হোম > স্বাস্থ্য

জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য হুমকি

ঝুঁকিপূর্ণ ও সংক্রামক মেডিকেল বর্জ্য

ডা. কাকলী হালদার

ছবি: সংগৃহীত

দেশের হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোয় প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ টন মেডিকেল বর্জ্য জমা হয়। এসব বর্জ্য সাধারণ আবর্জনার মতো নয়। এর বড় একটি অংশ মারাত্মক সংক্রামক ও বিপজ্জনক। সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে এই মেডিকেল বর্জ্য আমাদের জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য এক নীরব ঘাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মেডিকেল বর্জ্য হলো, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, ল্যাবরেটরি, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বাসাবাড়িতে চিকিৎসা চলাকালে বা পরে উৎপন্ন যেকোনো ধরনের ব্যবহৃত বা পরিত্যক্ত সামগ্রী। সাধারণত চিকিৎসা প্রদান, রোগ নির্ণয়, ইনজেকশন দেওয়া, অপারেশন, ব্যান্ডেজ করা, ল্যাব পরীক্ষা এবং ওষুধ প্রস্তুতকরণের মতো দৈনন্দিন স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম থেকে এসব বর্জ্য তৈরি হয়।

মেডিকেল বর্জ্যকে প্রধানত দুই ভাগ করা যায়—

১. সাধারণ বর্জ্য: খাবারের অবশিষ্টাংশ, কাগজের টুকরা বা স্যালাইনের অসংক্রামক খালি প্যাকেট। এটি মোট বর্জ্যের ৭৫ থেকে ৯০ শতাংশ।

২. বিপজ্জনক বর্জ্য: ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, সুই, ব্লেড, রক্ত-পুঁজযুক্ত গজ-তুলা, শরীরের তরল বা অংশ, ল্যাবের বর্জ্য, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ এবং রাসায়নিক দ্রব্যাদি।

মেডিকেল বর্জ্য কতটা সংক্রামক এবং গবেষণা কী বলে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকে নির্গত বর্জ্যের ১০ থেকে ২৫ শতাংশ সংক্রামক ও বিপজ্জনক। গবেষণায় দেখা গেছে, সংক্রামক বর্জ্যে হরেক রকম ক্ষতিকর জীবাণু; অর্থাৎ ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক ও পরজীবী থাকে। সুই বা ধারালো বর্জ্য দুর্ঘটনাবশত ত্বকে ক্ষত তৈরি করলে সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দূষিত সুই ফোটায় বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ যকৃৎ ও রক্ত-সংক্রান্ত হেপাটাইটিস বি, সি এবং এইচআইভির মতো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয়। তা ছাড়া বাতাস ও পানির মাধ্যমে বর্জ্যের প্যাথোজেন সহজে পরিবেশ ও মানবদেহে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ছবি: সংগৃহীত

যেসব রোগ ছড়াতে পারে

মেডিকেল বর্জ্যের সঠিক নিষ্কাশন না হলে মারাত্মক সব সংক্রামক ব্যাধি ছড়াতে পারে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—

১. রক্তবাহিত রোগ: হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি এবং এইচআইভি।

২. চর্মরোগ ও ঘা: ব্যাকটেরিয়াজনিত ত্বকের সংক্রমণ, ঘা বা টিটেনাস।

৩. শ্বাসকষ্ট ও পেটের রোগ: যক্ষ্মা, ডায়রিয়া, টাইফয়েড, কলেরার মতো পানিবাহিত ও বায়ুবাহিত সংক্রমণ।

৪. ক্যানসার ও অঙ্গহানি: ক্যাডমিয়াম, পারদ বা রেডিয়েশনযুক্ত বর্জ্য দীর্ঘ মেয়াদে ক্যানসার ও কিডনি বিকল করতে পারে।

যাঁরা বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে

১. পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও বর্জ্য সংগ্রাহক: যাঁরা সরাসরি এসব ময়লা নাড়াচাড়া করেন।

২. স্বাস্থ্যকর্মী: চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ান; যাঁরা প্রতিদিন সরাসরি চিকিৎসায় নিয়োজিত।

