বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস
দেশে নিবন্ধিত অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ৩২২টি। এর মধ্যে সক্রিয় ২৫৮টি। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় ৩০টি শীর্ষ কোম্পানি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুসরণ করে সিংহভাগ মানসম্মত ওষুধ উৎপাদন করছে। এসব কোম্পানির প্রায় ১০০টি উৎপাদন কারখানা রয়েছে।
অন্যদিকে মানহীন ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।
রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওষুধের উৎপাদন, বাজারজাতকরণ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও ব্যবহারের প্রতিটি ধাপে নজরদারি জোরদার করা হচ্ছে।
আজ বৃহস্পতিবার বিশ্ব রোগী নিরাপত্তা দিবস উপলক্ষে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানান প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক মো. আলমগীর হোসেন।
এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘অসংক্রামক ব্যাধির নিরাপদ চিকিৎসা’। এ উপলক্ষে র্যালি, আলোচনা সভা ও কুইজের আয়োজন করে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ওষুধের গুণগত মান, নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে কাঁচামাল (এপিআই) থেকে প্রস্তুত ওষুধ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা করা হচ্ছে। রাসায়নিক অপদ্রব্য ও বিষাক্ততার বিষয়ও পরীক্ষার আওতায় রয়েছে। স্থানীয় বাজারের ওষুধের কার্যকারিতা ও বায়োইকুইভ্যালেন্স পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা আরও জোরদারের প্রক্রিয়া চলছে।
দেশে সোয়া দুই লাখ ফার্মেসি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার নিবন্ধিত। অনুমোদনহীন ও লাইসেন্সবিহীন ফার্মেসির বিরুদ্ধে অভিযান জোরদারের পাশাপাশি প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রির বিরুদ্ধে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতি কার্যকর করার কথা জানিয়েছে ঔষধ প্রশাসন।
মহাপরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ওষুধ সাধারণ ভোগ্যপণ্য নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধ করতে হবে।’
শুধু অভিযান চালিয়ে এ ধরনের বিক্রি বন্ধ করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ফার্মেসিতে প্রশিক্ষিত ফার্মাসিস্ট নিশ্চিত করতে হবে। ভারত ও মালয়েশিয়াসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ফার্মাসিস্ট ছাড়া ফার্মেসি পরিচালনার সুযোগ নেই। বাংলাদেশে সংকট মোকাবিলায় তিন মাসের কোর্সের মাধ্যমে ‘সি গ্রেডের ফার্মাসিস্ট’ তৈরি করা হলেও তাঁদের অনেকের অ্যান্টিবায়োটিক সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই।’
অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার কমাতে সরকারি হাসপাতালগুলোতেও ফার্মাসিস্ট নিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেন প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক। তাঁর মতে, ওষুধ বিতরণ, প্রেসক্রিপশন বিশ্লেষণ, রোগীকে পরামর্শ ও ওষুধ-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণের দায়িত্ব ফার্মাসিস্টদের দেওয়া হলে অপব্যবহার কমানো সম্ভব।
অনুষ্ঠানে বলা হয়— হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যানসার ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দীর্ঘদিন, অনেক ক্ষেত্রে একাধিক ওষুধ সেবন করতে হয়। ফলে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া নজরদারি জরুরি। বাজারজাত হওয়ার পর কোনো ওষুধে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে তা দ্রুত শনাক্ত ও ঝুঁকি মূল্যায়নের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে ফার্মাকোভিজিল্যান্স জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মো. আকতার হোসেন বলেন, ‘বিরূপ ওষুধ প্রতিক্রিয়ার তথ্য দ্রুত রিপোর্ট করা গেলে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করে রোগীর নিরাপত্তা বাড়ানো সম্ভব।’ এ জন্য চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট, ওষুধশিল্প ও রোগীদের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
নিরাপদ ও কার্যকর ওষুধ নিশ্চিত করতে উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবহন ও সংরক্ষণেও আন্তর্জাতিক নির্দেশনা অনুসরণের কথা জানানো হয়। সঠিক তাপমাত্রায় ওষুধ পরিবহন ও বিতরণে গুড ডিস্ট্রিবিউশন প্র্যাকটিস (জিডিপি) ও ডব্লিউএইচওর নির্দেশনা অনুসরণ করা হচ্ছে বলে জানান মহাপরিচালক।
ওষুধ ও প্রসাধনী আইন ২০২৩ অনুযায়ী ওষুধ প্রস্তুতকারকদের ফার্মাকোভিজিল্যান্স ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার তথ্য রিপোর্টের আইনি বাধ্যবাধকতা আরও জোরদারের কথা জানানো হয়। একই সঙ্গে ওষুধের প্যাকেটে সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে
এদিকে ডব্লিউএইচওর বাংলাদেশ কার্যালয় থেকে বৃহস্পতিবার পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০ জন রোগীর একজন স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের সময় কোনো না কোনোভাবে ক্ষতির শিকার হন। এসব ক্ষতির প্রায় অর্ধেকই প্রতিরোধযোগ্য। বিশেষ করে অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল চিকিৎসায় রোগী নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়ে। রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব, ওষুধ প্রয়োগে ভুল, স্বাস্থ্যসেবা-জনিত সংক্রমণ এবং রোগী হস্তান্তর, রেফারেল ও হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার সময় বিভিন্ন ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এসব ঝুঁকি শনাক্ত, রিপোর্ট ও তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে ডব্লিউএইচও।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, আইসিডিডিআর,বি, ডব্লিউএইচও, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট এবং ওষুধ উৎপাদনকারী ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।