আমাদের শরীরের বিপাক ক্রিয়া, পুষ্টি সঞ্চয়, রক্ত পরিশোধন ও ক্ষতিকর টক্সিন শরীর থেকে বের করে দেওয়ার মতো অনেক অত্যাবশ্যকীয় কাজ করে লিভার বা যকৃৎ। গুরুত্বপূর্ণ এই অঙ্গের নীরব ঘাতক হেপাটাইটিস। বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ নিজের অজান্তে এই ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে বেঁচে আছেন এবং লিভার সিরোসিস কিংবা ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগে ভুগছেন।
সহজ ভাষায় হেপাটাইটিস হলো লিভারের প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন। গ্রিক শব্দ ‘হেপার’ মানে যকৃৎ এবং ‘আইটিস’ মানে প্রদাহ। লিভার যখন কোনো জীবাণু, বিষাক্ত পদার্থ (যেমন অ্যালকোহল বা অতিরিক্ত ওষুধ ইত্যাদি) কিংবা শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার সমস্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ফুলে ওঠে, তখন তাকে হেপাটাইটিস বলে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে উদ্বেগের কারণ হলো ভাইরাসজনিত হেপাটাইটিস।
প্রধানত পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন ভাইরাসের কারণে হেপাটাইটিস হয়ে থাকে। অণুজীববিজ্ঞানের ভাষায় এগুলোকে হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি ও ই ভাইরাস হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।
হেপাটাইটিস এ (এইচএভি): এটি সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি হয় না।
হেপাটাইটিস বি (এইচবিভি): এটি অত্যন্ত সংক্রামক এবং ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদি লিভার রোগের প্রধান কারণ।
হেপাটাইটিস সি (এইচসিভি): একে সবচেয়ে বিপজ্জনক ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়। কারণ, শরীরে প্রবেশ করে বছরের পর বছর কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি লিভার ধ্বংস করতে পারে।
হেপাটাইটিস ডি (এইচডিভি): এটি একা সংক্রমণ করতে পারে না। বেঁচে থাকার জন্য এর হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের সাহায্য প্রয়োজন হয়।
হেপাটাইটিস ই (এইচইভি): এটিও একটি আরএনএ ভাইরাস, যা মূলত পানি ও খাদ্যের মাধ্যমে ছড়ায়।
ভাইরাসগুলোর সংক্রমণের পথ ভিন্ন ভিন্ন এবং এদের মৌসুমি বিস্তারেও কিছু ভিন্নতা রয়েছে।
পানি ও খাদ্যবাহিত হেপাটাইটিস (এ ও ই): এই দুটি ভাইরাস মূলত দূষিত পানি, অস্বাস্থ্যকর খাবার এবং মলমূত্রের মাধ্যমে ছড়ায়।
ঋতুভিত্তিক বিস্তার: সাধারণত আমাদের দেশে বর্ষাকাল এবং বন্যার সময়ে হেপাটাইটিস এ ও ই-এর প্রকোপ বহুগুণ বেড়ে যায়। এই সময় পানি বিভিন্নভাবে ভয়াবহ দূষিত হয়ে পড়ে। সেই পানি পান করা এবং রাস্তার খোলা খাবার খাওয়ার মাধ্যমে এই ভাইরাস দুটি মহামারি আকার ধারণ করতে পারে।
রক্ত ও দেহরস বাহিত হেপাটাইটিস (বি, সি ও ডি): এগুলো ছড়ায় সংক্রমিত ব্যক্তির রক্ত, বীর্য কিংবা অন্যান্য তরল দেহরসের মাধ্যমে। যেমন অনিরাপদ রক্ত গ্রহণ, একই সুচ অথবা সিরিঞ্জ বারবার ব্যবহার, সংক্রমিত সুচ দিয়ে ট্যাটু বা আকুপাংচার করা এবং অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্কের মাধ্যমে। আক্রান্ত মা থেকে নবজাতক শিশুর দেহে এটি বছরের যেকোনো সময় ছড়াতে পারে।
জটিলতা কী হয়
হেপাটাইটিস এ ও ই সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ঠিক হয়ে যায়। তবে গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস ই হলে লিভার ফেইলিউরের মতো মারাত্মক ঝুঁকি থাকে। বেশি জটিলতা তৈরি করে হেপাটাইটিস বি ও সি। এগুলোকে ‘নীরব ঘাতক’ বলার কারণ, সংক্রমণের পর ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত রোগী কোনো লক্ষণই টের পান না। দীর্ঘ সময় পর লক্ষণ প্রকাশ পেলে তখন আর কিছুই করার সুযোগ থাকে না। এর প্রধান জটিলতাগুলো হলো ক্রনিক হেপাটাইটিস, লিভার সিরোসিস এবং লিভার ক্যানসার।
হেপাটাইটিসের চিকিৎসা এর প্রকারভেদের ওপর নির্ভর করে—
হেপাটাইটিস এ ও ই: এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের প্রয়োজন হয় না। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার, পর্যাপ্ত পানি এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট কিছু চিকিৎসার মাধ্যমে রোগী সাধারণত সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন।
হেপাটাইটিস বি: ক্রনিক হেপাটাইটিস বি-এর ক্ষেত্রে ভাইরাসকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা কঠিন হলেও আধুনিক অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ দিয়ে ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি থামিয়ে রাখা যায়। এতে লিভার সিরোসিস কিংবা ক্যানসারের ঝুঁকি বহুলাংশে কমে।
হেপাটাইটিস সি: চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম বড় সাফল্য হলো, বর্তমানে হেপাটাইটিস সি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। নির্দিষ্ট মেয়াদের ডাইরেক্ট-অ্যাক্টিং অ্যান্টিভাইরাল ট্যাবলেট সেবনের মাধ্যমে ৯৫ শতাংশের বেশি রোগীকে পুরোপুরি ভাইরাসমুক্ত করা সম্ভব।
হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে এই প্রবাদ শতভাগ সত্য। এ জন্য যা করতে হবে—
টিকা গ্রহণ: হেপাটাইটিস বি-এর অত্যন্ত কার্যকর ও নিরাপদ ভ্যাকসিন রয়েছে। প্রত্যেকের ৩ ডোজের এই ভ্যাকসিন কোর্স শেষ করতে হবে।
নিরাপদ পানি ও খাবার খাওয়া: পানি ফুটিয়ে বা ফিল্টার করে পান করতে হবে। রাস্তার খোলা খাবার ও দূষিত পানি পান করা যাবে না।
নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন: শরীরে রক্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই স্ক্রিনিং পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে, রক্তটি হেপাটাইটিস বি ও সি মুক্ত কি না।
ডিসপোজেবল সিরিঞ্জ ব্যবহার: প্রতিবার ইনজেকশন নেওয়ার সময় নতুন সুচ ও সিরিঞ্জ নিশ্চিত করতে হবে।
ব্যক্তিগত সচেতনতা: সেলুনে নতুন ব্লেড ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া অন্যের টুথব্রাশ, রেজার বা ক্ষুর ব্যবহার করা যাবে না।
হেপাটাইটিস এ-এর ভ্যাকসিন পাওয়া যায়। তবে হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের কোনো ভ্যাকসিন নেই।