বিবেচনার বিষয়। কিন্তু নিয়মিত স্ট্যাটিন না গ্রহণ করা অনেকে মাঝেমধ্যে লিপিড বা কোলেস্টেরলের মাত্রা পর্যন্ত পরীক্ষা করেন না। সাধারণত রক্তে কোলেস্টেরল বেশি পাওয়া গেলে রোগীকে স্ট্যাটিন দেওয়া হয়। কিন্তু শুধু কোলেস্টেরলের মাত্রার ওপর স্ট্যাটিন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নির্ভর করে না। ৪০ বছরের বেশি বয়সী ডায়াবেটিসে আক্রান্ত বা উচ্চ ডায়াবেটিস ঝুঁকির রোগীদের কোলেস্টেরল খুব বেশি না হলেও নির্দিষ্ট ঝুঁকি থাকলে স্ট্যাটিন থেকে উপকার পাওয়া যেতে পারে।

গবেষকদের অন্যতম এবং ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ হাসপাতালের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘স্ট্যাটিন শুধু রক্তে কোলেস্টেরল বেশি থাকা ব্যক্তিদের জন্য নয়; হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বেশি থাকা লোকদেরও দেওয়া হয়। প্রাথমিক প্রতিরোধের ক্ষেত্রে যাঁদের এখনো হৃদ্‌রোগ হয়নি, কিন্তু ঝুঁকি বেশি; যেমন ৪০ বছরের বেশি বয়সী ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের রোগী বা ধূমপায়ী, তাঁদের নির্দিষ্ট ঝুঁকি বিবেচনায় স্ট্যাটিন দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে। হৃদ্‌রোগ হওয়ার পরও স্ট্যাটিন গুরুত্বপূর্ণ। এটা সেকেন্ডারি প্রিভেনশন। অর্থাৎ কারও হৃদ্‌রোগ হয়ে গেছে, এখন যাতে আবার হার্ট অ্যাটাক বা অন্য কোনো কার্ডিওভাসকুলার (হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালির রোগ) সমস্যা না ঘটে, সে জন্য স্ট্যাটিন দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যাঁদের এই ওষুধ নেওয়া উচিত, তাঁদের ২৫ শতাংশের কম নিয়মিত স্ট্যাটিন ব্যবহার করছেন।’

গবেষণাটিতে জাতীয় পর্যায়ের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে জানিয়ে অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, ‘আমরা ২০১৮ সালের স্টেপস জরিপের তথ্য ব্যবহার করেছি। মূল জরিপটি জাতীয় প্রতিনিধিত্বশীল। কিন্তু জাতীয় ডেটাসেট থেকে শুধু যাঁদের হৃদ্‌যন্ত্রের বিভিন্ন রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাঁদের আলাদা করে বিশ্লেষণ করায় নমুনার সংখ্যা কমে যায়। তাই এই উপগোষ্ঠীর ২৩ দশমিক ৫ শতাংশকে পুরো বাংলাদেশের হৃদ্‌রোগীর স্ট্যাটিন ব্যবহারের বর্তমান হার বলা যাবে না। তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাচিত্র।’

ঝুঁকিতে ১০ জনে একজন

২০২৬ সালের এপ্রিলে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী বিএমজে পাবলিক হেলথ-এ প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী বাংলাদেশের ৪০ থেকে ৬৯ বছর বয়সী মানুষের প্রায় ১০ দশমিক ৩ শতাংশ আগামী ১০ বছরে কার্ডিওভাসকুলার রোগে আক্রান্ত হওয়ার ১০ শতাংশ বা তার বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। কার্ডিওভাসকুলার রোগ বলতে হার্ট অ্যাটাকসহ হৃদ্‌যন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা, স্ট্রোক এবং হাত-পায়ের রক্তনালির রোগকে বোঝায়। রক্ত পরীক্ষা ছাড়া বয়স, লিঙ্গ, রক্তচাপসহ অন্যান্য তথ্য ব্যবহার করে হিসাব করলে এই হার ৯ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১৮ সালের জাতীয় অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি-সংক্রান্ত জরিপের ২ হাজার ৭৮২ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষণাটি করা হয়েছে।

গবেষক সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, ‘গবেষণাটি শুধু হার্ট অ্যাটাক নয়, পুরো কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি নিয়ে। রক্ত পরীক্ষাভিত্তিক হিসাবে ১০ দশমিক ৩ শতাংশ এবং রক্ত পরীক্ষা ছাড়া হিসাবে ৯ দশমিক ২ শতাংশ মানুষের আগামী ১০ বছরের ঝুঁকি ১০ শতাংশের বেশি। পুরুষ, পেটের মেদ ও ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বেশি থাকা ব্যক্তিদের ঝুঁকি বেশি।’

জাতীয় রেজিস্ট্রি তৈরির তাগিদ

দেশে কার্ডিওভাসকুলার রোগের জাতীয় রেজিস্ট্রি না থাকায় এসব রোগ বোঝার গতিপ্রকৃতি নির্ভুলভাবে বলা যাচ্ছে না। বর্তমানে প্রাপ্ত তথ্যের বড় অংশ হাসপাতালভিত্তিক। কমিউনিটিতে কত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন বা মারা যাচ্ছেন, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। জাতীয় রেজিস্ট্রি থাকলে রোগের প্রকৃত চিত্র ও চিকিৎসার প্রয়োজন আরও নির্ভুলভাবে জানা সম্ভব হতো। দেশে হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়লেও রোগীর চাপের তুলনায় তা এখনো কম। অনেক হাসপাতালে বাইপাসের জন্য তিন-চার মাস অপেক্ষা করতে হয়। জরুরি হৃদ্‌রোগের চিকিৎসায় উপজেলা পর্যায়ে অক্সিজেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও জমাট রক্তের দলা গলানোর চিকিৎসা নিশ্চিত করে দ্রুত উচ্চতর কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।

বাংলাদেশ কার্ডিয়াক সোসাইটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ সফিউদ্দিন বলেন, ‘হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা শুধু বড় শহর বা বেসরকারি হাসপাতালকেন্দ্রিক হলে চলবে না। সরকারি ব্যবস্থায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও জরুরি হৃদ্‌রোগ চিকিৎসা সহজলভ্য করতে হবে। একই সঙ্গে দেশে একটি নির্ভরযোগ্য জাতীয় হৃদ্‌রোগ রেজিস্ট্রি গড়ে তুলতে হবে।’