৩. মাদকাসক্ত ও পথশিশু: যারা ডাস্টবিন থেকে ব্যবহৃত সিরিঞ্জ ব্যবহার করে এবং প্লাস্টিক কুড়ায়।

৪. সাধারণ মানুষ: যারা দূষিত পানি ও অনিরাপদ পরিবেশের সংস্পর্শে আসে।

সঠিক ব্যবস্থাপনা কীভাবে সম্ভব

মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মূল চাবিকাঠি হলো উৎসস্থলে বর্জ্য পৃথক্‌করণ। বাংলাদেশের মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা অনুযায়ী রংভিত্তিক বিনের তালিকা:

১. ​হলুদ বিন: রক্ত বা পুঁজযুক্ত গজ, তুলা, ব্যান্ডেজ ও মানুষের কাটা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।

২. ​লাল বিন: নিডল, কাচের অ্যাম্পুল, ব্লেড ও ধারালো ধাতব বস্তু।

৩. ​নীল বা কালো বিন: কাগজ, ফলের খোসা ও উচ্ছিষ্ট খাবার।

৪. ​সবুজ বিন: পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত স্যালাইনের বোতল বা প্লাস্টিক; অর্থাৎ পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য।

পৃথক্‌করণের পর এসব বর্জ্য অটোক্লেভ মেশিনে জীবাণুমুক্ত করা, ইনসিনারেটরে উচ্চ তাপে পুড়িয়ে ফেলা বা বৈজ্ঞানিক ল্যান্ডফিলে সুরক্ষিতভাবে ডাম্প করা উচিত।

দেশের বর্তমান অবস্থা, আইন ও গাইডলাইন

দেশে প্রতিদিন যে দুই বা আড়াই শ টন মেডিকেল বর্জ্য তৈরি হয়, রাজধানীসহ অধিকাংশ বিভাগীয় ও জেলা শহরে সেগুলোর সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা নেই। কালার কোডেড ঝুড়ি ব্যবহারের বদলে প্রায় সময় সব বর্জ্য একসঙ্গে সাধারণ ডাস্টবিনে ফেলা হয়। একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া সিরিঞ্জ, স্যালাইনের ব্যাগ ও প্লাস্টিক ধুয়ে ফের বাজারে বিক্রি করেন, যা আশঙ্কাজনক। বাংলাদেশে ‘মেডিকেল বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ) বিধিমালা, ২০০৮’ নামে একটি সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। এ ছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর অধীনে বর্জ্য নিষ্কাশনের স্পষ্ট নির্দেশিকা রয়েছে। বিধিমালা অনুযায়ী প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে বর্জ্য পৃথক্‌করণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের বাধ্যতামূলক নিয়ম থাকলেও মনিটরিং ও প্রয়োগের অভাবে তা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

সংক্রমণ প্রতিরোধ সম্ভব এবং কর্তৃপক্ষের করণীয়

সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। এ জন্য যা করা দরকার—

১. আইনের কঠোর প্রয়োগ: প্রতিটি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে বর্জ্য পৃথক্‌করণ বাধ্যতামূলক করা এবং নিয়ম না মানলে নির্দিষ্ট আইনের আওতায় আনা।

২. কেন্দ্রীয় প্ল্যান্ট স্থাপন: প্রতিটি শহরে আধুনিক ইনসিনারেটর ও অটোক্লেভ-সমৃদ্ধ সেন্ট্রাল বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন করা।

৪. কর্মী প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষা: পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পিপিই (গ্লাভস, বুট, মাস্ক) প্রদান এবং হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিনের আওতায় আনা।

৫. অবৈধ পুনর্ব্যবহার বন্ধ: রিসাইক্লিং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অভিযান চালানো।

৬. জনসচেতনতা: সাধারণ মানুষকে বাসাবাড়ির ডায়াবেটিক সিরিঞ্জ বা ব্যবহৃত ব্যান্ডেজ নির্দিষ্ট স্থানে ফেলার ব্যাপারে সচেতন করা।

মেডিকেল বর্জ্য শুধু আবর্জনা নয়, এটি একটি জৈব ঝুঁকি। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে, যাতে নিরাময়ের কেন্দ্র হাসপাতাল নিজেই ব্যাধি ছড়ানোর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত না হয়।

ডা. কাকলী হালদার, সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