হোম > স্বাস্থ্য

বিপদ বাড়াচ্ছে ‘ওয়াচ’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের অতি ব্যবহার

মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ, ঢাকা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী তিন শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের মধ্যে ‘ওয়াচ’ শ্রেণির ওষুধ ব্যবহার করার কথা তুলনামূলক কম ক্ষেত্রে। ‘ওয়াচ’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিক শুধু নির্দিষ্ট প্রয়োজনে ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়; কারণ, এর অতিরিক্ত বা অযৌক্তিক ব্যবহার জীবাণুর মধ্যে দ্রুত প্রতিরোধ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিকের অতি ব্যবহার নিয়ে যাবতীয় আলোচনার পরও দেশের হাসপাতালগুলোতে ব্যবহৃত প্রতি ১০টি অ্যান্টিবায়োটিকের ৯টিই ‘ওয়াচ’ শ্রেণির। সারা দেশেও ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের ৭০ শতাংশের বেশি এই শ্রেণির। এই চিত্র উঠে এসেছে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) নিয়ে পরিচালিত দেশের সবচেয়ে বড় জাতীয় নজরদারি ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সার্ভিল্যান্স বাংলাদেশ-২০২৫’ প্রতিবেদনে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, সাধারণ ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসায় প্রথম পছন্দ হওয়া উচিত ‘অ্যাকসেস’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিক, এগুলো অধিকাংশ সাধারণ সংক্রমণে কার্যকর এবং প্রতিরোধ তৈরির ঝুঁকি তুলনামূলক কম। দ্বিতীয় শ্রেণি ‘ওয়াচ’ভুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক শুধু নির্দিষ্ট প্রয়োজনে ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। আর যখন কোনো ওষুধই কার্যকর থাকে না, তখন শেষ বিকল্প হিসেবে ‘রিজার্ভ’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। ডব্লিউএইচওর এই নির্দেশনার উদ্দেশ্য হলো অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার কমানো।

দেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) নিয়ে জাতীয় সমীক্ষার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের ৯১ শতাংশই ‘ওয়াচ’ শ্রেণির। আর সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসায় অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ‘অ্যাকসেস’ শ্রেণির ব্যবহার মাত্র ১০ শতাংশ। বহু ওষুধ-প্রতিরোধী জটিল সংক্রমণের জন্য সংরক্ষিত ‘রিজার্ভ’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ছিল শূন্য দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। সমীক্ষার জন্য বিশ্লেষণ করা ১৫ হাজার ৮৪৪টি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবস্থাপত্রের ৪৮ শতাংশই ছিল আইসিইউর। গুরুতর রোগী, ভেন্টিলেটর ও অন্যান্য বিশেষ চিকিৎসাযন্ত্রের ব্যবহার এবং দ্রুত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনের কারণে আইসিইউতেই শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয়। সমীক্ষাটিতে নজরদারি করেছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।

শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তারকে আরও ত্বরান্বিত করছে। ফলে অনেক সংক্রমণের চিকিৎসা জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি হয়ে পড়ছে, বাড়ছে হাসপাতালে থাকার সময়, চিকিৎসা ব্যয় ও মৃত্যুঝুঁকি। এই পরিস্থিতিতে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে সংকটাপন্ন রোগী, নবজাতক, শিশু এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা।

এএমআর-বিষয়ক জাতীয় সমীক্ষার প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ব্যবহার (এএমইউ) নজরদারির তথ্যও একই প্রবণতার ইঙ্গিত দিয়েছে। ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের সারা দেশের তথ্য বিশ্লেষণে মুখে খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিকের ৫০ থেকে ৬৭ শতাংশ এবং ইনজেকশন অ্যান্টিবায়োটিকের ৭০ থেকে ৯১ শতাংশই ডব্লিউএইচওর ‘ওয়াচ’ শ্রেণির। বিপরীতে মুখে খাওয়ার অ্যান্টিবায়োটিকের ২২ থেকে ৩৭ শতাংশ এবং ইনজেকশনের ৯ থেকে ৩০ শতাংশ হচ্ছে ‘অ্যাকসেস’ শ্রেণির। তবে ‘রিজার্ভ’ শ্রেণির ব্যবহার ছিল ১ শতাংশের কম।

২০১৬ সাল থেকে দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে ‘ওয়াচ’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিক। ২০২৩ সালে ইনজেকশন অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে এ হার প্রায় ৯১ শতাংশে পৌঁছায়।

প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, শক্তিশালী এই শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর অতিনির্ভরতা ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে ‘অ্যাকসেস’ শ্রেণির যৌক্তিক ব্যবহার বাড়িয়ে ‘ওয়াচ’ শ্রেণির অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতে বলা হয়েছে।

‘ওয়াচ’ শ্রেণির প্রাধান্যে যে উদ্বেগ

এএমআর হলো এমন একটি অবস্থা, যখন ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক বা পরজীবীর মতো জীবাণু অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করে। ফলে আগে কার্যকর থাকা ওষুধে সংক্রমণ আর সারে না বা কম সাড়া দেয়। এতে চিকিৎসা দীর্ঘায়িত ও ব্যয়বহুল হয় এবং মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে। ডব্লিউএইচও এএমআরকে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।

জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, দেশের হাসপাতালগুলোতে ‘ওয়াচ’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের উচ্চ ব্যবহার একদিকে রোগীর জটিলতার প্রতিফলন, অন্যদিকে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবস্থাপনা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রেসক্রিপশন চর্চার দুর্বলতারও ইঙ্গিত দেয়। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বর্তমানে কার্যকর শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিকগুলোর বিরুদ্ধেও জীবাণুর প্রতিরোধ দ্রুত বাড়বে এবং গুরুতর সংক্রমণের চিকিৎসা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

আইইডিসিআরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ভাইরোলজি) ও এএমআর সার্ভিল্যান্স প্রতিবেদনের প্রধান সম্পাদক অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন হাবীব আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘জরিপটি দেশের বিশেষায়িত হাসপাতালভিত্তিক, যেখানে সবচেয়ে জটিল ও সংকটাপন্ন রোগীদেরই চিকিৎসা হয়। তাই সেখানে তুলনামূলক শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক বেশি ব্যবহৃত হওয়াই স্বাভাবিক। তবে ঔষধ প্রশাসনের বিশ্লেষণেও সারা দেশে ‘ওয়াচ’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের আধিপত্য উদ্বেগের।’

কোন অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বেশি

প্রতিবেদন বলছে, হাসপাতালগুলোতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক হচ্ছে সেফট্রিয়াক্সোন (ওয়াচ)। এরপর রয়েছে মেরোপেনেম (ওয়াচ), সেফিক্সিম (ওয়াচ), অ্যামিকাসিন (অ্যাকসেস), ভ্যানকোমাইসিন (ওয়াচ) ও সিপ্রোফ্লক্সাসিন (ওয়াচ)। অর্থাৎ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের বেশির ভাগ ‘ওয়াচ’ শ্রেণির।

তবে হাসপাতালের বিভাগভেদে ওষুধ ব্যবহারের ধরনে পার্থক্য রয়েছে। সাধারণ ওয়ার্ডে তুলনামূলক কম জটিল সংক্রমণের চিকিৎসায় সেফট্রিয়াক্সোন সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। আইসিইউতে চিত্র ভিন্ন। সংকটাপন্ন রোগীদের গুরুতর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সেখানে কার্বাপেনেম শ্রেণির মেরোপেনেম সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়।

প্রতিবেদনের প্রধান সম্পাদক ডা. জাকির বলেন, ‘দেশে জীবাণুর প্রতিরোধ এত বেড়েছে যে অনেক ক্ষেত্রে ‘অ্যাকসেস’ ওষুধে রোগী সাড়া দেয় না। তখন চিকিৎসকদের বাধ্য হয়ে ‘ওয়াচ’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হয়। তবে দীর্ঘ মেয়াদে এই নির্ভরতা কমাতে সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং অ্যান্টিবায়োটিকের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।’

জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, সাধারণ সংক্রমণ থেকে আইসিইউ—সব ক্ষেত্রে ‘ওয়াচ’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর অতিনির্ভরতা জীবাণুর প্রতিরোধক্ষমতা দ্রুত বাড়াচ্ছে। এতে সেফট্রিয়াক্সোন ও মেরোপেনেমের মতো গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা কমার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন, নির্ধারিত কোর্স শেষ না করা এবং হাসপাতালের দুর্বল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এই সংকটের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তাই হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টিওয়ার্ডশিপ (এএসপি) ও সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণ (আইপিসি) জোরদারের তাগিদ দিয়েছেন তাঁরা।

কেন ‘ওয়াচ’ শ্রেণির ব্যবহার বেশি

চলতি মাসে যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিজ্ঞান সাময়িকী দ্য ল্যানসেট পাবলিক হেলথে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ‘ওয়াচ’ ও ‘রিজার্ভ’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগের জটিলতা, অযৌক্তিক ওষুধ ব্যবহার এবং দুর্বল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সম্মিলিত ফল হিসেবে হাসপাতালগুলোতে ‘ওয়াচ’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার এত বেড়েছে। জীবাণুর প্রতিরোধক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ‘অ্যাকসেস’ শ্রেণির ওষুধ আর কার্যকর হচ্ছে না। ফলে চিকিৎসকদের বাধ্য হয়ে ‘ওয়াচ’ শ্রেণির অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকল্পের উপপরিচালক ও রিসার্চ ফেলো এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফজলে রাব্বি চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সংকটাপন্ন রোগীদের আইসিইউতে নেওয়া হয় বলে সেখানে ‘ওয়াচ’ গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক, এমনকি প্রয়োজনে ‘রিজার্ভ’ গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিকও ব্যবহার করতে হয়। আইসিইউতে ‘ওয়াচ’ গ্রুপের ব্যবহার অযৌক্তিক না হলেও যতটা সম্ভব কমাতে হবে। কিন্তু সাধারণ ওয়ার্ডে যদি এই মাত্রায় ‘ওয়াচ’ গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার হয়, সেটি অবশ্যই উদ্বেগজনক। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করায় চিকিৎসকদের বাধ্য হয়ে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হচ্ছে। এটি দীর্ঘদিনের অযৌক্তিক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফল।’

পরিস্থিতির উন্নতিতে যা করার

ডা. ফজলে রাব্বি চৌধুরী বলেন, ‘হাসপাতাল হোক বা কমিউনিটি—সম্ভব হলে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার আগে কালচার পরীক্ষা (যার মাধ্যমে নমুনায় ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ও মাত্রা মাপা হয়) করা উচিত। টানা ১০-১২ বছর আদর্শ নীতি মেনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।’

জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. আবু জামিল ফয়সাল আজকের পত্রিকাকে বলেন, আইইডিসিআরের এই প্রতিবেদনের পর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের কাছ থেকেও জানতে হবে, কোন যৌক্তিকতায় এসব অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হয়েছে। এসব তথ্য জেনে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি কঠোরভাবে বন্ধ করতেই হবে।’